বিশ্বকাপের আঁচ নেই যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার যে তিন শহরে

চারদিকে বিশ্বকাপ নিয়ে উন্মাদনা। বিশ্বমঞ্চে ফুটবলারদের পায়ের জাদুতে বুঁদ হতে তৈরি কোটি কোটি দর্শক। কিন্তু এই ডামাডোলেও উত্তর আমেরিকার তিনটি বড় শহর একদম শান্ত। মন্ট্রিয়ল, শিকাগো আর মিনিয়াপোলিস—এই তিন শহরে বিশ্বকাপের কোনো উন্মাদনা নেই, নেই কোনো প্রস্তুতিও।

কয়েক বছর আগে যখন ফিফা ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল, এই তিন শহর তখন সোজাসুজি ‘না’ বলে দিয়েছিল। আজ যখন বিশ্বকাপের দামামা বাজছে, তখন এই তিন শহরের কর্তারা নিজেদের সিদ্ধান্তে একদম অটল। তাঁদের মনে কোনো আক্ষেপ নেই।

এমনিতে কানাডার মন্ট্রিয়ল খেলাধুলার জন্য পাগল শহর বলা যায়। কিন্তু ফিফার লোভনীয় প্রস্তাবের চেয়ে নিজেদের পকেটের হিসাব এবং পুরোনো ঐতিহ্যকে তারা বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ১৯৭৬ সালের অলিম্পিক আয়োজন করে যে ঋণের জালে শহরটি পড়েছিল, তা শোধ করতেই লেগেছিল দীর্ঘ তিন দশক। সেই পুরোনো ক্ষত তারা আর তাজা করতে চায়নি।

২০১৮ সালে মন্ট্রিয়লে বিশ্বকাপ ম্যাচ আয়োজনের সম্ভাব্য খরচ ধরা হয়েছিল পাঁচ কোটি কানাডিয়ান ডলার। ২০২১ সালের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ কোটি ৩০ লাখ ডলারে। কুইবেকের প্রাদেশিক সরকার তখনই এই রাজকীয় খরচ থেকে হাত ধুয়ে ফেলে। কুইবেকের বর্তমান পর্যটনমন্ত্রী আমেলি দিওন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহারে আমাদের সরকার একটি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আজ পেছনে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, সেটাই একদম সঠিক ছিল।’

কুইবেকের পর্যটনমন্ত্রী আমেলি দিওন

সাবেক পর্যটনমন্ত্রী ক্যারোলিন প্রুলু বলেছেন, ফিফা নাকি দাবি করেছিল, মন্ট্রিয়ল অলিম্পিক স্টেডিয়ামে তাদের ভিআইপি অতিথিদের জন্য নতুন লিফট তৈরি করতে হবে এবং স্টেডিয়ামের ছাদটি এমন হতে হবে, যা খোলা ও বন্ধ করা যায়! এখানেই শেষ নয়, মে মাসের শেষ থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত শহরের প্রধান দুটি পাবলিক প্লেস—পার্ক জঁ-দ্রাপো এবং ওল্ড পোর্ট সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে চেয়েছিল ফিফা। সেটি মেনে নিলে মন্ট্রিয়লের লাইফলাইন–খ্যাত ফর্মুলা ওয়ান রেস, মন্ট্রিয়ল ট্রায়াথলন এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘মন্ট্রিয়ল জ্যাজ ফেস্টিভ্যাল’ বন্ধ করে দিতে হতো। মন্ট্রিয়ল সেসব প্রস্তাবে রাজি হয়নি।

যেখানে ফর্মুলা ওয়ানের একটি রেস থেকেই মন্ট্রিয়ল ৬ কোটি ৭৪ লাখ কানাডিয়ান ডলার আয় করে, সেখানে ফিফার অনিশ্চিত আশ্বাসে তারা কেন পা বাড়াবে? তাই বিশ্বকাপকে এক পাশে সরিয়ে মন্ট্রিয়ল এবার মেতেছে জ্যাজ ফেস্টিভ্যালে। আর সেই সঙ্গে ধুমধাম করে উদ্‌যাপন করছে ’৭৬ অলিম্পিকের ৫০ বছর পূর্তি। যেখানে ‘নাদিয়া’ নামের ৫০ জন ভাগ্যবতী নারী সুযোগ পাবেন জিমন্যাস্টিকসের কিংবদন্তি নাদিয়া কোমানেচির সঙ্গে দেখা করার!

