
উসমান খাজার একই অঙ্গে কত রূপ!
ব্যাটসম্যান খাজা ভীষণ সহিষ্ণু, ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখান এবং স্ট্রোক খেলায় অভিজাত। কিন্তু মানুষ খাজা একটু অন্য রকম। অকপট, ঋজু এবং সোজা ব্যাটে খেলার মতো সোজা কথাটা সোজা করেই বলেন।
সে জন্যই মাঝেমধ্যে বিপ্লবী হয়ে ওঠেন। যুদ্ধের বিরুদ্ধে ও মানবাধিকার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেন। ফিলিস্তিনের সমর্থনে কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামেন। আইসিসির নিয়মের তোয়াক্কা করতে চান না। জুতায় শান্তির প্রতীক পায়রাসংবলিত স্টিকার পরে মাঠে নামেন। ফিলিস্তিনের পক্ষে রিটুইট করে চাকরি হারানো সাংবাদিকের পাশে দাঁড়ান। প্রকাশ্যে অবস্থান নেন জুয়ার বিরুদ্ধে। অ্যাশেজে নিজের দেশের পিচকে ‘আবর্জনা’ বলতেও এতটুকু পরোয়া করেন না।
সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (এসসিজি) আজ অবসরের সময় জানিয়ে দেওয়ার ঘোষণায় দুই রকম খাজাকেই দেখা গেল। ক্রিজে পরিমিত স্ট্রোক খেলার মতোই মাইক্রোফোনের সামনে খাজা যেমন বিনয়ী ছিলেন, তেমনি ১৫ বছরের ক্যারিয়ারে বর্ণবাদ ও বৈষম্য নিয়ে কথা বলার সময় এতটুকু রাখঢাক রাখেননি।
খাজা যে চলতি অ্যাশেজে সিডনিতে শেষ টেস্ট খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়বেন, সেটা এতক্ষণে প্রায় সবারই জানা। মা–বাবার সঙ্গে চার বছর বয়সে পাকিস্তান থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন খাজা। এসসিজি থেকে খুব কাছেই কুক রোডের এক বাসায় বেড়ে উঠেছেন। ছোটবেলায় সেই রাস্তায় অস্ট্রেলিয়ার সাবেক টেস্ট ওপেনার মাইকেল স্ল্যাটারকে ফেরারি চালাতে দেখে তাঁর ভেতরও রোমাঞ্চ জেগে উঠেছিল—একদিন তিনিও অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট খেলবেন, যা খুশি চালাতে পারবেন!
যদিও ‘পাকিস্তান থেকে আসা শ্যামবর্ণের গর্বিত মুসলিম’ খাজা নিজে জানিয়েছেন তাঁকে বলা হয়েছিল ‘কখনো অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলার সুযোগ পাবেন না।’ কিন্তু ভাগ্যের লিখন ছিল অন্য রকম। একমাত্র এশিয়ান হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলা খাজার অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতেই কাটল ১৫ বছর। টেস্ট খাতায় নামের পাশে যোগ হলো ১৬ সেঞ্চুরি, ৬ হাজারের বেশি রান ও ৪৩.৩৯ গড়। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সংস্করণ মিলিয়ে ৪৯টি ম্যাচ খেললেও ‘উসমান খাজা’ নামটি শুনে সবার আগে মনে পড়ে—টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার টপ অর্ডারে বড় ভরসা।
এমন যাঁর ক্যারিয়ার, সেই মানুষটা অবসর ঘোষণায় কেমন বিনয়ী শুনুন, ‘ক্রিকেটের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তা আমাকে আমার কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি কিছু দিয়েছেন। তিনি আমাকে এমন সব স্মৃতি দিয়েছেন, যা আমি আজীবন বয়ে বেড়াব; দিয়েছেন এমন বন্ধুত্ব, যা খেলাধুলার গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে; আর দিয়েছেন এমন শিক্ষা, যা মাঠের বাইরের মানুষ হিসেবে আমাকে গড়ে তুলেছে। তবে কোনো ক্যারিয়ারই একার নয়—এ পথে আমি নিঃসন্দেহে অনেকের সহায়তা পেয়েছি।’
আবার এই খাজাই বর্ণবাদ ও বৈষম্য নিয়ে বলেন, তখন এক শান্ত ও পরিশীলিত নদী থেকে যেন আগুনমুখো, ‘ছোটবেলায় লোকে জানতে চাইত, আমি কোথা থেকে এসেছি। তখন পাকিস্তান বলতে লজ্জা পেতাম; কারণ, আমাদের “কারি (ঝোলের তরকারি) খাওয়া মানুষ” বলে তাচ্ছিল্য করা হতো। তাই বলতাম সৌদি আরব।’
কিংবা খাজার এই কথাটা শুনুন, ‘অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলে মানিয়ে নিতে আমি অনেক চেষ্টা করেছি। বাকিদের মতো পোশাক পরার চেষ্টা করেছি। তাদের সঙ্গে ক্লাবে গিয়েছি, যদিও মদ পান করিনি। এমন সব চেষ্টাই করেছি, কিন্তু কাজ হয়নি। তবু বারবার অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল থেকে বাদ পড়তে হয়েছে। বুঝতে পারছি, আমার নাম জন স্মিথ নয়। যখন ৫০-৫০ সিদ্ধান্তের সময় আসে, তখন সাধারণত সেটা আমার পক্ষে যায় না।’
অস্ট্রেলিয়ারই সংবাদমাধ্যম ‘সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’ মনে করে, ৩৯ বছর বয়সে খাজার এই অবসর ঘোষণার সিদ্ধান্তটা হুট করে নেওয়া হয়নি। ওই যে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও না পারার অভিঘাত, আলোচনা-সমালোচনা এবং বেশ কিছু ঘটনার সামষ্টিক ফলই হলো অ্যাশেজে অ্যাডিলেড টেস্টের আগে ছবিটা পরিষ্কার হয়ে যাওয়া। সেটা ছিল এই সিরিজের তৃতীয় টেস্ট। আগের টেস্টে না খেলা খাজাকে অ্যাডিলেডেও শুরুতে দলে রাখা হয়নি। স্টিভেন স্মিথ শেষ মুহূর্তে অসুস্থ হয়ে পড়ায় খেলার সুযোগ পান। খাজার ক্যারিয়ারে বাদ পড়াটা নতুন কিছু না হলেও বারবার এসবের শিকার হওয়া আর কতদিনই–বা সহ্য করা যায়!
