মার্টিন ফ্রেডরিখ ও তাঁর সঙ্গীনী জ্যাকুলিন
মার্টিন ফ্রেডরিখ ও তাঁর সঙ্গীনী  জ্যাকুলিন

‘৬০ বছর পার হলে বিয়েটা সেরে নেব’

বাংলাদেশের আর্চারির সোনালি সময়ের রূপকার তিনি। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পথ দেখাচ্ছেন লাল-সবুজ তির–ধনুকধারীদের। বাংলাদেশের কোনো খেলায় টানা আট বছর কাজ করা দীর্ঘতম বিদেশি কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখই। বাংলাদেশের জল–হাওয়ার সঙ্গে নিজের জার্মান পরিচয়কে মিশিয়ে ফেলা আট বছরের ‘বাংলাদেশি জীবন’ সাফল্যের খতিয়ান ছাপিয়ে এ দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসার দৃষ্টান্তও।

রোমান সানা, দিয়া সিদ্দিকীদের বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করা ফ্রেডরিখের জীবন মূলত টঙ্গীর আর্চারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ। থাকেন উত্তরায় একটি মিনি ডুপ্লেক্স বাসায়, একাকী। কিছুদিন আগপর্যন্তও সঙ্গী ছিল পোষা একটি বিড়াল। সেটি এখন আর নেই। রাত ১০টার আগে ঘুমিয়ে পড়েন। ৬টায় ঘুম থেকে উঠে সকাল ৭টায় চলে যান টঙ্গীর আর্চারি একাডেমিতে। সকালের নাশতা আর দুপুরের খাবার এখানেই। দেখভাল করেন খেলোয়াড়দের খাওয়াদাওয়াও।

গুলশানের জার্মান ক্লাবটি তাঁর পছন্দের জায়গা হওয়ার কথা ছিল। যাতায়াতের জন্য বাংলাদেশ আর্চারি ফেডারেশন তাঁকে একটা গাড়ি দিলেও চাইলেই সেখানে যাওয়া হয় না। কারণ, ঢাকার যানজট। ফ্রেডরিখ বলেন, ‘সন্ধ্যা ৬টায় টঙ্গী থেকে রওনা দিলে জ্যাম ঠেলে গুলশান যেতে দেড় ঘণ্টা লাগে। আসা-যাওয়ার ধকলই অনেকটা সময় খেয়ে ফেলে।’ বছরে বড়জোর তিন-চারবার সেখানে ঢুঁ মারা হয়। অবসর কাটে বাসায় বই পড়ে কিংবা জার্মান টিভি দেখে। সিনেমা খুব বেশি না টানলেও প্রামাণ্যচিত্র দেখতে ভালোবাসেন। জার্মান রাজনীতির খবরও রাখেন নিয়মিত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী ঘটছে, সেটাও তাঁর অজানা নয়। নিয়মিত পড়েন বাংলাদেশের একটি ইংরেজি দৈনিক।

তা আট বছরে বাংলা কতটা রপ্ত করলেন? সম্প্রতি টঙ্গীর আর্চারি একাডেমির মাঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা শুনে হেসে ভাঙা ভাঙা বাংলায় ফ্রেডরিখ বলেন, ‘বামে যাও’, ‘ডানে যাও’, ‘এখানে থামো’। এমনকি রিকশা চালকদের ‘ভাংতি নাই’ কথাটাও তাঁর মুখস্থ।
কোভিডের সময় অবসরে বাংলা শেখার জোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ইংরেজি, জার্মান আর স্প্যানিশে দক্ষ এই কোচ বিনয়ের সঙ্গেই স্বীকার করলেন, বাংলাটা ঠিক আয়ত্তে আসেনি। এতে সুবিধাই হয়েছে খেলোয়াড়দের। কোচের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাঁদেরও ইংরেজিটা ঝালিয়ে নেওয়া হয়।

ফ্রেডরিখের পছন্দ বাংলাদেশের মানুষের বন্ধুত্বসুলভ আচরণ আর বাংলা খাবার। বাংলায় স্পষ্ট করে বলেন, ‘বিরিয়ানি, রাইস, সবজি, মুরগি, মাটন ভালো লাগে।’ কাঁটাযুক্ত মাছও নাকি খান। খেলার সূত্রে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, টাঙ্গাইল, নড়াইলসহ কয়েকটি জেলায় গিয়ে গ্রামীণ পরিবেশ উপভোগ করেছেন। এ দেশের প্রকৃতি তাঁর ভালো লাগে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। টঙ্গী মাঠের পাশের যানজট, পদচারী–সেতুতে গাড়ি যাতায়াত, অনবরত গাড়ির হর্ন আর বায়ুদূষণে তিনি ভীষণ বিরক্ত। পরিবেশ নিয়ে সচেতনতার অভাব দেখে ব্যথিত হয়ে ফ্রেডরিখ বলেন, ‘মানুষ এখানে–সেখানে ময়লা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করে, দেখতেও খারাপ লাগে।’

নিজের কাজে মগ্ন ফ্রেডরিখ

২৫ বছর ধরে ফ্রেডরিখের সঙ্গিনী জ্যাকুলিন থাকেন জার্মানিতে। এখনো বিয়ে করেননি। ৫৭ বছর বয়সী ফ্রেডরিখ বললেন, ‘পশ্চিমা সংস্কৃতিতে পার্টনারশিপের জন্য সব সময় চুক্তি বা কাগজের প্রয়োজন হয় না। হয়তো চাকরি ছাড়ার পর ৬০ বছর পার হলে বিয়েটা সেরে নেব!’