একইভাবে শিকাগো ও মিনিয়াপোলিস—যুক্তরাষ্ট্রের এই দুই শহরও ২০১৮ সালে ফিফার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। কারণটা একই, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ফিফার একগুঁয়েমি।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় ১১ জুন শুরু হবে বিশ্বকাপ

মিনিয়াপোলিসের ক্রীড়া সংগঠক ম্যাট মুনিয়ের যেমনটি বলছিলেন, ২০১৮ সালে তাঁরা যখন সুপার বোল আয়োজন করেছিলেন, তার শতভাগ খরচ এসেছিল করপোরেট স্পনসরদের কাছ থেকে। কিন্তু বিশ্বকাপের জন্য যখন সেই স্পনসরদের কাছে গিয়ে বলা হলো, ‘সুপার বোলের খরচের চেয়ে এবার কয়েক গুণ বেশি টাকা দিতে হবে,’ তখন তারা সোজা জিজ্ঞেস করলেন, ‘সরকারি অনুদান কোথায়?’ কিন্তু শহর বা রাজ্য সরকারের কাছে তখন সেই তহবিল ছিল না। উপরন্তু স্টেডিয়ামের চারপাশে দুই মাস অন্য কোনো ইভেন্ট করা যাবে না—ফিফার এমন কঠিন শর্ত মেনে নেওয়া মিনিয়াপোলিসের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই তারা এবার বিশ্বকাপের সময় মেতেছে ডব্লুডব্লুই সামার স্ল্যাম আর স্পেশাল অলিম্পিকস নিয়ে।

শিকাগোর গল্পটাও একই রকম। তৎকালীন মেয়র রাহম ইমানুয়েল সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, করদাতাদের টাকা নিয়ে জুয়া খেলা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। ফিফার আলোচনা করার কোনো মানসিকতাই ছিল না। তাই শিকাগো এবার তাদের ঐতিহ্যবাহী সোলজার ফিল্ড স্টেডিয়ামে ফিফার ফুটবল ম্যাচের বদলে মরগান ওয়ালেন, এড শিরান কিংবা কারোল জির মতো বিশ্বখ্যাত তারকাদের কনসার্ট দিয়ে স্টেডিয়ামের গ্যালারি ভরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উজবেকিস্তানের ফুটবল–ভক্তদের চেয়ে এড শিরানের ভক্তরা যে তাদের বেশি মুনাফা দেবে, তা শিকাগো ভালো করেই জানে!

মন্ট্রিয়ল মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে কানাডার বাকি দুই আয়োজক শহর টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভারকে। রেডিও-কানাডার অনুসন্ধান বলছে, টরন্টোর প্রাথমিক খরচ যেখানে ধরা হয়েছিল মাত্র ৪ কোটি ৫০ লাখ কানাডিয়ান ডলার, তা এখন এসে ঠেকেছে ৩৮ কোটি ডলারে! আর ভ্যাঙ্কুভারের খরচ ২৪ কোটি থেকে লাফিয়ে চলে গেছে ৬২ কোটি কানাডিয়ান ডলারে!

সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার সদরদপ্তর

তা ছাড়া ফিফা যেভাবে আয়োজক শহরগুলোর ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে, তাতে অনেক শহরই বিরক্ত। হিউস্টনের অ্যাস্ট্রোডোম কিংবা লস অ্যাঞ্জেলেসের ইউটিউব থিয়েটারের মতো ব্যস্ত ভেন্যুগুলো মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুলাই পর্যন্ত একদম ‘অন্ধকার’ করে রাখতে বাধ্য করেছে ফিফা।

সব ম্যাচের অর্থনৈতিক গুরুত্বও এক নয়। কানসাস সিটি যেখানে আর্জেন্টিনা বা নেদারল্যান্ডসের ম্যাচ পেয়ে হোটেলের ভাড়া আকাশচুম্বী করে ফেলেছে, সেখানে সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া পড়েছে বিপাকে। জর্ডান, কাতার, আলজেরিয়া বা প্যারাগুয়ের মতো দলগুলোর ম্যাচ থাকায় সেখানে টিকিটের দাম তো কমছেই, হোটেলের রুমও খালি পড়ে আছে। এর ওপর আছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি ও ভিসা–জটিলতার ভয়। এত ঝামেলায় কে যেতে চায়!