
ভারতের স্বাধীনতা দিবসে নতুন করে সামনে চলে এল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বিরোধ। স্বাধীনতা দিবস অর্থাৎ ১৫ আগস্টের প্রাক্কালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সামাজিক মাধ্যমে তাঁর প্রোফাইল ছবিটির পরিবর্তন করেন এবং ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামে যাঁরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের ছবির একটি কোলাজ উপস্থাপন করেন। তৃণমূল কংগ্রেস তাদের সামাজিক মাধ্যমের প্রোফাইলে কোলাজটি ব্যবহার করে। তবে ওই ছবিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে বাদ দিয়েছেন। বিষয়টি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
অভিষেক ব্যানার্জি নামের এক ব্যক্তি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, তৃণমূল কংগ্রেস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইচ্ছাকৃতভাবে জওহরলাল নেহরুর নাম স্বাধীনতা দিবসে বাদ দিতে পারেন, তাঁদের যিনি প্রভু, সেই নরেন্দ্র মোদিকে সন্তুষ্ট করার জন্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিষেক তাঁর মেয়ের আঁকা একটি ছবি পোস্ট করেন। অভিষেকের পোস্ট করা ছবি ও মন্তব্য টুইট করে পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেস লিখেছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য ইতিহাসকে তুলে ধরল একটি শিশু। কারণ, তাঁরা ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর ছবি স্বাধীনতা দিবসের ছবি থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছেন রাজনৈতিক প্রভুদের সন্তুষ্ট করতে।
কংগ্রেসের এই বার্তার পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দলের পোস্ট করা ছবি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এ নিয়ে মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা।
ভারতে হিন্দু ও জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ এবং তাদের রাজনৈতিক শাখা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরুকে এখনো তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ মনে করে। এর কারণ নেহরু তাঁর সময়কালে বরাবরই ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেছেন এবং যেকোনো ধরনের হিন্দু আচার-অনুষ্ঠানকে ভারতের সংবিধানে বা সরকারি কাজকর্মে স্থান দেওয়ার কঠোর বিরোধিতা করেছেন। এই কারণে ভারতের অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যেমন মোহনদাস গান্ধী বা সুভাষচন্দ্র বোস প্রমুখকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো কাছে টেনে নিলেও, জওহরলাল নেহরুকে কখনোই তাঁরা মানতে পারেননি।
এদিকে কর্ণাটকের বিজেপি সরকার একটি তালিকা প্রকাশ করে ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামীদের নাম উল্লেখ করেছে। সেখানেও তারা জওহরলাল নেহরুর নাম বাদ দিয়ে দিয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে জওহরলাল নেহরুর নাম সরিয়ে দেওয়া মেনে নিতে পারেননি কংগ্রেসের অনেক নেতাই। কর্ণাটকের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং কংগ্রেসের নেতা সিধারামাইয়া বলেন, নেহরুর নাম বাদ দেওয়ার জন্য রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বাসাবারাজ বোম্বাইয়ের ক্ষমা চাওয়া উচিত।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে গত কয়েক মাসে জাতীয় স্তরে বিরোধী দলগুলোর সম্পর্কের অন্তত প্রকাশ্যে বেশ খানিকটা অবনতি হয়েছে। তার মধ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে বেশি। এর কারণ হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধারাবাহিকভাবে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে এবং দিল্লিতে বৈঠক করার বিষয়টি উঠে এসেছে। সপ্তাহ দুয়েক আগে দিল্লিতে তিনি প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপি, দিল্লিতে গিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করে যে এই বৈঠক হলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি আরও বিপদে পড়বে, কারণ মানুষ মনে করবেন বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের একটা সমঝোতা হতে চলেছে। তাঁদের আপত্তিতে কর্ণপাত না করে প্রধানমন্ত্রী মোদি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এই অবস্থায় সিপিআইএমসহ (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া মার্ক্সিস্ট) একাধিক বিরোধী দল দাবি তুলেছে মমতার সঙ্গে বিজেপির একটা বোঝাপড়া হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে অবশ্য অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, রাজ্যের স্বার্থে তিনি নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করেছেন, রাজ্যের প্রাপ্য টাকা পাওয়ার লক্ষ্যে।