বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ২৯০/৫ পাকিস্তান: ৫০ ওভারে ২৭৯ ফল: বাংলাদেশ ১১ রানে জয়ী।
শাহিন আফ্রিদির ব্যাট থেকে তীব্র গতিতে ধেয়ে আসা বলটা সরাসরি আঘাত করল তাঁর বাঁ হাঁটুতে। মাটিয়ে লুটিয়ে পড়লেন বোলার মোস্তাফিজুর রহমান। কী হবে এখন? ৪৯তম ওভার সেটি, ওভার শেষ করতে বাকি আরও একটি বল। মোস্তাফিজ কি করতে পারবেন বলটা? ওই ওভারে তার আগেই আফ্রিদির দুই ছক্কায় যে ব্যবধানও কমিয়ে এনেছে পাকিস্তান!
স্নায়ুক্ষয়ী কিছু মুহূর্ত কাটল শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে। তবে প্রাথমিক শুশ্রূষা শেষে ঠিকই উঠে দাঁড়ালেন মোস্তাফিজ। স্লোয়ার ছুড়লেন, যেটিতে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে লং অনে ক্যাচ হারিস রউফ। বাংলাদেশ যেন তখনই জিতে গেছে ম্যাচ! শেষ ওভারে এক উইকেট হাতে নিয়ে ১৪ রান দরকার ছিল পাকিস্তানের। কিন্তু রিশাদ হোসেনের করা ৫০তম ওভারে মাত্র ২ রানই নিতে পেরেছেন পাকিস্তানের শেষ দুই ব্যাটসম্যান শাহিন আফ্রিদি আর আবরার আহমেদ। রিশাদ হোসানের করা শেষ ওভারে যখন ২ বলে ১২ রানের সমীকরণ, ওয়াইড দিলেন আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা। তবে তাৎক্ষণিক রিভিউ নিয়ে সেই সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করে বাংলাদেশ। স্নিকোমিটারে দেখা গেল বলটি আফ্রিদির ব্যাট ছুঁয়েছে। এরপর ১ বলে ১২ রানের লক্ষ্যের সামনে দাঁড়িয়ে শেষ বলে তো স্টাম্পডই হয়ে গেলেন আফ্রিদি! রুদ্ধশ্বাস নাটকীয় ম্যাচটা তাতে বাংলাদেশ জিতে গেল ১১ রানে। এ জয়ে ২-১ ব্যবধানে সিরিজও বাংলাদেশের।
১৮ বলে ৩৩, ১২ বলে ২৮—বাংলাদেশের ২৯০ রানের জবাবে এভাবেই এগোচ্ছিল পাকিস্তান। প্রথম তিন ওভারেই ৩ উইকেট হারিয়ে নড়বড়ে শুরুর পরও জয়ের স্বপ্নটা তাদের জন্য ধরে রেখেছিলেন মূলত সালমান আগা। কিন্তু দলকে জয়ের একেবারে কাছে নিয়েও তাঁকেও ফিরতে হয় হতাশা নিয়ে।
৪৭তম ওভার শেষে ৩৩ রান দরকার ছিল পাকিস্তানের। ৪৮তম ওভারের প্রথম তিন বলে তাসকিন আহমেদ দিলেন ৩ রান। চতুর্থ বলেই তাসকিনের স্লোয়ারে ছক্কা মারতে গিয়ে ডিপ মিড উইকেটে নাজমুল হোসেনের ক্যাচ সালমান। পাকিস্তানের জয়ের আশা আসলে শেষ হয়ে যায় ওখানেই। মাঠে ব্যাট ছুড়ে মারেন সালমান। এবার অবশ্য অন্য কারও ওপর রেগে নয়, রাগটা খোদ নিজের ওপর। দলকে জয়ের খুব কাছে নিয়েও যে আউট হয়ে গেলেন তিনি!
