ছেলে হাসান ইসাখিলের সঙ্গে বাবা মোহাম্মদ নবী। রোববার সিলেটে নোয়াখালী এক্সপ্রেস–ঢাকা ক্যাপিটালস ম্যাচের পর
ছেলে হাসান ইসাখিলের সঙ্গে বাবা মোহাম্মদ নবী। রোববার সিলেটে নোয়াখালী এক্সপ্রেস–ঢাকা ক্যাপিটালস ম্যাচের পর

মাঠে ইতিহাস, সংবাদ সম্মেলনে স্বপ্ন আর গর্বের গল্প: নবী-ইসাখিলের দিনটা যেমন ছিল

মোহাম্মদ নবীর হাতে ম্যাচ সেরার ট্রফি, তাঁর চোখেমুখে আনন্দের ছাপ।

তাঁর দল নোয়াখালী এক্সপ্রেস ঢাকা ক্যাপিটালসের বিপক্ষে ম্যাচ জিতেছে ৪১ রানে। যে জয়ে নবীর অবদান বল হাতে ২ উইকেট, ব্যাট হাতে ১৩ বলে ১৭ রান। তিন শর বেশি রান ওঠা ম্যাচে এমন পারফরম্যান্সে ম্যাচসেরা হওয়ার কথা নয়। ট্রফিটা আসলে তাঁরও নয়।

ম্যাচসেরা না হয়েও সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলনকক্ষে নবীই হয়ে উঠলেন সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত মানুষ। আর সেটা আফগানিস্তানের তারকা অলরাউন্ডার হিসেবে নয়, একজন গর্বিত বাবা হিসেবে। নোয়াখালীর জয়ে ম্যাচসেরা হয়েছেন নবীরই ছেলে হাসান ইসাখিল। খেলা শেষে তিনি সাংবাদিকদের সামনে এলেন ছেলেকে নিয়ে, সঙ্গে ট্রফিটাও।

মিনিট দশেকের সেই সংবাদ সম্মেলনে সিলেটে বিপিএল কাভার করতে আসা সাংবাদিকদের সময় কেটেছে মুগ্ধতা আর কৌতূহলে। বাবা-ছেলের বন্ধুত্ব, ছোটখাটো রসিকতা তো সেখানে থাকলই, শোনা গেল দীর্ঘদিনের অপেক্ষা পূরণের আনন্দ আর বড় স্বপ্নের কথাও।

উপস্থিত সাংবাদিকের অনেকেরই ক্রিকেটের অনেক বড় তারকা ক্রিকেটারের প্রশ্নোত্তর-পর্বে অংশ নেওয়ার স্মৃতি আছে। শিরোপা উদ্‌যাপন বা বড় উপলক্ষের সাক্ষীও তারা বহুবার হয়েছেন। কিন্তু বাবা-ছেলের সংবাদ সম্মেলন কাভারের অভিজ্ঞতা তাঁদের এবারই প্রথম।

ছেলে ইসাখিলের সংবাদ সম্মেলনে পাশে হাস্যোজ্জ্বল বাবা নবী

এই সংবাদ সম্মেলনের আগেই সাংবাদিকেরা আরেকটি ‘প্রথম’-এর সাক্ষী হয়েছেন। প্রথমবারের মতো একই দলের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন বাবা নবী ও ছেলে ইসাখিল। এর আগে ৬ টি-টোয়েন্টিতে প্রতিপক্ষ হিসেবে খেললেও গতকালই প্রথম একই দলের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন তারা। নবী ও ইসাখিল শুধু ম্যাচই খেলেননি, জুটি বেঁধে ব্যাটিংও করেছেন। চতুর্থ উইকেটে যোগ করেছেন ৫৩ রান। শীর্ষ-স্তরের টি-টোয়েন্টি লিগে কোনো বাবা-ছেলের একসঙ্গে ব্যাটিংয়ের রেকর্ড এই প্রথম।

ছেলের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে নবীর কণ্ঠে মিশে থাকল গর্বের সুর, ‘একসঙ্গে খেলতে পারায় খুবই খুশি। অনেক লম্বা সময় ধরে আমরা এই দিনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ও ভালো পারফর্ম করেছে, একই ক্রিজে দুজন একসঙ্গে ব্যাটিং করেছি, তাঁকে পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেছি, পরের বলে কী হতে পারে তাও; গতি বেশি থাকবে নাকি কম। খুব ভালো খেলেছে সে।’

