
ভোটে শোচনীয়ভাবে হারার পর প্রথম প্রকাশ্যে কর্মসূচিতে এলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপির বিরুদ্ধে আন্দোলনের ঘোষণা দিলেন তিনি; বললেন, তাঁর লক্ষ্য রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বিজেপিকে হটানো।
বামফ্রন্টকে হটিয়ে ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস, দলীয় প্রধান মমতা হন মুখ্যমন্ত্রী। এরপরের দুটি নির্বাচনেও চলে তৃণমূলের জয়রথ। তবে গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে তাতে ছেদ ঘটে। ভোটে জিতে ক্ষমতায় বসেছে বিজেপি।
গত ৪ মে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান। বাড়িতেই থাকেন তিনি। তাঁর এই নীরবতায় দলের মধ্যে অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করেন। দলের মধ্যে ভাঙন দেখা দিয়েছে। রাজ্যের বহু পৌরসভার চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরের মধ্যে অনেকে তৃণমূল থেকে পদত্যাগ করেন। দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তারও হন কেউ কেউ।
এসব ঘটনার মধ্যেও মমতার মতো অন্তরালে ছিলেন তাঁর ভাইপো এবং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে গত ৩০ মে অভিষেক সোনারপুরে দলীয় এক কর্মসূচিতে যোগ দিতে গিয়ে লাঞ্ছিত হন।
তার দুই দিন পর আজ মঙ্গলবার মমতা প্রকাশ্যে ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে হাজির হন তৃণমূলের ধরনা কর্মসূচিতে। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ, পরীক্ষার জালিয়াতি ও বিজেপি সরকারের প্রতিহিংসামূলক আচরণের প্রতিবাদে এই কর্মসূচি ডেকেছিল তাঁর দল।
কলকাতার ধর্মতলার রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ে অবস্থান নেওয়ার কথা ছিল তৃণমূলের। কিন্তু পুলিশ অনুমতি দেয়নি। পরে ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে অনুমতি পাওয়ার পর সেখানে জড়ো হন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে হ্যান্ডমাইকে বক্তব্য দেন। তিনি শুরুতেই বলেন, ‘আমাকে এখানে মাইক ব্যবহার করতে দেয়নি পুলিশ। তাই হ্যান্ডমাইকে বলতে হচ্ছে।’
সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আবার বলেন, ভোটে কারচুপি করে জিতেছে বিজেপি। এই ফল তিনি মানেন না। বিজেপিকে হটানোর জন্য তাঁর আন্দোলন জারি থাকবে।
কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এসেই মানুষের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন শুরু করেছে বলে অভিযোগ করেন মমতা। তিনি বলেন, তার জবাব দিতে এবার মাঠে নেমেছে তৃণমূল। বাংলার মানুষ এই অত্যাচার বরদাশত করবে না।
কেন্দ্রের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে তৃণমূল নেতা বলেন, ‘ওরা আমাকে ভয় দেখিয়ে কিছুই করতে পারবে না। আমার আন্দোলন আটকাতে পারবে না। যেখানে ওরা আটকাবে, সেখানে আমরা বসে পড়ে অবস্থান ধর্মঘট চালিয়ে যাব। এই অত্যাচার ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই চালিয়ে যাব। প্রয়োজনে আমরা বিজেপির বিরুদ্ধে আন্দোলনে লালবাজার ঘেরাও করব, নবান্ন ঘেরাও করব, সব থানা ঘেরাও করব। বিজেপিকে এই রাজ্যপাট থেকে সরিয়ে ছাড়ব আমরা।’
বেলা দুইটার দিকে নিজের কালীঘাটের বাসভবন থেকে বেরিয়ে প্রথমে মেয়ো রোডে যান মমতা, সেখানে মহাত্মা গান্ধী এবং বি আর আম্বেদকরের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তিনি। এরপর আসেন ধর্মতলায়।
কর্মীদের বিশৃঙ্খলার কারণে মমতাকে দুবার বক্তব্য থামাতে হয়। এই কর্মসূচিতে তৃণমূলের সব নেতা বা বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন না। উপস্থিত ছিলেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, ডেরেক ও’ব্রায়েন, অশোক দেব, দোলা সেন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, মদন মিত্র, অসীমা পাত্র, কুনাল ঘোষ প্রমুখ।
নির্বাচনে হারের পর মমতার দলে এরই মধ্যে বিদ্রোহের আঁচ লেগেছে। বিধানসভায় বিধায়কদের উপস্থিতির স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ তুলে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা। ক্ষুব্ধ এই দুই বিধায়ক এবার এই রাজ্যে তৃণমূলের জয়ী ৮০ বিধায়কের মধ্যে যাঁরা মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সুর চড়িয়েছেন, তাঁদের মধ্য থেকে ৫০ জনের নাম এবং স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন।
জানা যাচ্ছে, এই বিদ্রোহী বিধায়কেরা বিধানসভায় বিরোধী আসনে তাঁদের নতুন দলনেতা নির্বাচন করতে যাচ্ছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য, তৃণমূলের নামে বিধানসভার বিরোধী আসনে বসে মমতাকে বাদ দেওয়া। তবে আজ বিধাসভার স্পিকার অনুপস্থিত থাকায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের আবেদন জমা দিতে পারেননি।
এসব ঘটনার পর এখন স্পস্ট হয়ে গেছে যে তৃণমূল ভাঙছে। কারণ, ইতিমধ্যে মমতা তাঁর দলের বিজয়ী ৮০ জন বিধায়ককে তাঁর বাড়িতে এক সভায় ডাকলে সেখানে মাত্র ২০ জন উপস্থিত হন। ফলে মমতাকে সেদিনের বৈঠক বাতিল করতে হয়।