
প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ছিলেন পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি। ছিলেন আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ এবং বিসিসিআই সহসভাপতি রাজীব শুক্লাও। শুধু চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক দ্বৈরথ দেখতে নয়, এ ম্যাচে যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জড়িত এবং সে কারণেই যে এসব ক্রিকেট–প্রশাসকেরা গ্যালারিতে, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
অসুবিধা হতে পারে পাকিস্তান আসলে কী খেলল, সেটা বুঝতে। মাঠের বাইরে এই কদিন রাজনৈতিক লড়াইয়ে ভারতকে এতটুকু ছাড় দেয়নি পাকিস্তান। কিন্তু আসল যে কাজ—মাঠের লড়াই; সেখানে পাকিস্তানের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছিল ভারতই। টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের এই ম্যাচে আগে ব্যাট করে ৭ উইকেটে ১৭৫ রান তোলে ভারত। তাড়া করতে নেমে ১৮ ওভারে ১১৪ রানে অলআউট হয় পাকিস্তান। ৬১ রানের জয়ে ‘এ’ গ্রুপে শীর্ষস্থান নিয়ে সুপার এইটে উঠল ভারত।
এই ম্যাচের টিকিট কালোবাজারে বিক্রি হয়েছে চার গুণ বেশি দামে। ভারত থেকে শ্রীলঙ্কা যাওয়ার ফ্লাইটের টিকিটের দামও চড়ে গিয়েছিল অনেক। কলম্বোর হোটেলগুলো হয়ে গিয়েছিল পরিপূর্ণ। কিন্তু এমন একপেশে হয়ে ওঠা ম্যাচ দর্শকদের জন্য একটু হতাশাজনকই।
আরও একটি বিষয় ভুললে চলবে না। ক্রিকেট–প্রশাসকদের গ্যালারিতে এনে আইসিসির চেষ্টা ছিল ভারত–পাকিস্তানের মধ্যে বৈরিতা কমিয়ে আনা। কলম্বোয় গতকাল সেটা কতটুকু হয়েছে, তা আইসিসিই ভালো বলতে পারবে। তবে দর্শক দেখলেন, এবারও টসের আগে বা পরে হাত মেলাননি ভারত ও পাকিস্তানের অধিনায়ক। এ নিয়ে অবশ্য তেমন কোনো আলোচনাও নেই। ভারত–পাকিস্তান ম্যাচে যেন এটাই স্বাভাবিক এখন!
তবে কেউ সম্ভবত জানতেন না যে টসে জিতে আগে ফিল্ডিংয়ে নামা পাকিস্তানের হয়ে প্রথম ওভারটা করবেন অধিনায়ক সালমান আগা নিজে! আরও আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর সেই ওভারে এই ম্যাচের সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাটসম্যান অভিষেক শর্মা শূন্য রানে আউট। কিন্তু তারপর যা হলো, সেটা স্রেফ ঈশান কিষানের ‘দাদাগিরি’—৮.৪ ওভারে আউট হওয়ার আগে ৪০ বলে করেছেন ৭৭।
তৃতীয় উইকেটে তিলক বর্মাকে নিয়ে ৪৬ বলে ৮৭ রানের জুটি গড়েন ঈশান। যেখানে তিলকের অবদান মাত্র ৮ বলে ১১! ২৭ বলে তুলে নেন ফিফটি, যেটা আবার টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচে দ্রুততম।
তারপরও দলের রানটা ২০০ না হওয়ার পেছনে পাকিস্তান বোলারদের ভালো বোলিংয়ের চেয়ে ভারতের ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতাই বেশি। স্কোরগুলো দেখুন—সূর্যকুমার ২৯ বলে ৩২, তিলক ২৪ বলে ২৫। মিডল অর্ডারে দুজনের স্ট্রাইক রেটই প্রশ্নবিদ্ধ। ১৭ বলে ২৭ করা শিবম দুবে শেষ দিকে একটু হাত না খুললে ভারতের স্কোর আরও ১০–১৫ রান কমত।
সেটির আরেকটি কারণ হতে পারে প্রেমাদাসার মন্থর উইকেট। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, বল ব্যাটে আসছে না। সুযোগটা স্পিনারদের দিতে পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান পেসার শাহিন আফ্রিদিকে দিয়ে মাত্র ২ ওভার বোলিং করান। ৩১ রানে ১ উইকেট নেওয়া শাহিনও বুঝেছেন দিনটা তাঁর নয়। মোট ৭ বোলারের মধ্যে বাকি ৬ জনই স্পিনার, যেটা টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ স্পিনার ব্যবহারের রেকর্ড। ২৫ রানে ৩ উইকেট নেওয়া সাইম তাঁদের মধ্যে ছিলেন সবচেয়ে কার্যকর।
ভারতের এই স্কোর টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বোচ্চ। রানটা তাড়া করতে নেমে পাকিস্তানের যেভাবে শুরু করা দরকার ছিল, সেটা তারা পারেনি। প্রথম ৩ ওভারে স্কোর দাঁড়ায় ৩ উইকেটে ১৩! সাহিবজাদা ফারহান ফেরেন প্রথম ওভারে হার্দিক পান্ডিয়ার বলে। পরের ওভারে যশপ্রীত বুমরা তুলে নেন সাইম আইয়ুব ও সালমানকে। পরে পাকিস্তানকে আরও বিপদে ফেলেন বাবর আজম। ৭ বলে ৫ রান করা বাবর আউট হন পঞ্চম ওভারে। ৫ ওভার পর পাকিস্তানের স্কোর ছিল ৪ উইকেটে ৩৪।
শাদাব ও উসমানের খানের পঞ্চম উইকেটে ৩৯ রানের জুটিতে ১০ ওভার পর সেটাই ৪ উইকেটে ৭১। ৩৪ বলে ৪৪ রান করা উসমান আউট হন পরের ওভারেই। পাকিস্তানের ইনিংসে এটাই সর্বোচ্চ রানের জুটি। আর ইনিংসে সর্বোচ্চ রান উসমানের। ফাহিম আশরাফ ও শাহিন আফ্রিদির ১৯ এবং শেষ উইকেটে শাহিন ও উসমান তারিকের ১৭ রানের জুটিতে এক শ পেরোতে পারে পাকিস্তান। প্রথম ১০ ওভার পাড়ি দেওয়ার পর পরবর্তী ৮ ওভারে ৪৩ রানে শেষ ৬ উইকেট হারায় পাকিস্তান। ভারতের হয়ে ২টি করে উইকেট বরুণ চক্রবর্তী, অক্ষর প্যাটেল ও হার্দিক পান্ডিয়ার।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ভারত: ২০ ওভারে ১৭৫/৭ (ঈশান ৭৭, সূর্যকুমার ৩২, দুবে ২৭, তিলক ২৫; সাইম ৩/২৫, সালমান ১/১০, উসমান ২৪/১)।
পাকিস্তান: ১৮ ওভারে ১১৪ (উসমান ৪৪, শাহিন ২৩*, শাদাব ১৪, বাবর ৫, সাইম ৬, সালমান ৪; বুমরা ২/১৭, পান্ডিয়া ২/১৬, অক্ষর ২/১৭, বরুন ২/১৭)।
ফল: ভারত ৬১ রানে জয়ী।
ম্যাচসেরা: ঈশান কিষান (ভারত)