নতুন সরকারের কাছে কী চান খেলোয়াড়েরা

বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যেই ছিল ‘খেলার গৌরবে উজ্জ্বল দেশ’ গড়ার অঙ্গীকার। চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করা থেকে শুরু করে প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদদের বৃত্তি প্রদান, খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং ক্রীড়াশিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দলটি। নতুন সরকার গঠনের প্রাক্কালে তাদের কাছে নিজেদের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন খেলোয়াড়েরা, যেগুলো অনেকটাই মিলে যায় দলটির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও—

চাই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা

নাজমুল হোসেন

নাজমুল হোসেন, ক্রিকেটার, বাংলাদেশ দল

প্রথমত, বলব খেলাধুলার সুযোগ–সুবিধার কথা। আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য চাই, কিন্তু সব খেলার জন্য আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ–সুবিধা নেই। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, তারা আমাদের সব ধরনের খেলাধুলা ও অনুশীলনের জন্য আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ–সুবিধা নিশ্চিত করবে। কারণ, সেরা পারফরম্যান্সের জন্য চাই সেরা সুযোগ–সুবিধা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চাওয়া আছে আমার। খেলোয়াড়েরা যেন ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে। একজন খেলোয়াড়ের বয়স ৩৫–৩৬ হয়ে যাওয়া মানেই তার ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বেলা। অন্য পেশার মানুষ এই বয়সে ক্যারিয়ার আরও সামনে এগিয়ে নেওয়ার কথা ভাবে, আয়রোজগারও তখন বাড়তে থাকে। কিন্তু খেলোয়াড়দের বেলায় এই বয়সে পৌঁছে যাওয়া মানে আয়ের পথ কমে আসা, কারণ তার ক্যারিয়ারই তো শেষ তখন!

বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই এই বয়সে এসে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে। খেলা ছাড়ার পর কী হবে, ক্যারিয়ারজুড়েই আসলে এই দুশ্চিন্তা বয়ে বেড়ায় তারা। আমি মনে করি, খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকলে তাদের পক্ষে দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে আরও ভালো খেলা সম্ভব। আশা থাকবে নতুন সরকার এদিকে নজর দেবে।

দীর্ঘমেয়াদি ও সঠিক পরিকল্পনা চাই

মাবিয়া আক্তার।

মাবিয়া আক্তার, ভারোত্তোলক

নতুন সরকারকে আমার পক্ষ থেকে আগাম অভিনন্দন। একজন খেলোয়াড় হিসেবে নতুন সরকারের কাছে আমার প্রথম প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেন আমাদের ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি সব সময় সুদৃষ্টি রাখেন।

আমি চাই দেশের ক্রীড়াঙ্গন এমনভাবে গড়ে উঠুক, যেখানে থাকবে দীর্ঘমেয়াদি ও সঠিক পরিকল্পনা ছাপ। মাত্র দু-তিন মাসের নামমাত্র প্রস্তুতি নিয়ে কোনো গেমস বা টুর্নামেন্টে অংশ নিতে হবে না। সারা বিশ্বেই খেলার জগৎটিকে বিশেষ দৃষ্টিতে বিবেচনা করা হয়। আমি চাইব নতুন সরকার বাংলাদেশেও খেলাধুলাকে সেই উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

বিগত দিনে আমরা যেসব সুযোগ-সুবিধার জন্য বারবার দাবি তুলেছি, হা–হুতাশ করেছি, সেগুলো যেন এবার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত মানের প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম আমাদের জন্য খুবই জরুরি। এ ছাড়া খেলোয়াড়দের জন্য উন্নত আবাসন সুবিধা, আধুনিক স্টেডিয়াম ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

পৃষ্ঠপোষক–সংকট দূর করতে হবে

দাবাড়ু ফাহাদ রহমান

ফাহাদ রহমান, দাবাড়ু

দেশের ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোয় দুর্নীতি আছে। নতুন সরকার ও ক্রীড়ামন্ত্রীর কাছে আমার মূল প্রত্যাশা দুর্নীতিমুক্ত ক্রীড়াঙ্গন। ফেডারেশনগুলোর দুর্নীতি বন্ধ হলে বাজেটের সঠিক বাস্তবায়ন হবে, তখন পৃষ্ঠপোষক পাওয়াও সহজ হবে। ক্রিকেটের বাইরে অন্যান্য খেলায় আর্থিক নিরাপত্তা ও পৃষ্ঠপোষকতা বাড়লে সেসব খেলার প্রতি খেলোয়াড়দের আগ্রহ বাড়বে। দেশের ক্রীড়াঙ্গন তাতেই অর্ধেক উন্নত হয়ে যাবে।

