
দুনিয়াজুড়ে খেলাধুলায় মেয়েদের অবস্থান এখনো সেভাবে পোক্ত হয়নি। তবে ব্যাপারটা যে সবার জন্যই এমন তা নয়। অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকালের কথাই ধরুন। খুব গুরুত্বপূর্ণ এক সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছিলেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ। এর মধ্যে ছিল বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বিরোধী আইন প্রণয়ন এবং বন্ডাই সৈকতে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা। এমন ভারী সব বিষয়ের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী তাঁর দেশের এক নারী ক্রিকেটারকে নিয়ে কথা বললেন। কারণ, মেয়েটি সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার দিনক্ষণ জানিয়ে দিয়েছেন।
‘অ্যালিসা হিলি একজন কিংবদন্তি। অসাধারণ ক্যারিয়ার গড়েছেন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলে এবং নেতৃত্ব দিয়ে...তিনি শুধু একজন গ্রেট ক্রিকেটারই নন, আমি নিশ্চিত আরও উন্নতি করবেন। আমার ধারণা তিনি অসাধারণ একজন ধারাভাষ্যকারও’—সংবাদ সম্মেলনে বলেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী।
হ্যাঁ, খবরটা এতক্ষণে অনেকেই জানেন। অস্ট্রেলিয়া নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক অ্যালিসা হিলি জানিয়েছেন, আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চে ঘরের মাঠে ভারতের বিপক্ষে একাধিক সংস্করণের সিরিজ শেষে সব ধরনের ক্রিকেট ছাড়বেন। টি-টুয়েন্টি সিরিজে খেলবেন না তবে ওয়ানডে সিরিজ খেলে তারপর ৬ থেকে ৯ মার্চ পর্যন্ত ওয়াকায় দিবারাত্রির টেস্ট খেলে অবসর নেবেন ৩৫ বছর বয়সী হিলি।
উইলো টক পডকাস্টে হিলি বলেন, ‘মিশ্র অনুভূতি নিয়ে বলছি, ভারতের বিপক্ষে আসন্ন সিরিজ হবে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে আমার শেষ সিরিজ। আমি এখনো অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলতে উৎসাহী। তবে শুরুর প্রতিযোগিতামূলক সেই মানসিকতায় ভাটা পড়েছে, তাই মনে হচ্ছে ক্যারিয়ার শেষ করার সময়টা এখনই।’
টেস্টে একসময় সর্বোচ্চ ডিসমিসালের রেকর্ডধারী অস্ট্রেলিয়ার সাবেক উইকেটকিপার ইয়ান হিলি তাঁর ছোট চাচা। কিপিং-গ্লাভস পরার অভ্যাসটি এসেছে তাই পরিবার থেকেই। তবে ব্যাটিংয়ে হিলির চাচা ইয়ানও তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারবেন না। ১২৩ ওয়ানডে ও ১৬২ টি-টুয়েন্টি খেলেছেন, এই দুই সংস্করণে ৩ হাজারের ওপরে রান। ওয়ানডেতে ৭টি সেঞ্চুরি, টি-টুয়েন্টিতে একটি—সেই ১৪৮* রানের ইনিংসটি আবার টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে টি-টুয়েন্টিতে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের ইনিংস।
ছেলে ও মেয়েদের ক্রিকেট মিলিয়ে টি-টুয়েন্টিতে সর্বোচ্চ ডিসমিসালের রেকর্ডও (১২৬) তাঁর। সব সংস্করণ মিলিয়ে ডিসমিসাল সংখ্যা ২৭৫। হয়েছেন ২০১৮ ও ২০১৯ সালে টি-টুয়েন্টিতে আইসিসির বর্ষসেরা ক্রিকেটারও।