সংবাদমাধ্যমটি হিসাব কষে জানিয়েছে, খাজা তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারে ৮ বার দল থেকে বাদ পড়েছেন। টেস্ট অভিষেকের (২০১১) বছর দুবার, ২০১৩ ও ২০১৬ সালে একবার করে, ২০১৭ সালে দুবার, ২০১৯ সালে একবার এবং গত বছর একবার। আবার দলেও ফিরেছেন অন্য কোনো খেলোয়াড়ের দুর্ভাগ্যের সুযোগে—২০২২ সালে ট্রাভিস হেড কোভিডে আক্রান্ত হওয়ায় সিডনিতে ফিরে যেমন ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরি করেন, চলতি অ্যাশেজে স্মিথের অসুস্থতায় অ্যাডিলেডে সুযোগ পাওয়ার কথা তো আগেই বলা হলো।
অ্যাশেজে পার্থ টেস্টের আগে গলফ খেলতে গিয়ে পিঠে চোট পান খাজা। সেই চোটে পার্থে ইনিংস ওপেন করতে পারেননি, খেলতে পারেননি ব্রিসবেনে পরের টেস্টেও। সংবাদমাধ্যম থেকে সাবেকদের কাছে এ জন্য তুলাধুনা হতে হয়। খাজার জবাবটা শুনুন, ‘অসংখ্য উদাহরণ দিতে পারি, যারা (ম্যাচে) আগের দিন গলফ খেলে চোট পেয়েছে, কিন্তু আপনারা কিছু বলেননি। কেউ কিছুই বলেননি। এমনও উদাহরণ দিতে পারব, যারা আগের রাতে প্রচুর পান করার পর চোট পেয়েছে। কিন্তু কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। ঠিক আছে, তারা তো অস্ট্রেলিয়ারই একটু দুষ্টু বাচ্চা, তাই না? কিন্তু যখন আমি চোট পেলাম, সবাই আমার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং মানুষ হিসেবে আমি কেমন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।’
এতটা বছর অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলে নিজেকে নিংড়ে দিয়েও খাজাকে তাই বলতে হয়, ‘নিজেকে তাই আমার সব সময় (দলে বাকিদের চেয়ে) একটু আলাদা মনে হয়েছে। এমনকি সেটা এখনো। যেভাবে আমার সঙ্গে আমার সঙ্গে আচরণ করা হয়েছে, যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেসব কারণে আলাদা মনে হয়েছে।’
অবসর ঘোষণায়—মানে ক্যারিয়ারের একদম শেষ সময়ে এসে খাজা তাহলে এতটা বিস্ফোরক হয়ে উঠলেন কেন? শুনুন তাঁর মুখেই, ‘আমি চাই পরবর্তী উসমান খাজার অভিযাত্রাটা আলাদা হোক। আমি চাই, আপনারা তার সঙ্গে সমান আচরণ করুন, কোনো বর্ণবাদী আচরণ নয়। তাদের প্রতি তেমন আচরণ করুন, আমার সঙ্গে খেলা অন্য সব ক্রিকেটারের সঙ্গে যেমন করা হয়।’
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত এক সাংবাদিকের ঘটনাও টানেন খাজা। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ভারতে। তাঁর একাধিকবার বর্ণবাদ কিংবা বৈষম্যের শিকার হওয়ার ঘটনাও সামনে আনেন খাজা, ‘গত দুই বছরে আমি আপনাকে কতবার সাহায্য করেছি, যখন নিরাপত্তাকর্মীরা আটকে দিয়েছে? যত দূর মনে পড়ে অন্তত চারবার, আপনাকে সাহায্য করেছি। এমনকি এ বছর পার্থেও...এগুলো সব সময়ই ঘটছে। আপনারা দেখতে পান না, এই যা!’
কিন্তু খাজা দেখতে পান এবং তার কারণটা সম্ভবত তিনি ধারাবাহিকভাবে এসবের শিকার হয়ে আসছেন। এ নিয়ে তাঁর মনে অথই সাগর পরিমাণ দুঃখ থাকতেই পারে। কিন্তু সেসবে ডুবেও মাইকের সামনে এমন কথা বলতে পারেন কজন, ‘কোনো পক্ষ নিয়ে আমি এসব বলছি না। কারণ, আমি আমার অভিযাত্রাটা ভালোবাসি। এখন আমি যা, সে জন্য কৃতজ্ঞ।’
খাজা এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের আওতায় কিন্তু বছরে পর বছর যাঁরা তাঁর সঙ্গে এমন আচরণ করেছেন, সেসব মানুষও আছেন। নইলে কি আর তিনি এমন খাজা হয়ে উঠতে পারতেন! আগামী রোববার থেকে শুরু হতে যাওয়া সিডনি টেস্টে সেই খাজাকে দেখতে আপনাকে আমন্ত্রণ। অবশ্য সিডনিতে খেলবেন কি না, সেই নিশ্চয়তা নেই। সংবাদ সম্মেলনে আজ যা বলেছেন, তাতে কী ঘটে, কে জানে!