ফাইনালে ৪ উইকেট নিয়েছেন বুমরা
ফাইনালে ৪ উইকেট নিয়েছেন বুমরা

বিশ্বকাপ ফাইনাল: ভারতের সঠিক চাল, কোথায় ভুল নিউজিল্যান্ডের

‘একপেশে খেলা’ যেটাকে বলে, আহমেদাবাদে কাল টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল তা-ই হয়েছে। ভারত আগে ব্যাট করে ৫ উইকেটে ২৫৫ রান তোলার পর নিউজিল্যান্ডকে অলআউট করেছে ১৫৯ রানে। জয়-হারের ব্যবধান ৯৬ রানের—স্পষ্টতই ভারত বেশ ভালো খেলেছে।

তবে ভারতের এত বড় জয়ে শুধু দলটির নিজেদের কৃতিত্বই নয়, প্রতিপক্ষের ভুল বা কাজে না লাগা সিদ্ধান্তের ভূমিকা আছে। ম্যাচের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে—দুই দলের এমনই কিছু ভুল-সঠিক সিদ্ধান্তের বিশ্লেষণ করেছে উইজডেন। দেখুন তো আপনার ভাবনার সঙ্গে মেলে কি না।

ম্যাকনকির বদলে নিশামকে বেছে নেওয়া

ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে সফল বোলার জিমি নিশাম। ভারতের রান তিন শর সম্ভাবনা জাগিয়েও যে সে পর্যন্ত যেতে পারেনি, তাতে ১৬তম ওভারে তাঁর ৩ উইকেটের বড় ভূমিকা। তবে বল হাতে নিশামের ওই উইকেটগুলো এসেছে ভারতের রান দুই শ পেরিয়ে যাওয়ার পর, অর্থাৎ ক্ষতি যা হওয়ার আগেই হয়ে গেছে। আর এখানেই আসে নিউজিল্যান্ডের একটি ট্যাকটিক্যাল সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব।

জিমি নিশাম ১৬তম ওভারে তিন উইকেট নেন

ফাইনালে কোল ম্যাকনকিকে খেলায়নি নিউজিল্যান্ড। সেমিফাইনালে এই অফ স্পিনারের একটি ওভারই (ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে টানা দুই উইকেট) ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর নিউজিল্যান্ডের দাপট প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিল। ম্যাকনকি থাকলে সেটা হয়তো ফাইনালেও কাজে লাগত। এবারের বিশ্বকাপে অভিষেক শর্মা তিনবার অফ স্পিনারদের করা প্রথম ওভারে আউট হয়েছিলেন। ফাইনালে ম্যাকনকি না থাকায় নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক সেটা গ্লেন ফিলিপসকে দিয়ে করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ম্যাকনকির তুলনায় কম বোলিং করা ফিলিপস কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেননি। দেখা গেল, অভিষেকই ১৮ বলে ফিফটি করে ভারতকে ভালো শুরু এনে দিয়েছেন।

মাত্র এক ওভার পরেই ম্যাট হেনরিকে সরিয়ে নেওয়া

ভারত প্রথম দুই ওভারে করে মাত্র ১২ রান। এমন পরিস্থিতিতে নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক স্যান্টনার ম্যাট হেনরির জায়গায় জ্যাকব ডাফির হাতে বল তুলে দেন। ডাফি এবারের বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ডের পর আর খেলেননি। সেখানেও পূর্ণ সদস্যদেশগুলোর বিপক্ষে দুই ম্যাচে ৮০ রান দিয়ে পেয়েছিলেন মাত্র ১ উইকেট।