এর আগে বাংলাদেশ ইনিংসে একটা দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানই হয়েছে বলতে হয়। তানজিদ হাসানের তো বটেই, বাংলাদেশ দলের জন্যও। ৩০টি ওয়ানডে খেলে ফেললেও এর আগে তিন অঙ্কের দেখা পাননি। ওদিকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের পর গতকালের আগপর্যন্ত বাংলাদেশ ১২টি ওয়ানডে খেললেও এ সময়ে সেঞ্চুরি পাননি দলের কোনো ব্যাটসম্যান। দুবাইয়ে ভারতের বিপক্ষে সে ম্যাচে ওয়ানডেতে দলের হয়ে শেষ তিন অঙ্কের দেখা পেয়েছিলেন তাওহিদ হৃদয়।
তানজিদের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে দুটি অপেক্ষারই অবসান হলো কাল শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে। এটা ঠিক যে মিরপুরের উইকেটে পেসারদের বল কাল কিছুটা এদিক-সেদিক হচ্ছিল, টার্ন পেয়েছেন স্পিনাররাও। তাই বলে ব্যাটিংটা অনেক বেশি কঠিন ছিল, তা–ও নয়। ওপেনার তানজিদের জন্য যে কথাটা একেবারেই প্রযোজ্য নয়, সেটি তাঁর ৯৮ বলে সেঞ্চুরি আর ১০৭ বলে ১০৭ রানের ইনিংসেই প্রমাণিত। ৭ ছক্কার সঙ্গে ৬ চার। ৪৭ বলে করা ফিফটিতে ছক্কা ছিল ৪টি, ৩টি চার।
শুরু থেকে যেভাবে খেলছিলেন, সেঞ্চুরি তানজিদের প্রাপ্য ছিলই; সেটা কতটা রাজকীয়ভাবে করতে পারেন, দেখার ছিল সেটাও। ব্যক্তিগত ৯৪ রান থেকে ওয়ানডেতে প্রথম তিন অঙ্কে পৌঁছেছেন ডাউন দ্য উইকেটে এসে সালমান আগাকে লং অফ দিয়ে ছক্কা মেরে। সেঞ্চুরির উদ্যাপনে দুই হাত প্রসারিত করে আকাশের দিকে তাকালেন তানজিদ। তবে সেঞ্চুরির পর আর বেশি এগোতে পারেননি। আবরার আহমেদের নির্বিষ এক বলে শর্ট কাভারে শাহিন আফ্রিদির হাতে সহজ ক্যাচ তুলে দিয়ে ফিরে যান ড্রেসিংরুমে।
বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হৃদয়ের অপরাজিত ৪৮ রান আসে ৪৪ বলে, লিটন ৫১ বলে ৪১। বাংলাদেশের রান অনেকটা থেমে গিয়েছিল ওখানেই। বাংলাদেশের ৫ উইকেটে করা ২৯০ রানের ইনিংসে তানজিদের সেঞ্চুরির ওপর নির্ভরতা কতটা, তা তো বোঝাই যাচ্ছে। হারিস রউফের করা ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই একটি করে চার আর ছক্কা এসেছে তানজিদের ব্যাট থেকে। ষষ্ঠ ওভারে একই বোলারকে মারা তাঁর ছক্কাটা গেছে পয়েন্টের ওপর দিয়ে। ১১তম ওভারে আবরার আহমেদ বা ১২তম ওভারে ফাহিম আশরাফকে মারা ছক্কাগুলোতেও ফুটে উঠছিল পাকিস্তানের বোলারদের ওপর তানজিদের শাসনের ছবি।
তানজিদ-সাইফের ১০৫ রানের ওপেনিং জুটিটাই বাংলাদেশের বড় রানের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছিল। শাহিন আফ্রিদিকে তেড়েফুঁড়ে মারতে গিয়ে সাইফ বোল্ড হয়ে না গেলে এই জুটি যেতে পারত আরও অনেক দূর। নাজমুল আর লিটনের সঙ্গে মাঝারি দুই জুটির পর তানজিদও ফিরে গেলে হঠাৎই লাগাম পড়ে বাংলাদেশের রানের গতিতে।
পাওয়ারপ্লেতে বিনা উইকেটে ৫০ হয়ে যাওয়ার পর ১৮তম ওভারেই বাংলাদেশের রান ১০০ পার। রান ২০০ হয়েছে ৩৮তম ওভারে, সেখান থেকে সাড়ে তিন শ করার স্বপ্ন দেখাটাও অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু ৩৭তম ওভারে দলের ১৯৪ রানে তানজিদের বিদায়ের পর গতি কমতে থাকে রানের। উইকেটে থিতু হয়ে যাওয়া তানজিদের মতো শট খেলাটা হয়তো সহজ ছিল না নতুন ব্যাটসম্যানদের জন্য। আবার হৃদয়ের বাউন্ডারি পাওয়া আত্মবিশ্বাসী শটগুলো দেখে মনে হচ্ছিল, চাইলে তো রান করাই যায়! তবু শেষ ১০ ওভারে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে জমা হয় মাত্র ৭৭ রান। শেষ ৫ ওভারে সংখ্যাটা ৩৯ এবং এই ৫ ওভারে বাউন্ডারি আসে মাত্র দুটি; যেটি আধুনিক ওয়ানডের ব্যাটিংয়ের সঙ্গে একদমই বেমানান।
তারপরও বোলারদের সৌজন্যে শেষ হাসিটা বাংলাদেশেরই। ২০১৫ সালের পর এটিই দুই দলের প্রথম ওয়ানডে সিরিজ। ২০১৫–তে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ জয়ের পর এবার তা এল ২-১–এ।