দাবায় নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পৃষ্ঠপোষক জোগাড় করে অনেক আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিতে হয়। কিন্তু পৃষ্ঠপোষক পাওয়াই কঠিন। নতুন সরকারের কাছে এই সমস্যার সমাধান চাই। বর্তমানে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হলে নামমাত্র পুরস্কার (মাত্র ৪০ হাজার টাকা) পায় একজন দাবাড়ু। এটা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে, নইলে খেলার আগ্রহ হারিয়ে যাবে। দাবা অলিম্পিয়াডে অংশ নেয় জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের শীর্ষ পাঁচজন খেলোয়াড়। তাঁদের জন্য মাসিক বেতন চালু করা জরুরি, যাতে আর্থিক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে তাঁরা দাবার ওপর পুরো মনোযোগ দিতে পারেন।

খেলোয়াড়দের বেতনের আওতায় আনা হোক

আমিরুল ইসলাম

আমিরুল ইসলাম, হকি খেলোয়াড়

নতুন ক্রীড়ামন্ত্রী যিনিই হবেন, তাঁর কাছে আমার প্রধান দাবি থাকবে—দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে যেন আধুনিক ও পেশাদার করা হয়। এ জন্য সব খেলায় অভিজ্ঞ বিদেশি কোচ নিয়োগ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে।

হকি খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিবছর ঘরোয়া প্রিমিয়ার লিগ ও ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ আয়োজন বাধ্যতামূলক করারও দাবি আমার। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) থেকে ফেডারেশনকে এই টুর্নামেন্ট দুটির বাধ্যবাধকতা দিয়ে তদারক করার সময় এসেছে। প্রতিটি ফেডারেশনের নির্দিষ্ট বাৎসরিক ক্যালেন্ডার থাকবে, যা এনএসসি অনুমোদন ও পর্যবেক্ষণ করবে।

খেলোয়াড়দের আর্থিক সুরক্ষা দিতে জাতীয় ও জুনিয়র পর্যায়ের সব খেলার খেলোয়াড়দের সরাসরি সরকারি বেতনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ফেডারেশন থেকে দিতে হবে প্রণোদনা। খেলোয়াড়দের দৈনিক ভাতা ও আন্তর্জাতিক ভাতা বৃদ্ধিও খুব দরকার। বিকেএসপি থেকে বের হওয়ার পর খেলোয়াড়েরা যেন ঝরে না পড়ে, সে জন্য তাদের নিয়মিত খেলার মধ্যে রাখার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

সবার আগে চাই মাঠ সংস্কার

বাংলাদেশের অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার শেখ মোরছালিন

শেখ মোরছালিন, ফুটবলার

নতুন সরকারের কাছে একজন ফুটবলার হিসেবে আমার প্রথম দাবি, মাঠের আমূল সংস্কার। বর্তমানে হাতে গোনা দু-একটি মাঠ বাদে বাকিগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। এমন মাঠে খেলা মানেই চোটের ঝুঁকি এবং বাজে পারফরম্যান্স। মানসম্মত মাঠ ছাড়া আন্তর্জাতিক ফুটবলে সাফল্য পাওয়া অসম্ভব। আমাদের স্টেডিয়াম থাকলেও খেলার যোগ্য মাঠের তীব্র অভাব। তাই সবার আগে মাঠের উন্নয়ন চাই।

ঘরোয়া লিগের মানও বাড়াতে হবে। উন্নত সম্প্রচারব্যবস্থা ও পৃষ্ঠপোষক নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমানে ক্লাব কমে যাওয়ায় জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরাও এখন দলবদলের সময় দল খুঁজে পান না। পারিশ্রমিকও কমে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। এ ক্ষেত্রে বাফুফে ও সরকারের কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন, যাতে সমস্যাগুলোর সমাধান হয়।

সামগ্রিকভাবে সব খেলার জন্য বাজেট বাড়িয়ে এবং খেলোয়াড়দের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে একটি পেশাদার ও উন্নত ক্রীড়াঙ্গন গড়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেবে সরকার, এটাই প্রত্যাশা আমাদের।