এফসি থুনের মাঠ স্টকহোম অ্যারেনা
এফসি থুনের মাঠ স্টকহোম অ্যারেনা

লেকের ধারে রূপকথা: সুইস ফুটবল নাড়িয়ে দেওয়া থুনের গল্প

আল্পসের কোলঘেঁষা ছোট্ট শহর। সামনে নীলচে হ্রদ। পেছনে পাহাড়ের সারি। ছবির মতো সেই শহরের নাম থুন। জনসংখ্যা মাত্র ৪৫ হাজার। অথচ এই শান্ত শহরটাই এখন সুইস ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দু। যেন গল্পের বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা এক বিস্ময়। যে গল্পের নাম—এফসি থুন।

ছোট শহর, বড় স্বপ্ন

গত গ্রীষ্মে সুইস ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ঘোষণা দেয়, তাদের নতুন অ্যাসোসিয়েশন সেন্টার ‘সুইস ফুটবল হোম’ হবে থুনে। খবরটা তখনো বড় ছিল। কিন্তু এর চেয়েও বড় গল্প লিখতে শুরু করে স্থানীয় ক্লাব এফসি থুন।

পাঁচ বছর দ্বিতীয় বিভাগে কাটানোর পর ২০২৫ সালে আবার সুপার লিগে ওঠে দলটি। মৌসুম শুরুর আগে তাদের লক্ষ্য ছিল খুব সাধারণ—অবনমন এড়ানো। স্কোয়াডের খরচও ছিল লিগের দলগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এমন দল নিয়ে কি আর বড় কিছুর স্বপ্ন দেখা যায়! কিন্তু ফুটবল মাঝেমধ্যে নিজের নিয়ম নিজেই ভেঙে দেয়।

রূপকথার দৌড়

মৌসুম যত গড়িয়েছে, থুন তত বদলেছে। এখন তারা শিরোপা জয়ের একদম দোরগোড়ায়। ক্লাব ইতিহাসে প্রথম লিগ শিরোপা হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাদের।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সর্বশেষ হেরেছে থুন। এরপর ১৩ ম্যাচে ১২ জয়। লিগে সবচেয়ে বেশি গোল তাদের, সবচেয়ে কম গোল হজম করার রেকর্ডও তাদেরই দখলে। থুন যা চাচ্ছে, তা–ই হচ্ছে। যেন কোনো গল্পকার খুব যত্ন করে লিখেছেন তাদের গল্প।
এখনো নিয়মিত মৌসুমের তিন ম্যাচ বাকি। এরপর চ্যাম্পিয়নশিপ গ্রুপে আরও পাঁচটি। কিন্তু আট ম্যাচ হাতে রেখেই নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সেন্ট গ্যালেনের চেয়ে থুন এগিয়ে ১৬ পয়েন্টে।

দারুণ এক মৌসুম কাটাচ্ছেন এফসি থুনের খেলোয়াড়রা

সুইজারল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলো? তারা অনেক পেছনে পড়ে গেছে। জেরদান শাকিরির নেতৃত্বে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বাসেল। একসময় দাপট দেখানো ইয়াং বয়েজ। জুরিখের দুই ঐতিহ্যবাহী ক্লাব—সবাই যেন দূরের দর্শক।

আরেক বড় দল গ্রাসহপার্স তো উল্টো অবনমন এড়ানোর লড়াইয়ে। গত সপ্তাহে থুনের কাছে তারা হেরেছে ৫-১ গোলে। স্টকহর্ন অ্যারেনায় সেদিনের ম্যাচে ছিল ১০ হাজার দর্শক। মানে থুন শহরের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ গ্যালারিতে! এমন দৃশ্য ছোট শহরকে বড় করে দেয়।

পুরোনো দিনের ছায়া

এই গল্প শুনলে অনেকের মনে পড়বে ২০১৬ সালে লেস্টার সিটির শিরোপা জয়ের কথা। আবার একটু ইতিহাস ঘাঁটলে পাওয়া যাবে ১৯৯৮ সালে কাইজারস্লাউটার্নের সেই বিস্ময়। সুইজারল্যান্ডেও এমন ঘটনা একবার ঘটেছে। ১৯৫২ সালে গ্রাসহপার্স দ্বিতীয় বিভাগ থেকে উঠে এসেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তবে তারা ছিল মাত্র ১ পয়েন্টে এগিয়ে। থুনের আধিপত্য তার চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট।