কিছুদিন আগে শেষ হওয়া অ্যাশেজে ধারাভাষ্য দিয়েছেন হিলি। অবসর নেওয়ার ব্যাপারটি যে তখন তাঁর মাথায় খেলা করছে, সেটা অবশ্য বোঝা যায়নি। ধারাভাষ্যকক্ষ থেকে মাঠে স্বামীর বোলিংয়ের খুঁটিনাটি সব বিশ্লেষণ করেছেন। টেস্ট ইতিহাসে বাঁহাতি পেসারদের মধ্যে উইকেট নেওয়ায় স্বামীর চূড়ায় ওঠাও দেখেছেন কাছ থেকে। নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছেন, হিলির স্বামী অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি পেসার মিচেল স্টার্ক। মজার বিষয়, দলীয় সাফল্যে স্টার্ক কিন্তু তাঁর পরিবারে সেরা ক্রিকেটার নন। ওয়ানডে ও টি-টুয়েন্টিতে দুবার করে বিশ্বকাপ জিতেছেন স্টার্ক। আর হিলি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে শুধু টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপই জিতেছেন ছয়বার। দুবার জিতেছেন ওয়ানডে বিশ্বকাপ।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টড গ্রিনবার্গ তাই বলেন, ‘অ্যালিসা সর্বকালের অন্যতম সেরা এবং ১৫ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে মাঠের ভেতরে ও বাইরে অসীম অবদান রেখেছেন।’
২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৯ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে অভিষেক হিলির। সেই সময়ে হিলির একটি ছবি গত বছর অক্টোবরের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। ছবিতে দেখা যায়, কেএফসির টি-শার্ট পরে চেইন ফাস্ট ফুডটির একটি কাউন্টারে কাজ করছেন হিলি। তখন ‘নো বলস ক্রিকেট’ পডকাস্টে সেই ছবি নিয়ে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, ওটা আমি। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি কেএফসিতে কাজ করেছি। খুব ভালো লাগত এটা।’
হিলি সে পডকাস্টেই জানান, তিনি তখন কেএফসির কনকর্ড আউটলেটের ব্যবস্থাপক হয়ে ওঠার পথে ছিলেন। কিন্তু সে মুহূর্তে ডাক পান অস্ট্রেলিয়ার ২০১০ বিশ্বকাপ দলে। কেএফসি তাঁকে ধরে রাখতে চাইলেও হিলির পক্ষে সেখানে ফেরত যাওয়া আর সম্ভব হয়নি।
যেহেতু ক্রিকেট খেলুড়ে পরিবারে জন্ম তাই ব্যাট-বলে হাত পাকান শৈশবেই। তাঁর বাবা গ্রেগ কুইন্সল্যান্ড দলে খেলেছেন। ইয়ান হিলির কথা তো বলাই হলো। আরেক চাচা কেনও খেলেছেন কুইন্সল্যান্ড দলে। তবে ক্রিকেট খেলাটা শুরু থেকেই হিলির পছন্দের তালিকায় ছিল না। হিলির দাবি, শৈশবে কুইন্সল্যান্ড থেকে সিডনিতে যাওয়ার পর এক বন্ধুর প্ররোচনায় ক্রিকেটে নেমে পড়েন। তারপর যেটা হলো সেটা রীতিমতো ইতিহাস—নিউ সাউথ ওয়েলসে প্রাইভেট স্কুলগুলোর ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় ছেলেদের দলে খেলা প্রথম নারী ক্রিকেটার হিলি! বার্কার কলেজেও ছেলেদের একাদশে প্রথম নারী ক্রিকেটার ছিলেন সেই সময়ের ১৬ বছর বয়সী হিলি।
হ্যাঁ, কখনো কখনো সকালের সূর্য দেখে যেমন বলে দেওয়া যায় দিনটা কেমন যাবে, তেমনি যোগ্যতাবলে ছেলেদের দলে সুযোগ পাওয়া হিলিকে দেখেও বোঝা গিয়েছিল, এই মেয়ের জন্মই কিংবদন্তি হয়ে ওঠার জন্য।