স্যান্টনার সম্ভবত চেয়েছিলেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা হাত খোলার আগেই ডাফিকে দিয়ে একটি ওভার করিয়ে নিতে। অথবা আক্রমণে বৈচিত্র্য আনতে চেয়েছিলেন (পাওয়ারপ্লের মধ্যেই তিনি পাঁচবার বোলিং পরিবর্তন করেন)। তবে হেনরিকে এক ওভার পরই সরিয়ে ডাফিকে আনার সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হয়। সে ওভারে তিনটি চারসহ ১৫ রান নেয় ভারত। আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, অভিষেকের প্রথম বাউন্ডারি এ ওভারেই, যেখান থেকে ফিফটির আগে তাঁর আর থামানো যায়নি। স্যান্টনার হেনরিকে বোলিংয়ে ফেরান পঞ্চম ওভারে, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ৪ ওভারেই ভারতের স্কোর ছিল ৫১-০।

ওয়াইড, ওয়াইড আর ওয়াইড

টি-টুয়েন্টিতে অফ স্টাম্পের অনেক বাইরে বল করার চেষ্টা করেন বোলাররা। এমন বোলিং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কাজে দেয়, বিশেষ করে যখন ব্যাটিং পক্ষ পাওয়ারপ্লে বা ডেথ ওভার চলছে। কিন্তু শুরুর দিকে এমনটা করতে গিয়ে অতিরিক্ত ওয়াইডই দিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের বোলাররা।

ডাফি তৃতীয় ওভারে একটি, লকি ফার্গুসন চতুর্থ ওভারে তিনটি এবং হেনরি পঞ্চম ওভারে চারটি ওয়াইড বল করেন। এই আটটি ওয়াইডের মধ্যে তিনটিই ছিল লেগ সাইডে, কিন্তু বাকি পাঁচটি অফ সাইডে, যা স্পষ্টত পরিকল্পনার অংশ ছিল। তবে এসব ওয়াইড ডেলিভারি নিউজিল্যান্ডের জন্য খুব একটা কাজে আসেনি। পাওয়ারপ্লেতেই ৯২ রান তুলে ফেলেন ভারতের দুই ওপেনার। এরপর ভারতের ব্যাটিংয়ে শুধু গিয়ার বদলেছে, নিউজিল্যান্ড যতটা সম্ভব ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করে গেছে। মজার বিষয় হচ্ছে, পাওয়ারপ্লের পর নিউজিল্যান্ড আর একটি ওয়াইডও করেনি।

ভারতের দুই ওপেনার পাওয়ারপ্লেতেই নিউজিল্যান্ডকে চাপে ফেলে দেন

স্লোয়ার বলের অতিরিক্ত ব্যবহার

ইনিংসের শুরুতে নিউজিল্যান্ডের কৌশলের মধ্যে ওয়াইডে বল ডেলিভারির পাশাপাশি স্লোয়ারও ছিল। ডাফি তৃতীয় ওভারে একটি স্লোয়ার বল করেন। ফার্গুসন চতুর্থ ওভারে করেন দুটি। হেনরি পঞ্চম ওভারে আরও দুটি। এই পাঁচটির দুটি ছিল ওয়াইড, বাকি তিনটি সঞ্জু স্যামসন ও অভিষেক শর্মা সহজেই বুঝে ফেলে চার ও ছক্কা মারেন। স্লোয়ার কৌশল বুমেরাং হওয়ার পর ডেথ ওভারের আগপর্যন্ত আর কেউ তা করার চেষ্টা করেননি।

শেষ ওভারের জন্য নিশাম

১৫ ওভার শেষে ভারতের স্কোর ছিল ১ উইকেটে ২০৩। পরের ৫ ওভারে ভারতের রান যে ৮০-১০০ হয়নি, তার কারণ ১৬তম ওভারে নিশামের ৩ উইকেট। নিউজিল্যান্ডের জন্য পরের তিনটি ওভারও ভালো যায়। ১৯ ওভার শেষে ভারত ছিল ২৩১/৪। এরপর শেষ ওভারে ফার্গুসন বা ডাফিকে না দিয়ে নিশামের হাতেই বল তুলে দেন স্যান্টনার।

