যুক্তরাষ্ট্রে গত বছরের ক্লাব বিশ্বকাপে ঝড়–বৃষ্টির কারণে লম্বা সময় বন্ধ ছিল বেনফিকা–অকল্যান্ড সিটি ম্যাচ
যুক্তরাষ্ট্রে গত বছরের ক্লাব বিশ্বকাপে ঝড়–বৃষ্টির কারণে লম্বা সময় বন্ধ ছিল বেনফিকা–অকল্যান্ড সিটি ম্যাচ

বিশ্বকাপের ‘ভিলেন’ যখন আবহাওয়া

বিশ্বকাপ মানেই গোলের উল্লাস, পতাকার রং, রাত জাগা আর আবেগের বিস্ফোরণ; কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে ফুটবল–দুনিয়ায় নতুন এক প্রতিপক্ষ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রতিপক্ষটির নাম ‘আবহাওয়া’।

আর মাত্র এক মাস পর শুরু হচ্ছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর। যৌথ আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। তিন দেশজুড়ে স্টেডিয়াম প্রস্তুত, দলগুলোও শেষ মুহূর্তের পরিকল্পনায় ব্যস্ত। কিন্তু মাঠের বাইরের বড় প্রশ্ন এখন—এই গ্রীষ্মের আবহাওয়া কি বিশ্বকাপের ছন্দ বদলে দিতে পারে?

কারণ, উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্ম শুধু রোদেলা নয়। এখানে আছে প্রচণ্ড গরম, আর্দ্রতা, বজ্রঝড়, তাপপ্রবাহ, এমনকি দাবানলের ধোঁয়াও। এমন এক বিশ্বকাপের অপেক্ষায় ফুটবলবিশ্ব, যেখানে প্রতিপক্ষ শুধু অন্য দল নয়, প্রকৃতিও।

ফিফারও উদ্বেগ

গরম আবহাওয়াকে সম্ভাব্য বড় সমস্যা হিসেবে ইতিমধ্যে স্বীকার করেছে ফিফা। খেলোয়াড়দের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে প্রতিটি ম্যাচের দুই অর্ধে বাধ্যতামূলক তিন মিনিটের ‘কুলিং ব্রেক’ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।

এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ আসেনি। গত বছরের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে গরম ও বজ্রঝড়ের কারণে ছয়টি ম্যাচে বিঘ্ন ঘটেছিল। সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছিল চেলসি ও বেনফিকা ম্যাচ নিয়ে। প্রায় দুই ঘণ্টা বন্ধ ছিল খেলা। সেই ম্যাচের পর চেলসির তৎকালীন কোচ এনজো মারেসকা বলেছিলেন, ‘এ ধরনের টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত সঠিক জায়গা নয়।’

কতটা গরম হতে পারে

বিশ্বকাপের আয়োজক শহরগুলোর অনেকগুলোই গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমের জন্য পরিচিত। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল ও মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চলে দিনের তাপমাত্রা সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। তাপপ্রবাহ এলে সেটি ৪০ ডিগ্রিও ছুঁতে পারে।

তবে সমস্যা শুধু থার্মোমিটারের সংখ্যায় নয়, আসল ভয় আর্দ্রতায়। আর্দ্রতা বেশি থাকলে শরীর ঘামের মাধ্যমে সহজে ঠান্ডা হতে পারে না। ফলে অনুভূত তাপমাত্রা বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়। এই বিশ্বকাপে তাই বারবার শোনা যাবে একটি শব্দ, ‘ফিলস লাইক’। অর্থাৎ শরীরে ঠিক কতটা গরম লাগছে।

ক্লাব বিশ্বকাপের ম্যাচে কুলিং ব্রেকে স্প্রিংকলার্সের পানিতে শীতল হচ্ছেন বেনফিকার নিকোলাস ওতামেন্দি

যেমন মায়ামিতে তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও আর্দ্রতার কারণে সেটি অনেক সময় ৪৩ ডিগ্রির মতো অনুভূত হতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক হলো ‘ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার’ বা ডব্লিউবিজিটি। এটি মাপা হয় শরীরের ওপর তাপের চাপ কতটা পড়ছে তা বোঝার জন্য। সাধারণভাবে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ডব্লিউবিজিটিকে বিপজ্জনক সীমা ধরা হয়। কারণ, এই পর্যায়ে তাপজনিত চাপ অভিজাত ক্রীড়াবিদদের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে শুরু করে।

২০২৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব বায়োমিটারোলোজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৬টি আয়োজক শহরের মধ্যে ১৪টিতেই গ্রীষ্মের দুপুরে ডব্লিউবিজিটি ২৮ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয়—মায়ামি , হিউস্টন, ডালাস, মন্তেরেই, কানসাস ও আটলান্টা শহরে বিকেলের দিকে এই সূচক ৩২ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এটিকে বলা হয় ‘চরম তাপজনিত চাপ’। এমন অবস্থায় শরীরের জন্য নিজেকে ঠান্ডা রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।

এই বিশ্বকাপে তাই বারবার শোনা যাবে একটি শব্দ, ‘ফিলস লাইক’। অর্থাৎ শরীরে ঠিক কতটা গরম লাগছে।

