
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট শেষ হতে না হতেই দ্বিতীয় দফার প্রচারে ঝড় তুলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। আজ শুক্রবার উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটিতে এক বিশাল জনসভায় যোগ দিয়ে মোদি দাবি করেন, প্রথম দফার ভোটেই বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার ইঙ্গিত মিলেছে।
রাজ্যের ১৫২টি আসনে প্রথম দফার ভোট গ্রহণ গতকাল সম্পন্ন হয়েছে। ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় তথা শেষ দফায় ১৪২টি আসনে ভোট গ্রহণ হবে। আজ সেই নির্বাচনের প্রচারে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি কলকাতায় অবস্থান করছেন। ভোরে কলকাতার গঙ্গার ঘাটে নৌবিহার ও পূজা অর্চনার মাধ্যমে দিন শুরু করেন তিনি।
এরপর পানিহাটির অমরাবতী মাঠে আয়োজিত জনসভায় যোগ দেন মোদি। এই কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী করা হয়েছে আরজি কর হাসপাতালে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হওয়া নারী চিকিৎসকের (যিনি অভয়া নামে পরিচিত) মা রত্না দেবনাথকে। ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট আরজি কর হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকালে ওই চিকিৎসক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। আদালতের রায়ে সঞ্জয় রায় নামের এক সিভিক ভলান্টিয়ারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও রত্না দেবনাথ একে ‘প্রকৃত ন্যায়বিচার’ হিসেবে মেনে নেননি। মেয়ের হত্যার পূর্ণাঙ্গ বিচার ও দোষীদের ফাঁসির দাবিতে তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
জনসভায় রত্না দেবনাথের পক্ষে ভোট চেয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘এই রাজ্যের জঙ্গলরাজ এক তরুণ চিকিৎসকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। তাঁর মা আজ মেয়ের হত্যার ন্যায়বিচারের দাবি নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন। প্রথম দফার ভোটেই পরিবর্তনের ঢেউ স্পষ্ট। মানুষ এখন বলছে, বদল চাই, বিজেপিকে ক্ষমতায় চাই।’
তৃণমূল কংগ্রেসের কড়া সমালোচনা করে মোদি বলেন, ‘প্রদীপ নেভার আগে যেমন হঠাৎ জ্বলে ওঠে, তৃণমূলের প্রদীপও এখন সেভাবেই জ্বলছে।’ তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘৪ মে ফল প্রকাশের পর তৃণমূলের গুন্ডাদের বিদায় নিতে হবে। নয়তো তাদের খুঁজে বের করে বিচার করা হবে।’
মোদি আরও অভিযোগ করেন, তৃণমূল ও কংগ্রেস নারীবিদ্বেষী। তাদের বিরোধিতার কারণেই দীর্ঘ সময় সংসদে নারী আসন সংরক্ষণ বিল পাস হয়নি। বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যে সিন্ডিকেট ও গুন্ডারাজ বন্ধ করে বেকার সমস্যার সমাধান এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে নতুন বাংলা গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
পানিহাটির সভা শেষে নরেন্দ্র মোদি দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে আরেকটি জনসভায় যোগ দেন।
আজ শুক্রবার সকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কলকাতার হাওড়া ব্রিজের কাছে গঙ্গা নদীতে নৌবিহার করেন। তিনি গোয়ালিয়র ঘাট থেকে নৌকায় চড়েন এবং গঙ্গা মাকে প্রণাম জানান। নৌকার মাঝি মহম্মদ আলী প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগেভাগে জানতাম না প্রধানমন্ত্রী আমার নৌকায় চড়বেন। ঘাটে আসার পর বিষয়টি জানলাম। গর্বে আমার বুক ভরে গেছে।’
এদিকে আজ সকালে কলকাতার নিউ টাউনে এক সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, ‘প্রথম দফার ১৫২টি আসনের মধ্যে বিজেপি ১১০টির বেশি আসনে জিতবে। ৫ মের পর এই বাংলায় বিজেপির সরকার দেখা যাবে।’ তৃণমূলের আমলে ১০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে দখল হওয়া সব জমি উদ্ধার করা হবে।
রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে অমিত শাহ ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব উড়িয়ে দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী হবেন এই বাংলারই ভূমিপুত্র। বাংলায় জন্ম নেওয়া, বাংলা মাধ্যমে পড়া কোনো এক বাঙালি নেতাই রাজ্যের হাল ধরবেন।’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনের ওপর ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশের ঘোষণাও দেন তিনি।
বিজেপির দাবির বিপরীতে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, বেশি ভোট পড়ার মানে হলো মানুষ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও এসআইআরের প্রতিবাদে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন। গতকাল ভোট শেষে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মমতা বলেন, ‘তৃণমূল হারতে পারে না। আমরা জিতেই বসে আছি। পরের দফায় বিরোধীদের দুরমুশ করব।’ দলের নেতা-কর্মীদের চাঙা করতে তাঁর এই ‘টনিক’ রাজনৈতিক মহলে বেশ চর্চিত হচ্ছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১২৫টি আসনে জয়ের আশা প্রকাশ করলেও দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেছেন, তৃণমূল প্রথম দফায় ১৩২টি আসনে জিতবে। তিনি বলেন, শুভেন্দু অধিকারীরা হার নিশ্চিত জেনে হতাশায় মাঠ গরম করার চেষ্টা করছেন।
দার্জিলিং থেকে মেদিনীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে গতকাল ভোট গ্রহণ হয়েছে। এখন সবার নজর ৪ মের দিকে। ওই দিনই জানা যাবে বাংলার ক্ষমতার মসনদে শেষ পর্যন্ত কারা বসছে।