মোস্তাফিজুর রহমান
মোস্তাফিজুর রহমান

মোস্তাফিজ ইস্যুতে মাঠের বাইরে তোলপাড়, ভেতরে কী হলো

সপ্তাহ তিনেকের সিলেট পর্বে বেশির ভাগ দিনই ভরা ছিল শহরটির আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের গ্যালারি। বিক্রি হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকার টিকিট। সুপার ওভারের নাটকীয়তা, হ্যাটট্রিক কিংবা সেঞ্চুরি—বিপিএলের সিলেট পর্ব সাক্ষী হয়েছে অনেক কিছুরই।

টুর্নামেন্ট শুরুর আগে খালেদ মাহমুদের রাগ করে অনুশীলন ছেড়ে চলে যাওয়া আর এক দিন আগে চট্টগ্রাম রয়্যালসের মালিকানা বিসিবির নিতে বাধ্য হওয়ার বিতর্কে অন্ধকারে ঢেকে যাওয়ার শঙ্কা নিয়েই শুরু হয়েছিল বিপিএল।

তবে শেষ পর্যন্ত সেই শঙ্কাটা দূর হয়েছে। সোমবার শেষ হয়েছে সিলেট পর্ব। মাঝের সময়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটেও ঘটে গেছে অনেক কিছু—যে হাওয়া এসে লেগেছে বিপিএলেও। সিলেটে যে এত দিন খেলা হয়েছে, সেটিও তো মাঠের বাইরের ঘটনার কারণেই।

টুর্নামেন্ট শুরুর আগে দেওয়া সূচি অনুযায়ী, ৫ জানুয়ারি বিপিএল হওয়ার কথা ছিল চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে। কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দুই দিন খেলা স্থগিত রাখা হয়। পরে লজিস্টিকস জটিলতা এড়াতে সিদ্ধান্ত হয় চট্টগ্রামের ম্যাচগুলোও নিয়ে আসা হবে সিলেটে।

মাঠের লড়াইটা পরেও ঢেকে গেছে বাইরের ঘটনায়। মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার জেরে এখন পর্যন্ত ভারতে বিশ্বকাপ খেলতেই না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় বিসিবি। বিপিএলে মাঝে এমন একটা সময় গেছে—যখন যাকে যেখানেই পাওয়া গেছে, তাঁর কাছেই সাংবাদিকদের ছিল একটাই প্রশ্ন, ‘মোস্তাফিজকে এভাবে বাদ দেওয়ার ঘটনায় আপনার প্রতিক্রিয়া কী?’

যাঁকে নিয়ে এত শোরগোল, ক্রিকেট কূটনীতি থেকে শুরু করে আঞ্চলিক রাজনীতিতেও রীতিমতো ঝড়ই বয়ে যাচ্ছে, সেই মোস্তাফিজুর রহমানও ছিলেন বিপিএলে। কিন্তু পুরো সময়ে তাঁর মুখ থেকে একটা শব্দও বের হয়নি এ ঘটনা নিয়ে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, অনুশীলন আর ম্যাচ—তাঁকে পাওয়া গেছে কেবল এসবেই।

মোস্তাফিজ যতই নিভৃতে থাকতে চান, তাঁকে বারবার সামনে নিয়ে এসেছে পারফরম্যান্সই, এবারের বিপিএলেও সেটির ব্যতিক্রম হয়নি। ডেথ ওভারে তিনি রংপুর রাইডার্সের ত্রাণকর্তা হয়েছেন কয়েকটি ম্যাচে। মাঠে মোস্তাফিজ কী করেছেন, সেটির একটা আঁচ পাওয়া যাবে সংখ্যা দেখলেও—৮ ম্যাচে ১৩ উইকেট নিয়ে তিনি এখন শরীফুল ইসলামের সঙ্গে যৌথভাবে টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি।

১৩ উইকেট নিয়েছেন হাসান

তালিকার এক নম্বরে থাকা হাসান মাহমুদের দল নোয়াখালী এক্সপ্রেস অবশ্য প্রথম ৬ ম্যাচেই হেরেছে। কিন্তু হাসান তাঁর কাজটা করে গেছেন নিয়ম মেনে—টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের বাংলাদেশ দলে না থাকলেও হতোদ্যম না হয়ে ৮ ম্যাচে ১৪ উইকেট পেয়ে গেছেন।