প্রায় দুই দশকের ক্যারিয়ারে আফগানিস্তান ক্রিকেটের বহু উত্থান-পতনেরই সাক্ষী মোহাম্মদ নবী। দেশটির ক্রিকেটের ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন যাঁরা, তিনি তাঁদের একজন। এমনিতে ৪১ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডারকে খুব একটা সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে দেখা যায় না।

কিন্তু ছেলের সঙ্গে একই দলে খেলার দীর্ঘদিনের অপেক্ষা শেষ হওয়ার পর কাল সব আবদারই তিনি সামলালেন হাসিমুখে। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে প্রথমবার বসেছেন ‘লাইভ’ অনুষ্ঠানে, পরে সংবাদ সম্মেলনেও।

ম্যাচের পর সম্প্রচার লাইভে অংশ নেন নবী ও ইসাখিল

বাবা ও ছেলে দুজনেরই একটি স্বপ্নের কথাও বললেন তারা। তা শুনুন হাসান ইসাখিলের মুখে, ‘একসঙ্গে জাতীয় দলে খেলব এটা আমার ও বাবার দুজনেরই স্বপ্ন। এ জন্যই আমি কঠোর পরিশ্রম করছি আর ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো খেলার দিকে মনোযোগ দিচ্ছি।’

এবারের বিপিএলে নোয়াখালী এক্সপ্রেসের সঙ্গে শুরু থেকেই আছেন হাসান ইসাখিল, কিন্তু গতকালের আগে কোনো ম্যাচেই সুযোগ পাননি। আইএল টি-টোয়েন্টি শেষ করে মোহাম্মদ নবী যোগ দিয়েছিলেন মাঝপথে। বাবাকে সঙ্গী হিসেবে পাওয়ার পর তাদের দেখা গেছে আলাদা অনুশীলনেও।

গত পরশুই প্রায় দেড় ঘণ্টা ছেলেকে নেটে বল করেছেন নবী। নোয়াখালীর একাদশে কাল সুযোগ পেয়েই ইসাখিল খেলেছেন ৬০ বলে ৯২ রানের ইনিংসে। এই ইনিংসে তাঁর শট খেলা নজরও কেড়েছে অনেকের—দেখতে হুবহু বাবার মতোই। নবী খেলছেন নাকি হাসান ইসাখিল তা আলাদা করা কঠিনই হয়েছে বেশির ভাগ সময়।

বাবা মোহাম্মদ নবী ও ছেলে হাসান ইসাখিল আজ একসঙ্গে ব্যাট করেছেন নোয়াখালীর হয়ে

বাবাকে অনুকরণ করতে গিয়েই কি এমন? ইসাখিলের উত্তর, ‘আমি বাবাকে কপি করি না। বন্ধুরা বলে যে তুমি বাবাকে কপি কর, আমার তেমন মনে হয় না। এসব আসলে সহজাতভাবেই হয়। আমি ওপেনার আর বাবা লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যান; ওদিক থেকেও তো পার্থক্য আছে।’

দুজনের মধ্যে পার্থক্য আছে আরও, নবী মূলত অলরাউন্ডার হিসেবেই খেলেন। কিন্তু বোলিংটা একদমই পছন্দ নয় হাসানের। বাবা কেমন? প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানালেন, ‘বন্ধুর মতো, ক্রিকেট ও জীবনের সবকিছুই তাঁর সঙ্গে শেয়ার করা হয়।’ সঙ্গে জানিয়ে রাখলেন এটিও, ‘শুধু অনুশীলনের সময় একটু কড়া।’

মিনিট দশেকের সংবাদ সম্মেলনের শেষে সঞ্চালক জানালেন, ‘শেষ প্রশ্ন…’ সুযোগ পেয়ে এক সাংবাদিক জানতে চাইলেন তাঁর কাছে, ‘মিডিয়া সামলানো নিয়ে ছেলেকে কী পরামর্শ দেবেন?’ উত্তরে নবী বললেন, ‘দূরে থাকতে…’

পাশেই বসে থাকা ইসাখিলও জানালেন, ‘আমি সাক্ষাৎকার দেওয়া বা মিডিয়ার মুখোমুখি হওয়া থেকে দূরে থাকি, ব্যাটিংয়েই মনোযোগ দিতে চাই।’ বাবা নবীর চাওয়াও সেটিই। তা হলেই না জাতীয় দলে বাবা-ছেলের একসঙ্গে খেলার স্বপ্ন পূরণ হবে!