
সমুদ্রের তলদেশে রহস্যময় গ্যাস নিঃসরণের প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এ গ্যাস পৃথিবীর জলবায়ু ধ্বংসের গতিকে অভাবনীয়ভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সমুদ্রতলের নিচে জমে থাকা মিথেন গ্যাস অদৃশ্যভাবে বায়ুমণ্ডলে মিশে যাওয়ার এ ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের চক্রাকার ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এ আবিষ্কার প্রমাণ করে, জলবায়ু পরিবর্তনের যেসব মডেল আমরা বর্তমানে ব্যবহার করছি, সেখানে সমুদ্রতলের এ নিঃসরণকে আগে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। এ আবিষ্কারের ফলে বিশ্বজুড়ে সমুদ্র পর্যবেক্ষণ, জলবায়ু মডেলিং ও কার্বন নিঃসরণ ট্র্যাকিং প্রযুক্তির আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে উঠেছে।
সাধারণত শিল্পকারখানা বা তেল-গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্র থেকে যে গ্যাস নির্গত হয়, তার উৎস সহজেই শনাক্ত করা যায়। কিন্তু এমন ভুতুড়ে গ্যাস নিঃসরণ এমন এক প্রক্রিয়া, যার সুনির্দিষ্ট উৎস বা কারণ তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা কঠিন। বিজ্ঞানীরা গভীর সমুদ্রে সেন্সর ও স্যাটেলাইট–প্রযুক্তির সমন্বয়ে দেখেছেন, কোনো ধরনের শিল্প কর্মকাণ্ড নেই, এমন উন্মুক্ত সমুদ্র থেকেও অস্বাভাবিক মাত্রায় মিথেন গ্যাস বায়ুমণ্ডলে নির্গত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের গিল্ডফোর্ডে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব সারের স্কুল অব কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, এমন কিছু এলাকা থেকে মিথেন নির্গত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা ভৌগোলিক বা ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত স্থিতিশীল বলে এত দিন বিশ্বাস করা হতো।
বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রতলের নিচে মিথেন হাইড্রেটস বা কঠিন বরফসদৃশ মিথেন অণুগুলোর ভেঙে যাওয়ার কারণে এ নিঃসরণ ঘটছে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ‘আমরা এখন সমুদ্রের এমন সব এলাকা থেকে মিথেনের বুদ্বুদ্ উঠতে দেখছি, যেখানে আমরা তা আশা করিনি। এটি ইঙ্গিত দেয় যে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা অন্যান্য পরিবেশগত কারণ এ অকাল নিঃসরণের জন্য দায়ী।’
ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটনের বিজ্ঞানী টি জে লাইথন ও পি আর হোয়াইটের তথ্যমতে, মিথেন অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। ১০০ বছরের সময়সীমায় কার্বন ডাই–অক্সাইডের তুলনায় মিথেনের বৈশ্বিক উষ্ণায়নক্ষমতা ২৫ গুণের বেশি। ফলে সমুদ্রের তলদেশ থেকে নির্গত এ গ্যাস জলবায়ু পরিবর্তনের গতিকে বহু গুণে ত্বরান্বিত করতে পারে। এই ভুতুড়ে বা অদৃশ্য নিঃসরণের প্রধান সমস্যা হলো, এর অনিশ্চয়তা। কলকারখানার ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও সমুদ্রের উত্তাপের ফলে প্রাকৃতিকভাবে শুরু হওয়া এ চক্র নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। সমুদ্রের পানি যত উষ্ণ হবে, মিথেন হাইড্রেটস তত বেশি অস্থিতিশীল হয়ে গ্যাস ছেড়ে দেবে, যা বায়ুমণ্ডলকে আরও উত্তপ্ত করবে। বর্তমান বৈশ্বিক নিঃসরণের পর্যবেক্ষণব্যবস্থা মূলত স্থলভাগ ও শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক। ফলে সমুদ্রের মাঝখানে ঘটে যাওয়া এসব বিশাল পরিবর্তন দীর্ঘদিন শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া