সূচি বদলে গরমকে হারানোর চেষ্টা

ঝুঁকি কমাতে বেশির ভাগ ম্যাচ রাখা হয়েছে বিকেল বা সন্ধ্যায়। অর্থাৎ দিনের তুলনামূলক ঠান্ডা সময়ে। যেমন গ্রুপ ‘সি’তে স্কটল্যান্ড বনাম ব্রাজিল ম্যাচ শুরু হবে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টায়। কিছু স্টেডিয়ামে বিশেষ প্রযুক্তিও রাখা হয়েছে। হিউস্টন ও ডালাসের স্টেডিয়ামগুলোতে আছে খোলা ও বন্ধ করা যায়, এমন ছাদ এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।

কিন্তু প্রকৃতির বিরুদ্ধে সব হিসাবই মাঝেমধে৵ অসহায় হয়ে পড়ে। কারণ, উত্তর আমেরিকায় গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহ খুবই সাধারণ ঘটনা। এ সময় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্বকাপ ফাইনালের উদাহরণই ধরা যাক। আগামী ১৯ জুলাই নিউইয়র্ক সিটিতে স্থানীয় সময় বেলা তিনটায় হবে ফাইনাল। তাপপ্রবাহ দেখা দিলে তাপমাত্রা ৩৪ থেকে ৩৬ ডিগ্রিতে পৌঁছাতে পারে। ডব্লিউবিজিটিও প্রায় ৩০ ডিগ্রি ছুঁতে পারে, যা শরীরের জন্য ভয়ংকর চাপ তৈরি করতে সক্ষম।

ভাবুন তো, বিশ্বকাপ ট্রফির জন্য লড়াই চলছে; আর খেলোয়াড়দের শরীর তখন লড়ছে সূর্যের সঙ্গেও।

বজ্রঝড়—অদৃশ্য রেফারি

বিশ্বকাপের ম্যাচে সবচেয়ে দৃশ্যমান বিঘ্নের কারণ হতে পারে বজ্রঝড়।
উত্তর আমেরিকায় গ্রীষ্মের বিকেল মানেই অনেক শহরে কালো মেঘের আনাগোনা। বিশেষ করে মিয়ামি, হিউস্টন ও আটলান্টার মতো শহরে গরম ও আর্দ্রতার কারণে বিকেল–সন্ধ্যায় ঘন ঘন ঝড় তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো স্টেডিয়ামের ১০ মাইলের মধ্যে বজ্রপাত শনাক্ত হলে খেলা বন্ধ রাখতে হয়। শেষ বজ্রপাতের অন্তত ৩০ মিনিট পর আবার খেলা শুরু করা যায়।

সম্প্রতি বজ্রঝড়ের আশঙ্কায় মায়ামি গ্রাঁ প্রির সূচি তিন ঘণ্টা এগিয়ে আনা হয়েছিল। যে হার্ড রক স্টেডিয়ামের পাশে এই রেস হয়েছিল, সেখানেই বিশ্বকাপের একাধিক ম্যাচ হবে। সমস্যা হলো বজ্রঝড়ের সময় নির্ভুলভাবে আগে থেকে বলা খুব কঠিন। ফলে আয়োজকদের কাছে এটি সবচেয়ে অনিশ্চিত ঝুঁকিগুলোর একটি।

গত বছরের ক্লাব বিশ্বকাপে গরমের কারণে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের বদলি খেলোয়াড়েরা কাল মামেলোদি সানডাউনস–ডর্টমুন্ড ম্যাচের প্রথমার্ধটা দেখেছে লকার রুমে বসে

দাবানলের ধোঁয়া কি ঢুকে পড়বে বিশ্বকাপে

আরেকটি বড় উদ্বেগ—দাবানল। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দাবানলের মৌসুম শুরু হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে আগেই। বিভিন্ন অঞ্চলে ইতিমধ্যেই গড়ের চেয়ে বেশি দাবানল জ্বলছে। এই দৃশ্য নতুন নয়। ২০২৩ সালে কানাডার দাবানলের ধোঁয়া হাজার মাইল দূরে ছড়িয়ে পড়েছিল।

এমনকি নিউইয়র্ক সিটিসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে বায়ুমান বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছায়। বহু ক্রীড়া ইভেন্ট বাতিলও হয়েছিল।
তবে সমস্যা হলো, বায়ুমান কতটা খারাপ হলে ম্যাচ বন্ধ রাখতে হবে—সে বিষয়ে ফিফার নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই। ফলে পরিস্থিতি বুঝে এবং স্থানীয় জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আয়োজকদের।

দর্শকদের জন্যও কঠিন পরীক্ষা

শুধু খেলোয়াড় বা কোচ নন, দর্শকদের জন্যও এটি কঠিন বিশ্বকাপ হতে পারে। প্রচণ্ড গরমে স্টেডিয়াম বা ফ্যান জোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকা কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে। বজ্রঝড় হলে ম্যাচ দেরিতে শুরু হতে পারে। কখনো দর্শকদের সাময়িকভাবে সরিয়েও নিতে হতে পারে।

ম্যাচ পিছিয়ে গেলে ভ্রমণ পরিকল্পনাও এলোমেলো হতে পারে। গভীর রাতে খেলা শেষ হলে হোটেল বুকিং, পরিবহন—সবকিছুতেই ঝামেলা বাড়তে পারে। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের মতো দেশের দর্শকদের অনেক ম্যাচই দেখতে হবে গভীর রাতে। তার ওপর যদি বজ্রঝড়ের কারণে খেলা থেমে থেমে চলে, তাহলে রাত আরও দীর্ঘ হবে।