দুই নায়কের প্রত্যাবর্তন

২০০৫ সালে থুন লিগে দ্বিতীয় হয়েছিল। সেটাই এখন পর্যন্ত তাদের সেরা ফল। সেই দলে ছিলেন দুই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়—মাউরো লুস্ট্রিনেল্লি ও আন্দ্রেয়াস গেরবার। তাঁদের নেতৃত্বেই থুন চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা করে নিয়েছিল।

আজকের এই রূপকথায়ও তাঁরা আছেন। লুস্ট্রিনেল্লি এখন দলের কোচ। গেরবার ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ও স্পোর্টিং ডিরেক্টর। যেন গল্পের দুই পুরোনো চরিত্র নতুন অধ্যায়ে ফিরে এসে আবার আলো জ্বালিয়েছেন। গেরবার ২০০৯ সালে অবসর নেওয়ার পর থেকেই ক্লাবের সঙ্গে আছেন। লুস্ট্রিনেল্লি কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন ২০২২ সালে।

স্টকহোম অ্যারেনায় কি এবার লিগ জয়ের উৎসব হবে? উত্তর মিলবে কিছুদিনের মধ্যেই

তারকার ঝলক নয়, দলই তারকা

থুনের দলে আন্তর্জাতিক তারকার ছড়াছড়ি নেই। তবু কিছু নাম আলাদা করে চোখে পড়ে। ৩২ বছর বয়সী অধিনায়ক মারকো বুর্কি—রক্ষণের স্তম্ভ। তিনি বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের সাবেক গোলরক্ষক রোমান বুর্কির ছোট ভাই। মাঠে তাঁর উপস্থিতি মানেই দল নিশ্চিন্ত।

লিওনার্দো বের্তোনে—যাঁর ফ্রি-কিক আর ক্যারিশমা দেখে সুইজারল্যান্ডে লোকে তাঁকে ‘সুইস বেকহ্যাম’ বলে ডাকতে শুরু করেছে।

তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম ফ্রান্‌ৎস-এথান মাইখত্রি। বয়স মাত্র ২০। অনূর্ধ্ব-২১ দলে খেলেন। মিডফিল্ডে তাঁর গোল করার ক্ষমতা ইতিমধ্যে বড় ক্লাবগুলোর নজর কাড়ছে। জাতীয় দলে ডাক, বিশ্বকাপ খেলা—সবই যেন সামনে অপেক্ষা করছে।

দলে তিনজন সিনিয়র আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়ও আছেন। এলমিন রাস্টোডার খেলেন উত্তর মেসিডোনিয়ার হয়ে। ব্রাইটন লাবো মার্টিনিকের। ম্যাত্তিয়াস কাইট এস্তোনিয়ার।
জার্মান ডিফেন্ডার ডমিনিক ফ্রাঙ্কে—আরেকটি মজার গল্প। আরবি লাইপজিগের একাডেমিতে বেড়ে ওঠা এই ফুটবলার ২০২৩ সালে ইনগলস্টাড ছেড়ে কিছুদিন ক্লাবহীন ছিলেন। পরে যোগ দেন থুনে। একেক খেলোয়াড় একেক দেশ থেকে এসেছেন ঠিকই, কিন্তু থুন লেকের পাড়ে এসে তাঁরা সবাই এখন এক সুরের বাউল।

এফসি থুনের স্কোয়াড। এখন স্বপ্নপূরণের শেষ ধাপে

স্বপ্নের শেষ ধাপে

ফুটবলে কখনো কখনো সব যুক্তি হার মানে। ছোট শহর বড় গল্প লেখে। নামহীন খেলোয়াড়েরা নায়ক হয়ে ওঠেন। আর দর্শকেরা বোঝে—এই খেলাটা শুধু গোল আর পয়েন্টের নয়, এটা স্বপ্নেরও। থুন এখন সেই স্বপ্নের একদম শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে।
আর একটু পথ। আর কয়েকটা ম্যাচ। তারপর? হয়তো একদিন বলা হবে— ‘ছোট শহর থুন, কিন্তু গল্পটা ছিল বিশাল।’