
কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নতুন নথিপত্র বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলেছে। এসব নথিতে উঠে এসেছে প্রভাবশালী বিভিন্ন ব্যক্তির নাম। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, ধনকুবের ইলন মাস্ক—এমনকি মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসও। তাঁদের অনেকের নাম আগে প্রকাশিত নথিতেও ছিল।
এপস্টেইন-সংক্রান্ত নতুন নথিগুলো গত শুক্রবার প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। নথিতে ৩০ লাখের বেশি পৃষ্ঠা, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি ও ২ হাজার ভিডিও রয়েছে। এর আগে গত নভেম্বরে এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের জন্য বিচার বিভাগকে নির্দেশ দেয় যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উভয় কক্ষ। চাপের মুখে ট্রাম্পও এসব নথি প্রকাশের আহ্বান জানান।
অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিয়ে যৌনবৃত্তির এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ ছিল এপস্টেইনের বিরুদ্ধে। এ–সংক্রান্ত এক মামলায় বিচারের অপেক্ষায় থাকাকালে ২০১৯ সালে কারাগারে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। ময়নাতদন্তে বলা হয়, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। চলুন দেখে নেওয়া যাক জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নতুন নথিকে প্রভাবশালী কার কার নাম উঠে এসেছে।
নথিপত্রে ট্রাম্প-সংক্রান্ত যৌন নিপীড়নের অভিযোগের তথ্য রয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, তদন্তকারীরা কিছু অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন। তবে কিছু অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। ট্রাম্প সব সময় এপস্টেইনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অপরাধ করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। এ ছাড়া মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পও অভিনন্দন জানিয়ে এপস্টেইনকে ই–মেইল পাঠিয়েছিলেন।
মার্কিন বিচার বিভাগ বলেছে, ট্রাম্পকে নিয়ে কিছু নথিতে মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত অভিযোগ আছে, যা ২০২০ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে এফবিআইতে জমা দেওয়া হয়েছিল।
এপস্টেইনের নথিতে ট্রাম্প-সংক্রান্ত বিব্রতকর বিষয়গুলো কালো কালিতে ঢেকে দেওয়া হয়েছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। তবে তা নাকচ করে দিয়েছেন মার্কিন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৩ সালে এপস্টেইন নিজেকেই একটি ই-মেইল পাঠিয়েছিলেন। তাতে বিল গেটসের সঙ্গে স্ত্রী মেলিন্ডা গেটসের ‘বৈবাহিক সম্পর্কে দ্বন্দ্বের’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ই-মেইলে লেখা, বিল গেটস বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। রুশ মেয়ে এবং বিবাহিত নারীদের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের জন্য বিল গেটসকে সুযোগ তৈরি করে দিতে এপস্টেইন কাজ করেছেন।
নথিপত্রে এপস্টেইন ও মাস্কের মধ্যে অনেক ই-মেইল আদান-প্রদানের তথ্য রয়েছে। ২০১২ সালের নভেম্বরে মাস্ককে একটি ই-মেইল পাঠান এপস্টেইন। সেখানে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘হেলিকপ্টারে করে আইল্যান্ডে কতজন আসবে?’ মাস্কের জবাব ছিল, ‘সম্ভবত শুধু তালুলাহ আর আমি। আপনার দ্বীপে সবচেয়ে উন্মত্ত পার্টি কোন দিন/রাতে হবে?’
ধনকুবের রিচার্ড ব্র্যানসন ও এপস্টেইনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল বলে নথিপত্রে উঠে এসেছে। ২০১৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এপস্টেইনকে পাঠানো এক ই-মেইলে ব্র্যানসন লিখেছেন, ‘গতকাল আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে সত্যিই দারুণ লাগল। যখনই আপনি এ এলাকায় আসবেন, আপনার সঙ্গে দেখা হবে বলে আশা করি। শর্ত হলো, আপনার হারেমকে (সঙ্গী) সঙ্গে নিয়ে আসতে হবে।’
যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লসের ভাই অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসরের নাম নতুন নথিতে রয়েছে। এক ই–মেইলে অ্যান্ড্রুকে এপস্টেইন লিখেছিলেন, ‘আমি কোন সময় এলে আপনার ভালো লাগবে...আমাদের একান্ত সময়ও প্রয়োজন হবে।’ অ্যান্ড্রু জবাবে লিখেছেন, ‘আমরা বাকিংহাম প্যালেসে রাতের খাবার খেতে পারি এবং ব্যাপক ব্যক্তিগত গোপনীয়তা থাকবে।’ ব্রিটিশ রাজপরিবারের এই সদস্য ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এপস্টেইনকে তাঁর লন্ডন সফরের সময় বাকিংহাম প্যালেসে আমন্ত্রণ জানান।
প্রকাশ হওয়া ই-মেইলে দেখা গেছে, ব্যবসায়ী হাওয়ার্ড লুটনিক (বর্তমানে ট্রাম্পের বাণিজ্যমন্ত্রী) ২০১২ সালের ডিসেম্বরে এপস্টেইনের ক্যারিবীয় দ্বীপে দুপুরের খাবার খাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। লুটনিকের স্ত্রী এপস্টেইনের সহযোগীকে লিখেছিলেন, ‘আমরা সেন্ট থমাস থেকে আপনার দিকে আসছি।’ কোথায় নোঙর করতে হবে, তা-ও জিজ্ঞেস করেছেন তিনি।
নথিপত্রে ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পকে নিয়ে তৈরি নতুন প্রামাণ্যচিত্রের পরিচালক ব্রেট র্যাটনারকে এক তরুণীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা গেছে। সেখানে জেফরি এপস্টেইনসহ আরেক তরুণীও ছিলেন। গত ডিসেম্বরে র্যাটনার, এপস্টেইন ও প্রয়াত ফরাসি মডেলিং এজেন্ট জঁ-লুক ব্রুনেলের যেসব ছবি প্রকাশিত হয়েছিল, এসব ছবিও একই জায়গায় তোলা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এপস্টেইন-সংক্রান্ত নতুন নথিতে বিল ক্লিনটনের নামও রয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট এপস্টেইনের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে চড়েছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে হোয়াইট হাউসে দেখা করেছিলেন। এ ছাড়া নথিতে যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টির সদস্য লর্ড পিটার বেঞ্জামিন ম্যান্ডেলসনের নাম রয়েছে। নথি প্রকাশের পর পদত্যাগ করেছেন তিনি।