গত মাসে ইরানের বন্দর অভিমুখে যাওয়ার চেষ্টাকালে একটি জাহাজকে বাধা দিচ্ছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস রাফায়েল পেরাল্টা। ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ চলাকালে এ ঘটনা ঘটে বলে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী
গত মাসে ইরানের বন্দর অভিমুখে যাওয়ার চেষ্টাকালে একটি জাহাজকে বাধা দিচ্ছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস রাফায়েল পেরাল্টা। ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ চলাকালে এ ঘটনা ঘটে বলে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী

পাল্টাপাল্টি হামলা: যুদ্ধবিরতির মধ্যে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান

মাসব্যাপী চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গতকাল বৃহস্পতিবার দুই দেশ একে অপরের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে।

তবে ইরান বলেছে, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা পরিস্থিতির আর অবনতি চায় না।

ইরানের সামরিক বাহিনীর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করা দুটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে ও ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে। বিপরীতে মার্কিন বাহিনী বলেছে, ইরানের আক্রমণের পাল্টা জবাব দিতেই গুলি চালিয়েছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ঘটনাকে তেমন গুরুত্ব দিতে নারাজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তিনি এ পাল্টাপাল্টি হামলাকে ‘লাভ ট্যাপ’ (সামান্য আঘাত) বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর দাবি, যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর।

এমন এক সময়ে এ পাল্টাপাল্টি হামলা হলো, যখন ওয়াশিংটন একটি শান্তি প্রস্তাবের ব্যাপারে ইরানের উত্তরের অপেক্ষায় ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এ প্রস্তাবে যুদ্ধ বন্ধের কথা থাকলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো অমীমাংসিত রাখা হয়েছে।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

ইরানের সামরিক কমান্ড অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র একটি তেলবাহী ট্যাংকার ও অন্য একটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।

সামরিক কমান্ড আরও বলেছে, হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপ (ইরানের সবচেয়ে বড় দ্বীপ) এবং মূল ভূখণ্ডের বন্দর খামির ও সিরিক এলাকায় বেসামরিক লোকজনের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালির পূর্ব ও চাবাহার বন্দরের দক্ষিণে থাকা মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলা চালায়।

এমন এক সময়ে এ পাল্টাপাল্টি হামলা হলো যখন ওয়াশিংটন একটি শান্তি প্রস্তাবের ব্যাপারে ইরানের উত্তরের অপেক্ষায় ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এ প্রস্তাবে যুদ্ধ বন্ধের কথা থাকলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো অমীমাংসিত রাখা হয়েছে।

ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের একজন মুখপাত্র দাবি করেন, তাঁদের হামলায় মার্কিন বাহিনীর ‘উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের কোনো সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

সেন্টকম বলেছে, ইরান তিনটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার (যুদ্ধজাহাজ) লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট নৌযান দিয়ে হামলা চালিয়েছিল।

সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সেন্টকম পরিস্থিতির অবনতি চায় না, তবে মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষা দিতে তারা সদা প্রস্তুত এবং মোতায়েন রয়েছে।

ইরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, আক্রান্ত হলে তারাও জবাব দেবে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, এক সামরিক মুখপাত্র বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জেনে রাখা উচিত যে যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা হামলার জবাবে ইরান বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে পাল্টা আঘাত করবে।’

যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর আছে। যদি দ্রুত চুক্তি সই না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ ও কঠোর হামলা চালানো হবে।
-ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট

ইরানের প্রেস টিভি পরে জানিয়েছে, কয়েক ঘণ্টা ধরে পাল্টাপাল্টি গোলাগুলির পর হরমুজ প্রণালির ইরানি দ্বীপ ও উপকূলীয় শহরগুলোয় পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে।

গত ৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে দুই পক্ষ মাঝেমধ্যেই ছোটখাটো গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়েছে। গত সোমবার মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছিল, তারা ইরানের ছয়টি ছোট নৌকা ধ্বংস করেছে এবং ইরানের ছোড়া ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌচলাচল স্বাভাবিক করার মার্কিন চেষ্টা ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ অভিযানে তেহরান বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে ওই সংঘাতের সূত্রপাত।

শান্তিচুক্তি না করলে কঠোর হামলার হুমকি ট্রাম্পের

সেন্ট্রাল কমান্ডের বিবৃতির সূত্র ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি ডেস্ট্রয়ার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় হামলার শিকার হয়। তবে জাহাজগুলোর কোনো ক্ষতি হয়নি।

সামরিক কমান্ড বলেছে, হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপ, মূল ভূখণ্ডের বন্দর খামির ও সিরিক এলাকায় বেসামরিক মানুষের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালির পূর্ব ও চাবাহার বন্দরের দক্ষিণে থাকা মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলা চালায়।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, হামলাকারী ইরানিদের ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করা হয়েছে এবং তাঁদের বেশ কিছু ছোট নৌযান ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘ওই নৌযানগুলো খুব দ্রুত ও কার্যকরভাবে সমুদ্রের তলদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের ডেস্ট্রয়ারগুলো লক্ষ্য করে মিসাইল ছোড়া হয়েছিল, যা খুব সহজেই ভূপাতিত করা হয়েছে। একইভাবে ড্রোনগুলোও মাঝ আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে।’

এদিকে ট্রাম্প ইরানকে দ্রুত আলোচনায় বসে যুদ্ধ শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি দ্রুত চুক্তি সই না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ ও কঠোর হামলা চালানো হবে।

‘যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জেনে রাখা উচিত যে যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা হামলার জবাবে ইরান বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে পাল্টা আঘাত করবে।’

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রস্তাবটি দিয়েছে, তাতে যুদ্ধ শেষ করার কথা থাকলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ বা হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার মতো মূল বিষয়গুলোর সমাধান করা হয়নি।

উল্লেখ্য, যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা হতো। ইরান জানিয়েছে, তারা প্রস্তাবটি নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

বিশ্ববাজারে প্রভাব

সাম্প্রতিকতম এই সংঘাতের প্রভাবে বিশেষ করে এশিয়ার বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও তেলের দাম ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তেলের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানির এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। অন্যদিকে ইসরায়েল গত বুধবার লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহর এক কমান্ডারকে হত্যার দাবি করেছে। গত মাসে যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর বৈরুতে এটিই প্রথম ইসরায়েলি হামলা।

লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ রাখা ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইরানের আলোচনার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল।