সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র পরিচালিত ক্লাউড সিডিং ফ্লাইটে যুক্ত করা হয়েছে হাইগ্রোস্কপিক ফ্লেয়ার
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র পরিচালিত ক্লাউড সিডিং ফ্লাইটে যুক্ত করা হয়েছে হাইগ্রোস্কপিক ফ্লেয়ার

কৃত্রিম বৃষ্টি বাড়াতে কী উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত

কৃত্রিম বৃষ্টি (ক্লাউড সিডিং) নিয়ে গবেষণার জন্য তিনটি বড় প্রকল্পে প্রায় ৫৫ কোটি ৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। তিন দেশের তিনজন বিজ্ঞানীকে আগামী তিন বছরে ধাপে ধাপে এ অর্থ দেওয়া হবে। বছরে তাঁরা গড়ে ৬ কোটি ৭২ লাখ ৭০ হাজার টাকা করে পাবেন।

এসব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অন্যান্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমিরাতের পানিসংকট মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত বুধবার আবুধাবিতে অবস্থিত দেশটির জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র এ ঘোষণা দিয়েছে।

তিন বিজ্ঞানীর একজন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের ইকো সায়েন্স ওয়ার্কসের ডিক্সন মাইকেল। তাঁর দল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দুই ধরনের তরঙ্গ পাঠাতে সক্ষম রাডার ব্যবহার করে রাসায়নিক ছিটানোর সময় মেঘে কী ঘটে, তা খুঁজে বের করতে চেষ্টা করবে। তাঁদের কাজ অনুমানভিত্তিক গবেষণার বদলে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে কোন পদ্ধতি কৃত্রিম বৃষ্টি ঝরাতে সঠিকভাবে কাজ করে এবং কেন করে, তা নির্ধারণে সহায়তা করবে।

দ্বিতীয়জন হলেন অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিন্ডা জোয়ু। তিনি ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে একেবারে নতুন ক্লাউড সিডিং উপকরণ তৈরি করছেন। তাঁর দল কৃত্রিম বৃষ্টি ঝরানোর জন্য এমন উন্নত কণা (পার্টিকেল) তৈরি করবে, যা মেঘে বরফের স্ফটিক (ক্রিস্টাল) তৈরি করতে বর্তমান উপকরণের তুলনায় বেশি কার্যকর হবে। এআই কণাগুলোকে আরও উন্নত করতে সাহায্য করবে। তিনি আমিরাতের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্রে বিশেষ পরীক্ষামূলক সরঞ্জাম স্থাপন করবেন এবং দেশটির বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ দেবেন।

সবচেয়ে ব্যতিক্রমী প্রকল্পটি পেয়েছেন জার্মানির হোহেনহাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী অলিভার ব্রাঞ্চ। তিনি বৃষ্টি ঝরাতে মেঘে রাসায়নিক উপাদান ছিটানোর বদলে মাটির গঠন পরিবর্তন করতে চান। তিনি গবেষণা করে বুঝতে চাইবেন—কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় ভূমির গঠনের ধরন এবং ভূপৃষ্ঠের আকৃতি পরিবর্তন করলে প্রাকৃতিকভাবে এমন আবহাওয়া তৈরি করা যায় কি না, যার ফলে স্বাভাবিকভাবে বৃষ্টি হয়। তাঁর এ গবেষণা সফল হলে, তা কৃত্রিম বৃষ্টির মতো অস্থায়ী সমাধানের বাইরে স্থায়ী সমাধান পেতে সাহায্য করতে পারে।

দ্য ইউএই রিসার্চ প্রোগ্রাম ফর রেইন ইনহ্যান্সমেন্ট সায়েন্স ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে এ তিন প্রকল্পের জন্য গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান করেছিল। ৪৮টি দেশ থেকে ১৪০টি গবেষণা প্রস্তাব জমা পড়েছিল। সেখান থেকে ১৬টি প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়। তারা পূর্ণ প্রস্তাব জমা দেয়। সেখান থেকে চূড়ান্তভাবে তিনটি প্রস্তাব বাছাই করা হয়।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) ও আমিরাতের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্রের প্রধান আবদুল্লাহ আল মানদুস বলেন, ‘ইউএই বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনকে কীভাবে সহায়তা করছে, তা এসব প্রকল্প থেকে বোঝা যায়। আমরা তিন বিজ্ঞানী ও তাঁদের গবেষণা দলকে উন্নত অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেব, যা অনেক গবেষক সচরাচর পান না।’

দ্য ইউএই রিসার্চ প্রোগ্রাম ফর রেইন ইনহ্যান্সমেন্ট সায়েন্সের পরিচালক আলয়া আল মাজরুই বলেন, বিজয়ীরা শুধু অর্থ পাবেন, তা কিন্তু নয়। তাঁরা বিশ্বের এই খাতের বিজ্ঞানীদের নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে এবং আমিরাতের এযাবৎকালের গবেষণার ডেটা ব্যবহার করতে পারবেন।

প্রসঙ্গত, প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টি হওয়ার জন্য মেঘের ভেতরে থাকা জলীয় কণাগুলোকে বড় হতে হয়। কারণ, ছোট ছোট জলকণা সাধারণত বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে না। তাই রাসায়নিক ব্যবহার করে কৃত্রিম কণার মাধ্যমে জলকণাগুলোকে বড় করা হয়। এতে করে মেঘের ভেতরে জমে থাকা পানি বৃষ্টি বা তুষারে পরিণত হয়ে ঝরে পড়ে।

যেসব অঞ্চলে বৃষ্টিপাত প্রয়োজনের চেয়ে কম, সেখানে কৃত্রিম বৃষ্টি বা ক্লাউড সিডিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত (স্বল্প পরিসরে), সৌদি আরব, ভারত, রাশিয়া, তুরস্ক এবং অস্ট্রেলিয়ায় এখন পর্যন্ত কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি ঝরিয়েছে বলে জানা যায়।