এবারের বিপিএল রেকর্ড তিনটি হ্যাটট্রিকও দেখে ফেলেছে লিগ পর্ব শেষ হওয়ার আগেই। মেহেদী হাসান রানা, মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরীর পর গত পরশুই শেষ হ্যাটট্রিকটি করেছেন রিপন মণ্ডল। রাইজিং স্টারস এশিয়া কাপের পর থেকেই তিনি আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছিলেন। ওই টুর্নামেন্ট যেখানে শেষ করেছেন, সেখান থেকেই বিপিএলে শুরু করেছেন রিপন। রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে সুপার ওভারে গড়ানো ম্যাচটাতে তাঁর ওপর আস্থা রেখে সফল হয়েছে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স।

বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ততায় বিদেশিদের আসা-যাওয়া চলেছে পুরো সিলেট পর্বজুড়েই। বোলিংয়ের মতো ব্যাটিংয়েও তাই অনুমিতভাবেই শীর্ষ স্থানগুলোতে এগিয়ে আছেন স্থানীয়রাই।

কিন্তু তবু সেখানে অস্বস্তি থেকে গেছে বিশ্বকাপ দলে থাকা ক্রিকেটাররা তেমন রান করতে পারেননি বলে। আগামী মাসের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকা ক্রিকেটারদের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে রান করেছেন শুধু পারভেজ হোসেন।

পারভেজ, নাজমুল, মোস্তাফিজ ও নাসুম

শুরুর দিকের ম্যাচগুলো তিনি খেলেছিলেন চার নম্বরে, শেষ দিকে নেমেছেন ওপেনিংয়ে। দুই ভূমিকাতেই সফল ছিলেন পারভেজ। সিলেট টাইটানসকে প্লে–অফে তোলার পথে ৯ ম্যাচে ১৩০.৩১ স্ট্রাইক রেটে ২৮৮ রান করেছেন।

তিনি অবশ্য টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক নন। রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের নাজমুল হোসেন এবারের বিপিএলের একমাত্র সেঞ্চুরিয়ান—৮ ম্যাচে ১৪২.৪৩ স্ট্রাইক রেটে ২৯২ রান করে তিনিই আছেন সবার ওপরে।

বিশ্বকাপ দলের সব ক্রিকেটারই লম্বা সময় ধরে রান পাচ্ছিলেন না। শেষ দিকে এসে একটি করে ম্যাচ রান পাওয়ায় তানজিদ হাসান ও তাওহিদ হৃদয়কে নিয়ে দুশ্চিন্তা কিছুটা হলেও কমেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা হয়ে উঠেছেন সাইফ হাসান।

এক সিরিজ আগেই তাঁর কাঁধে তুলে দেওয়া হয়েছে সহ–অধিনায়কত্ব। কিন্তু এর পর থেকেই যেন রান করতে ভুলে গেছেন সাইফ। তাঁর পারফরম্যান্সের এমনই করুণ দশা যে একটা ম্যাচে বিশ্রামের নামে তাঁকে দল থেকে বাদই দিতে হয়েছিল ঢাকা ক্যাপিটালসকে। বিপিএলে ৭ ম্যাচে মাত্র ৪৮ রান করেছেন সাইফ!

তাঁর সামনে রানে ফেরার সুযোগও কম। কারণ, নোয়াখালী ও সাইফের দল ঢাকা ক্যাপিটালসের প্লে–অফে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশ ক্ষীণ। সিলেটে চূড়ান্ত হয়ে যাওয়া তিন দল রাজশাহী ওয়ারিয়র্স, চট্টগ্রাম রয়্যালস ও সিলেট টাইটানসের সঙ্গী হওয়ার সম্ভাবনাটা রংপুর রাইডার্সেরই বেশি। এই চার দলের লড়াই-ই শেষ পর্যন্ত লিখে দেবে শিরোপা–ভাগ্য। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পরশু শুরু হচ্ছে সেই রোমাঞ্চের লড়াই।