ইরানে চলমান যুদ্ধে মোতায়েন করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড
ইরানে চলমান যুদ্ধে মোতায়েন করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড

আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনার

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কী কী অস্ত্র ব্যবহার করছে, খরচ কত হচ্ছে

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধ বহু পুরোনো। তাতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে গত শনিবার। ওই দিন ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানের ভূখণ্ডে দেশ দুটির যৌথ বিমান হামলা দুই পক্ষের এ পুরোনো ও প্রকাশ্য সামরিক শত্রুতা নতুন করে উসকে দিয়েছে। ইরানও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, সামরিক অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ চলতে পারে। তাঁর এমন ইঙ্গিতের পর প্রশ্ন উঠেছে, মধ্যপ্রাচ্যে এ নতুন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে কি ওয়াশিংটন? শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কত খরচ হতে পারে?

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’

২৮ ফেব্রুয়ারি। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ৮ মিনিটের একটি ভিডিও পোস্ট করেন ট্রাম্প। ভিডিওতে তিনি ঘোষণা দেন, ইরানের ভূখণ্ডে একটি ‘বড় যুদ্ধাভিযান’ শুরু করেছে মার্কিন বাহিনী।

পরে পেন্টাগন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ পোস্ট দিয়ে জানায়, ইরানে চলমান সামরিক অভিযানের নাম রাখা হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলকে প্রায় ২ হাজার ১৭০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ২০২৫ সালের ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ওই দিন ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধ শুরু করেছে ইসরায়েল।

ট্রাম্পের দাবি, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করাই এ সামরিক অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা তাদের (ইরানের) ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে যাচ্ছি। তাদের ক্ষেপণাস্ত্রশিল্প মাটিতে মিশিয়ে দেব। এটি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে।’

শনিবার এ অভিযান শুরুর পর থেকে ইরানের ১ হাজার ২৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। পৃথক বিবৃতিতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, তারা হামলা চালিয়ে ১১টি ইরানি জাহাজ ধ্বংস করেছে।

এ অভিযানে বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। সাগর থেকে ছোড়া হচ্ছে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। সমন্বিত হামলা চালানো হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে। পাশাপাশি ইরানের প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের ওপরও হামলা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির হিসাবে, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের মতো বিমানবাহী রণতরি পরিচালনায় প্রতিদিন আনুমানিক ৬৫ লাখ ডলার খরচ হয়। সেই সঙ্গে সরঞ্জামের ক্ষতির খরচও যুক্ত হবে।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় নিহত ব্যক্তিদের তালিকায় সবার ওপরে রয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে ছিলেন। শনিবার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার প্রথম ধাপে তেহরানে নিজ কার্যালয় কম্পাউন্ডে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিহত হন তিনি।

এরপর গতকাল সোমবার ট্রাম্প বলেন, যত দিন প্রয়োজন যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন। তবে ইঙ্গিত দিয়েছেন, এটা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে। ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ১৩০টি জায়গায় ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে আতঙ্কিত হয়ে উড়ে যাচ্ছে পাখি। গতকাল ইরানের রাজধানী তেহরানে

যুক্তরাষ্ট্র কত খরচ করেছে

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলকে প্রায় ২ হাজার ১৭০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ২০২৫ সালের ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। ওই দিন ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধ শুরু করেছে ইসরায়েল।

‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেন, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জায়গায় ইসরায়েলকে সামরিক হামলা চালানোর জন্য সহায়তা দিতে গিয়ে মার্কিন করদাতাদের পকেট থেকে ৯৬৫ কোটি থেকে ১ হাজার ২০৭ কোটি ডলার খরচ হয়েছে।

ইরানিদের আক্রমণের সক্ষমতা যতটা দ্রুত সম্ভব কমিয়ে আনা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য, যাতে ইরান আর ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে না পারে।
কেভিন দোনেগান, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের সাবেক পরিচালক

এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধ ও সংঘাতের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ৩ হাজার ১৩৫ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৩৭৭ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। এটা ক্রমে বাড়ছেই।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে আকাশ, সাগর, ভূমি এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা মিলিয়ে ২০টির বেশি অস্ত্রব্যবস্থা মোতায়েন রয়েছে। এসব ব্যবস্থা ব্যবহার করে ইতিমধ্যে ইরানে হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।