কিউই অধিনায়কের এই সিদ্ধান্তও কাজে লাগেনি। নিশাম দেন ২৪ রান, ভারত পেরিয়ে যায় আড়াই শ, যা রান তাড়ায় নিউজিল্যান্ডের জন্য বাড়তি মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে। মাঝবিরতিতেই ম্যাট হেনরি জানান, তাঁরা চেয়েছিলেন ২৪০ রানের মধ্যে আটকে রাখতে। নিশামের শেষের খরুচে ওভারের কারণে সেটা না হওয়ায় পরে রান তাড়ায রীতিমতো চিড়েচ্যাপটা হয়েছে কিউই ব্যাটিং লাইনআপ।

অক্ষর প্যাটেলের ‘প্রমোশন’ এবং নিউজিল্যান্ডের অনমনীয়তা

অক্ষর পাওয়ারপ্লেতেই ভারতকে দুটি উইকেট এনে দেন

সুপার এইটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ইনিংসের প্রথম দিকেই অক্ষর প্যাটেলের হাতে বল তুলে দিয়েছিলেন ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব। বাঁহাতি অক্ষর দুই ডানহাতি শাই হোপ ও রোস্টন চেজকে আউট করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নও করেছিলেন। ফাইনালেও ভারত অধিনায়ক একই কাজ করেছেন। এবার অক্ষর ফিরিয়েছেন ফিন অ্যালেন ও গ্লেন ফিলিপসকে। ভারত পরিস্থিতির দাবি মিটিয়ে অক্ষরকে ‘প্রমোশন’ দিলেও নিউজিল্যান্ড নিজেদের পরিকল্পনায় অটলই থেকেছে।

রাচিন রবীন্দ্র দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হওয়ার পর ব্যাটিং লাইনআপে বাঁহাতি পাঠাতে পারত দলটি, বিশেষ করে ছন্দে না থাকা বরুণ চক্রবর্তীকে খেলার জন্য। কিন্তু ব্যাটিং লাইনআপে অদল-বদল না করায় বাঁহাতি স্যান্টনার ও নিশাম যতক্ষণে নেমেছেন, ম্যাচ ততক্ষণে নাগালের বাইরে।

‘চিট কোডের’ অর্ধেক ব্যবহার

বিশ্বের সেরা বোলার থাকলেই যে জয় নিশ্চিত হবে—এমন নয়, তবে তাঁর চার ওভারের সর্বোত্তম ব্যবহার করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সূর্যকুমার সাধারণত বুমরাকে দিয়ে শুরুতে এক ওভার করে দুই স্পেল করিয়ে থাকেন, দুই ওভারে জমিয়ে রাখেন ডেথ ওভারের জন্য। ফাইনালে ভারত অধিনায়ক চেনা ছকে এগোননি। চতুর্থ ওভারে প্রথম বোলিং করেন বুমরা। এরপর ‘বিশ্রামে’ চলে যাওয়ার কথা থাকলেও ষষ্ঠ ওভারে তাঁকে আবার বল দেওয়া হয়। মূলত নিউজিল্যান্ড প্রথম পাঁচ ওভারে তিন উইকেট হারিয়ে ফেলার পর তাদের আরও চাপে ফেলতে চেয়েছে ভারত।

পঞ্চম ওভারের সময় ক্যামেরায় দেখা যায়, ভারত কোচ গৌতম গম্ভীর বুমরাকে দিয়ে দ্বিতীয় ওভার করানোর জন্য ইশারা করছেন। উদ্দেশ্যটা সহজেই বোঝা যাচ্ছি। টিম সাইফার্ট ততক্ষণে ১৫ বলে ৩১ রান করে হুমকি হয়ে উঠেছেন, তাঁকে ওই সময়ই সরিয়ে ম্যাচটি সেখানেই ‘শেষ’ করে দিতে চেয়েছিলেন গম্ভীর। বুমরা অবশ্য সে ওভারে সাইফার্টকে আউট করতে পারেননি, তবে রান দিয়েছেন মাত্র ৫। ওই ওভার শেষে নিউজিল্যান্ডের আস্কিং রেট দাঁড়ায় ১৪.৫৭ রানে, যা আরও বড় চাপ তৈরি করে।