আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে স্পেনকে ফেবারিট হিসেবে দেখছি আমি। কারণ হলো, এই বিশ্বকাপে কি পারফরম্যান্স ইনডিকেটর বা কেপিআইয়ের ১২ থেকে ১৪টি প্রধান সূচক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্পেন আর্জেন্টিনার চেয়ে এগিয়ে।
বিশেষ করে ডিসটেন্স কভারিং, পাসিং পজিশনিং এবং কাউন্টার প্রেসিংয়ের মতো সূচকগুলোতে স্পেনের পারফরম্যান্স চোখে পড়ার মতো। বল পজেশনিং আর কাউন্টার প্রেসিংয়ে তো রীতিমতো ভয়ংকর ওরা।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ইংল্যান্ড বা সুইজারল্যান্ড কিছু সূচকে এগিয়ে ছিল। ফাইনালেও বেশি থাকতে পারে স্পেনের। তা ছাড়া ৬ সেকেন্ডের মধ্যে বল দ্রুত বল পুনরুদ্ধার করার রুলসে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সফল স্পেন।
বিল্ডআপে স্পেনের খেলার কিছু নির্দিষ্ট ছক রয়েছে, যা অনেক সময়ই প্রতিপক্ষ সহজে ধরতে পারে না। ধরুন, স্পেনের বিল্ডআপ আটকাতে আর্জেন্টিনা হাই প্রেস করল, তখন যদি স্পেনের মাঝমাঠে রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইজকে ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজ মার্ক করেন, এমন পরিস্থিতিতে যে জায়গাটা বের হবে, দানি ওলমো তা কাজে লাগাতে পারেন।
মাঝখানে বিল্ডআপের সময় স্পেনের শেপ অনেকটা ৩-৩-১-৩ হয়ে যায়, এতে মাঝমাঠে তাদের প্রাধান্য থাকে। যদিও আর্জেন্টিনার চারজন মিডফিল্ডার থাকেন সব সময়, তারপরও ওলমো আর রুইজের মুভমেন্ট এবং পজিশন বদল স্পেনের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করবে।
তাঁদের সঙ্গে রাইট ব্যাক পেদ্রো পোরো আর লেফট ব্যাক মার্ক কুকুরেয়া যোগ দেবেন। তখন মাঝমাঠে আর্জেন্টিনার ৪-এর বিপরীতে স্পেন ৫ হয়ে যাবে। এ কারণে বল সহজেই স্পেন প্রতিপক্ষের অ্যাটাকিং থার্ডে নিয়ে যেতে পারবে। স্পেনের শেপটা তখন হয়ে যাবে ৩-২-৫।
আর্জেন্টিনার রক্ষণে দুই হাফ স্পেস আর দুই উইংও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে স্পেন। সেটা ঠিকঠাক হলে ডানে ইয়ামাল আর পোরো আর বাঁ দিকে কুকুরেয়া ও আলেক্স বায়েনাকে সামলানো কঠিন হতে পারে আর্জেন্টিনার জন্য। এভাবেই খেলাই বর্তমান স্পেন দলটির খেলার একটা বৈশিষ্ট।
এমন ছকে বিপক্ষ দল অনেক সময়ই ধাঁধায় পড়ে। আগের ম্যাচগুলোর দেখেছি, আর্জেন্টিনা এই ধাঁধা থেকে বেরোতে পারেনি। তা কাজে লাগিয়ে স্পেন দল আর্জেন্টিনার হাফ স্পেস থেকে প্রচুর কাট ব্যাক বা লো ক্রস করতে পারে।
আর্জেন্টিনা হাই প্রেস না করে মিড ব্লকে চলে এলে তাদের শেপটা থাকতে পারে ৪-৪-২। তখন স্পেনের উইং ব্যাকরা ওপরে যাবেন এবং মিড ব্লকে দুই লাইনের মাঝখানের জায়গাটা কাজে লাগাবেন।
এই বিশ্বকাপে দুদলই সাতটি করে ম্যাচ খেলেছে। স্পেনের প্রতিটি খেলোয়াড় টেকনিক্যালি আর্জেন্টাইনদের চেয়ে এগিয়ে। শারীরিকভাবেও তাঁরা অনেক বেশি দ্রুতগতিসম্পন্ন ও চটপটে এবং তাঁদের কাছ থেকে ট্যাকল করে বল কেড়ে নেওয়া বেশ কঠিন।
স্পেন গত চার বছর ধরে নিজেদের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ভাবার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছে দে লা ফুয়েন্তের অধীনে। তবে এই স্পেনের লো ব্লক সহজে ভাঙতে না পারার একটা দুর্বলতা আছে। কেপ ভার্দে আর পর্তুগালের বিপক্ষে তা দেখা গেছে। আর্জেন্টিনা লো ব্লকে গেলে স্পেন অবশ্য তখন প্রচুর উইং প্লে করতে পারে এবং বিহাইন্ড দ্য ব্লক খেলতে পারে।
আর্জেন্টিনার মূল শক্তি হলো তাদের ‘উইনিং কালচার’ বা জেতার মানসিকতা। আর এই মানসিকতা ভাঙার একমাত্র উপায় হিসেবে স্পেন অনেক বেশি কাউন্টার প্রেসিং করবে। মেসিকে আটকাতে সফল হয়নি অন্য দলগুলো।
তবে আমার ধারণা, মেসিকে নিষ্প্রভ রাখতে স্পেনের রদ্রি কার্যকর হতে পারেন। ম্যান ও জোনাল মার্কিংয়ে রদ্রি বেশ পারদর্শী। যদি কোনোভাবে রদ্রি ব্যর্থ হন, তাহলে তাঁকে সহায়তা দিতে রুইজ প্রস্তুত থাকবেন। এসব কারণে আমার মনে হচ্ছে, আজ স্পেনই জিতবে।
লেখক: ফুটবল কোচ ও বিশ্লেষক