সেন্ট্রাল কমান্ডের সাবেক অভিযান পরিচালক কেভিন দোনেগান আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ইরানিদের আক্রমণের সক্ষমতা যতটা দ্রুত সম্ভব কমিয়ে আনা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য। যাতে ইরান আর “ধ্বংসযজ্ঞ” চালাতে না পারে।’

যেসব অস্ত্রব্যবস্থার ব্যবহার

ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অপারেশন এপিক ফিউরিতে যেসব অস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো হলো—

যুদ্ধবিমান: বি-১, বি-২ স্টিলথ (ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় এ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে হামলা চলছে), সর্বাধুনিক এফ-৩৫, এফ-১৫ (কুয়েতে ১ মার্চ কয়েকটি বিধ্বস্ত হয়েছে), এফ-১৬ ফ্যালকন ইত্যাদি।

ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র: লুকাস ড্রোন (সাধারণত ইরানিদের মতো করে নকশা করা এসব ড্রোন একবারই হামলা চালাতে সক্ষম), এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন (নজরদারির কাজে বেশি ব্যবহৃত হয়), ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য এম ১৪২ হাই মবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম (হিমার্স), সাগর থেকে নিক্ষেপযোগ্য টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট এক ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারের। সেটা দেড় ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে। আমি এটাকে উদ্বেগজনক মনে করি। যদিও প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ক্রিস্টোফার প্রেবেল, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো

ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা: প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র সুরক্ষাব্যবস্থা, থাড ক্ষেপণাস্ত্র সুরক্ষব্যবস্থা। এগুলো ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করা হচ্ছে। এ ছাড়া ইরানি ড্রোন ধ্বংসে কাউন্টার ড্রোনব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে।

নৌশক্তি: বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এবং ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন মোতায়েন করা হয়েছে। সমুদ্রপথে টহল-নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে পি-৮ পসেইডন টহল উড়োজাহাজ। যুদ্ধের কাজে ব্যবহারের পণ্য ও রসদ পরিবহনে কাজে লাগানো হচ্ছে সি-১৭ গ্লোবমাস্টার, সি-১৮০ হারকিউলিসসহ বিভিন্ন মডেলের উড়োজাহাজ।

যুক্তরাষ্ট্রের কত খরচ

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কত খরচ হতে পারে, সেটা ঠিকঠাক অনুমান করা কঠিন। বিশ্লেষকদের মতে, এটা অনুমান করার সময় এখনো আসেনি।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রিস্টোফার প্রেবেল আল-জাজিরাকে বলেন, ‘পেন্টাগন যুদ্ধ খরচের কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। কাজেই আমরা কেবল অনুমান করতে পারি। তবে এখানে পরিবর্তনশীল অনেক বিষয় আছে। তাই আমরা শুধু পৃথকভাবে অস্ত্রের দাম ও অভিযানের খরচ সম্পর্কে অনুমান করতে পারি।’

তুরস্কের আনাদোলু সংবাদ সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অপারেশন এপিক ফিউরির প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার খরচ হয়েছে।

এ ছাড়া অভিযানের আগে যুদ্ধবিমানের অবস্থান পরিবর্তন, ডজনের বেশি নৌযান মোতায়েন ও আঞ্চলিক সম্পদ একত্র করার মতো সামরিক প্রস্তুতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র আরও প্রায় ৬৩ কোটি ডলার খরচ করেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি থাড আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির হিসাব, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের মতো একটি বিমানবাহী রণতরি পরিচালনায় প্রতিদিন আনুমানিক প্রায় ৬৫ লাখ ডলার খরচ হয়। সেই সঙ্গে সরঞ্জামের ক্ষতির খরচও যুক্ত হবে।

কুয়েতে অন্তত তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইরানি যুদ্ধবিমান মনে করে ভুলবশত কুয়েত যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি মূল উদ্বেগ নয়; বরং সেখানে অস্ত্র আর সামরিক সরঞ্জামের মজুত কতটা আছে, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।

ক্রিস্টোফার প্রেবেল আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট এক ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারের। সেটা দেড় ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে। আমি এটাকে উদ্বেগজনক মনে করি। যদিও প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’