
দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, সেই সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত করতে আগামী শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল মঙ্গলবার দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। তিনি ইরানকে এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে ‘সম্পূর্ণ ও নিরাপদভাবে’ খুলে দেওয়ার শর্ত জুড়ে দিয়েছেন।
নৌপথে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর বিভিন্ন দেশ একে স্বাগত জানিয়েছে।
রাশিয়া
ক্রেমলিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা আশা প্রকাশ করেছে, এই যুদ্ধবিরতির ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন ইউক্রেন বিষয়ে ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনা আবার শুরু করতে প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ পাবে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, রাশিয়া আশা করে শান্তি আলোচনা অব্যাহত রাখতে আগামী দিনগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করবে।
জাতিসংঘ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক এক বিবৃতিতে এ খবর জানান।
দুজারিক বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব সব পক্ষকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে’ এবং এ অঞ্চলে ‘স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ’ শান্তির পথ প্রশস্ত করতে যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আরও বলেন, বেসামরিক মানুষদের জীবন রক্ষা ও মানবিক দুর্ভোগ কমাতে অবিলম্বে সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ করা প্রয়োজন।
জাপান
জাপানের চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি মিনোরু কিহারা সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির খবরকে টোকিও ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে স্বাগত জানাচ্ছে এবং তারা ‘চূড়ান্ত চুক্তির’ অপেক্ষা করছে।
ইসরায়েল
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু খুদে ব্লগ লেখার সাইট এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, তিনি ইরানের ওপর ট্রাম্পের হামলা স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন। তবে লেবাননের ওপর এই যুদ্ধবিরতি তিনি মানবেন না।
ইরান যুদ্ধের মধ্যেই ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননে ইরান–সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে স্থল অভিযান চালাচ্ছে।
ইরাক
ইরাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুদ্ধবিরতির খবরকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, স্থায়ী সমাধান অর্জনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে হবে।
মন্ত্রণালয় থেকে আরও বলা হয়, ইরাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংকট মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানায় এবং সংলাপ ও কূটনীতির ভাষাকে অগ্রাধিকার দেয়। তারা এই যুদ্ধবিরতির প্রতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকা ও কোনো ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি থেকে বিরত থাকার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের প্রভাব ইরাকেও পড়েছে।
মিসর
মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ উপস্থাপন করছে, যা আলোচনার, কূটনীতির ও গঠনমূলক সংলাপের জন্য পথ তৈরি করতে অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া বিবৃতিতে তারা আরও বলেছে, সামরিক অভিযান বন্ধ করা ও আন্তর্জাতিকভাবে চলাচলের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে এ যুদ্ধবিরতির ভিত্তি তৈরি করতে হবে। পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে যৌথভাবে মিসরও ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রচার করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।
ইন্দোনেশিয়া
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, জাকার্তা এ যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানায়। তারা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে একে অপরের ‘সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও কূটনীতির’ প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বানও জানিয়েছে।
মার্চের শেষ দিকে লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনী ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় বিস্ফোরণে তিন ইন্দোনেশীয় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী নিহত হন।
মালয়েশিয়া
মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এ যুদ্ধবিরতি একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ নির্দেশ করছে এবং এটি ‘উত্তেজনা হ্রাস ও মধ্যপ্রাচ্যে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃস্থাপনের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে কাজ করবে।
অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এক যৌথ বিবৃতিতে যুদ্ধবিরতির খবরকে স্বাগত জানিয়ে আশা প্রকাশ করেছেন, এই যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে।
যুদ্ধবিরতিতে ভূমিকা রাখার জন্য আলবানিজ ও পেনিং পাকিস্তান, মিসর, তুরস্ক ও সৌদি আরবকে ধন্যবাদ দিয়েছেন।
নিউজিল্যান্ড
নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স বলেন, তাঁর সরকার যুদ্ধবিরতির খবরকে স্বাগত জানাচ্ছে, যদিও এখনো অনেক উদ্বেগ রয়ে গেছে।
খুদে ব্লগ লেখার সাইট এক্সে এক পোস্টে পিটার্স লিখেছেন, ‘যদিও এটি উৎসাহব্যঞ্জক খবর এবং আগামী দিনগুলোয় একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে উল্লেখযোগ্য কাজ এখনো বাকি রয়ে গেছে।’
নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুদ্ধবিরতি আলোচনায় ভূমিকার জন্য পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরের মতো দেশের প্রশংসা করেছেন।