জ্যাকুলিন সরকারি চাকরি থেকে এ বছরই অবসরে যাচ্ছেন। বাংলাদেশে কখনো আসেননি, আসতে চানও না। তবে ফ্রেডরিখ যখন দল নিয়ে তুরস্ক বা অন্য কোনো দেশে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে যান, সেখানে আসেন। এভাবেই চলে তাঁদের দেখা-সাক্ষাৎ।

ফুটবলে জার্মানির চারবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা অন্য জার্মানদের মতো ফ্রেডরিখেরও গর্ব, বুন্দেসলিগার খবরও টুকটাক রাখেন। কিন্তু তাঁর অন্যতম পছন্দের খেলা ভলিবল। নিজে ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি লম্বা বলেই হয়তো ভলিবলের প্রতি এই প্রেম, জার্মানিতে টুকটাক খেলেছেনও ভলিবল।

বাংলাদেশে আসার আগে ফ্রেডরিখ ছয় বছর ছিলেন চিলির কোচ। তাঁর সাবেক জার্মান ছাত্রী লিসা উনরাহ ২০১৬ রিও অলিম্পিকে রুপা ও ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ জিতেছেন।

তবে মাত্র ৮–৯ বছর বয়সে বড় ভাইয়ের (যিনি আর্চার ছিলেন) হাত ধরে আর্চারিতে আসা ফ্রেডরিখ নিজের জীবনটাকে এই খেলার জন্যই উৎসর্গ করেছেন। আসবাবের ডিজাইনার একমাত্র ভাই একবার বাংলাদেশে এসে দুমাস ছিলেন। মা-বাবা গত হয়েছেন বেশ আগেই। মা ছিলেন স্কুলশিক্ষিকা, বাবা কাজ করতেন লাইব্রেরিতে।

বাংলাদেশে আসার আগে ফ্রেডরিখ ছয় বছর ছিলেন চিলির কোচ। তাঁর সাবেক জার্মান ছাত্রী লিসা উনরাহ ২০১৬ রিও অলিম্পিকে রুপা ও ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ জিতেছেন। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের রোমান সানার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে রুপা জয়, ২০২১ বিশ্বকাপে রোমান-দিয়ার মিশ্র দ্বৈতে ব্রোঞ্জ জয়ের সাফল্য যেমন তাঁকে আনন্দ দেয়, তেমনি রোমান-দিয়াদের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড় বা কোচদের দেশত্যাগ ব্যথিতও করে।

রান্নাঘরে ব্যস্ত ফ্রেডরিখ

২০১৭ সালে ডিসেম্বরে ঢাকায় প্রথম এসে এখানকার সবকিছু দেখেছেন। সিটি গ্রুপের পৃষ্ঠপোষণায় ‘তীর গো ফর গোল্ড’ কর্মসূচির আওতায় ২০১৮ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি কাজ শুরু করেন ৫ বছরের চুক্তিতে। পরে তা বাড়ে ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক পর্যন্ত। এখন লক্ষ্য একটাই, বাংলাদেশের আর্চারিকে আবার বিজয় মঞ্চে দেখা।

ফ্রেডরিখ প্রশাসনিক কাজ এবং পরিকল্পনায়ও বেশ পাকা। খেলোয়াড়দের তথ্য সংরক্ষণের কাজটা করেন যত্নের সঙ্গে। এ কাজে তাঁর প্রশংসা আর্চারি সংগঠকদের মুখে মুখে। মানুষ হিসেবে কোমল স্বভাবের ফ্রেডরিখের স্নেহের হাত সব সময়ই বাড়ানো থাকে খেলোয়াড়দের দিকে। তবে প্রশাসক হিসেবে তিনি বেশ কঠিনই। সে কারণেই সমর্থন করেনি রোমান-দিয়াদের যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো।

কিশোর বয়সে বার্লিনের মাঠে যে ছেলের হাতে প্রথম ধনুক উঠেছিল, তিনিই এখন বাংলাদেশের আর্চারির কান্ডারি। নিজের কোনো সন্তান নেই, কিন্তু বাংলাদেশের আর্চাররা তাঁর সন্তানের চেয়ে কোনো অংশে কম নন। ১৫ ফেব্রুয়ারি এ দেশে আট বছর পূর্ণ হওয়ার আগে তৃপ্তির হাসি হেসে ফ্রেডরিখ পরিষ্কার বাংলায় বলেন—‘পার্টি হবে!’