
জোরে শব্দ শুনলে কেঁপে ওঠে চার বছরের শিশুটি। স্কুল নিয়ে তার ছোট্ট মুখে এখন একটাই কথা—‘স্কুল পচা, স্কুলে আর যাব না।’ শাস্তি কী, তা জানে না শিশুটি; তবে এটা জানে, স্কুল মানে ভয়, স্কুল মানে আঘাত। স্কুল নামের যে আনন্দালয়ে নতুন বইয়ের গন্ধে, বন্ধুদের কোলাহলে মেতে থাকার কথা ছিল তার, সেই বয়সেই তার মনে স্কুল নিয়ে গেঁথে গেছে ভয়।
এ বছরের ১৮ জানুয়ারি রাজধানীর নয়াপল্টন এলাকার মসজিদ রোডে শারমিন একাডেমি নামের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শারীরিক শাস্তির শিকার হয় শিশুটি। তারপর আর স্কুলে ফেরানো যায়নি তাকে। সাড়ে তিন মাস পরও সে এখন সহজ শব্দে কেঁপে ওঠে, খাওয়াদাওয়া কমে গেছে, জানিয়েছে শিশুটির পরিবার।
বিশ্বজুড়ে শিশুদের ওপর যেকোনো ধরনের শাস্তি বন্ধে আইন প্রণয়ন ও প্রচারণা চললেও বাস্তবে তা বন্ধ করা যায়নি। এমন বাস্তবতার মধ্যেই আজ ৩০ এপ্রিল পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শিশু শাস্তি বিলোপ দিবস।
শুধু এই শিশু নয়, দেশের নানা প্রান্তে স্কুল ও মাদ্রাসায় শারীরিক শাস্তির শিকার হয়ে হাজারো শিশু নীরবে বয়ে বেড়াচ্ছে এমনই অদৃশ্য ক্ষত; যার দাগ শরীরে যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি মনে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের এমন শাস্তির একাধিক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে—কোথাও বেত্রাঘাত, কোথাও কান ধরিয়ে ওঠবস, আবার কোথাও পানিতে চুবিয়ে শাস্তির দৃশ্য। গত ২৫ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে শিশুদের কান ধরিয়ে ওঠবস করানোর ভিডিও ভাইরাল হলে সমালোচনায় পড়েন ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমা; পরে কর্তৃপক্ষ তাকে সতর্ক করে দেয়।
বিশ্বজুড়ে শিশুদের ওপর যেকোনো ধরনের শাস্তি বন্ধে আইন প্রণয়ন ও প্রচারণা চললেও বাস্তবে তা বন্ধ করা যায়নি। এমন বাস্তবতার মধ্যেই আজ ৩০ এপ্রিল পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শিশু শাস্তি বিলোপ দিবস। ‘এন্ড ভায়োলেন্স পার্টনারশিপ’ শিরোনামের এক উদ্যোগে দিবসটি পালন শুরু হয়, ২০২৩ সালে এতে যুক্ত হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
শাস্তির শিকার ৮৬% শিশু
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে, ২০২৫’–এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই জরিপ চালানোর আগের এক মাসে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৬ শতাংশ শিশু শারীরিক ও মানসিক শাস্তির শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ২৫ শতাংশ শিশু মুখ, মাথা, কানে ও ঘাড়ে চড়থাপ্পড়, মারধর ও শরীরে বারবার আঘাতের মতো শারীরিক শাস্তির শিকার হয়।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা শাস্তির শিকার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এ বয়সী শিশুদের ৭৬ শতাংশ শারীরিক এবং ৩৩ শতাংশ গুরুতর শারীরিক শাস্তির শিকার হয়। ৫ থেকে ৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে শাস্তির দুই হার যথাক্রমে ৬৭ শতাংশ ও ৩০ শতাংশ।
যদিও শিশুদের শাস্তি নিষিদ্ধের পরিপত্র সব প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য, কিছু প্রতিষ্ঠান তা মানছে না—এমন অভিযোগ আছে। শিগগির কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে বিষয়গুলো আলোচনা করা হবে।ববি হাজ্জাজ, প্রতিমন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়
অথচ বাংলাদেশে আইনেই শিশুদের শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ। শিশু আইন ২০১৩-এর ৭০ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তার হেফাজত বা দায়িত্বে থাকা শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলা, অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা, ব্যক্তিগত পরিচর্যার কাজে ব্যবহার বা অশালীনভাবে প্রদর্শন করলে এবং এতে শিশুর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে।
এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা সংক্রান্ত নীতিমালা’ করে ২০১১ সালে।
তবে কিন্ডারগার্টেন, কওমিসহ কিছু মাদ্রাসায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির অভাবে শিশুদের শারীরিক শাস্তি বন্ধে নীতিমালা কার্যকর হচ্ছে না বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
শিশুদের শাস্তি নিষিদ্ধের পরিপত্র সব প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য হলেও কিছু প্রতিষ্ঠান তা মানছে না বলে অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় সব কটিকে তদারকি করার সক্ষমতা সরকারের নেই। তবে শিগগির কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে বিষয়গুলো আলোচনা করা হবে।
ছেলেটাকে অন্য একটি স্কুলে ভর্তি করতে চাইছিলাম। কিন্তু ছেলে এত ভয় পেয়েছে যে স্কুলেই ভর্তি হতে চাইছে না। বলে, ‘স্কুল পচা, স্কুলে মারে’। ওর খাওয়াদাওয়াও কমে গেছে।নয়াপল্টনে শারমিন একাডেমিতে নির্যাতনের শিকার শিশুর বাবা
বৈশ্বিক বাস্তবতা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি
গত বছরের ১১ আগস্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ‘করপোরাল পানিশমেন্ট অব চিলড্রেন দ্য পাবলিক হেলথ ইমপ্যাক্ট’ (শিশুর প্রতি শারীরিক শাস্তি, জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব) শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের ৬৭টি দেশে শিশুদের শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও অনেক দেশে তা এখনো প্রচলিত। শারীরিক শাস্তি শিশুদের আচরণ উন্নত না করে বরং সহমর্মিতার মনোভাব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং মিথ্যা বলা, চুরি, স্কুল ফাঁকি ও পরবর্তী জীবনে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, আফ্রিকা ও মধ্য আমেরিকায় স্কুলে শারীরিক শাস্তির হার প্রায় ৭০ শতাংশ এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ২৫ শতাংশ। বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর ১৮ বছরের কম বয়সী প্রায় ১২০ কোটি শিশু বাড়িতেই শাস্তির শিকার হয়।
শিশুর মনে গেঁথে যাওয়া ভয়
শারমিন একাডেমিতে ওই শিশুকে শাস্তি দেওয়ার ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহান শিশুটিকে অফিসকক্ষে নিয়ে চড় মারেন। এ সময় প্রধান শিক্ষকের স্বামী ও স্কুলের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার শিশুটির গলা ও মুখ চেপে ধরেন এবং হাতে থাকা স্টেপলার দেখিয়ে ভয় দেখান। পরে শিশুটি নারীর শাড়িতে থুতু ফেললে তিনি শিশুটির মাথা শাড়িতে চেপে ধরেন এবং একাধিকবার মাথায় ঝাঁকি দেন।
এ ঘটনায় শিশুটির মা পল্টন থানায় শিশু আইনের ৭০ ধারায় মামলা করলে ২৩ জানুয়ারি পবিত্র কুমারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহান এখনো গ্রেপ্তার হননি এবং প্রকাশ্যে আসেন না। বর্তমানে স্কুলটি তাঁর মেয়ে পরিচালনা করছেন।
শিশুটির বাবা ২২ এপ্রিল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছেলেটাকে অন্য একটি স্কুলে ভর্তি করতে চাইছিলাম। কিন্তু ছেলে এত ভয় পেয়েছে যে স্কুলেই ভর্তি হতে চাইছে না। বলে, “স্কুল পচা, স্কুলে মারে”। ওর খাওয়াদাওয়াও কমে গেছে।’
পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপে দেখা যায়, দেশে ৩ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা শাস্তির শিকার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এ বয়সী শিশুদের ৭৬ শতাংশ শারীরিক এবং ৩৩ শতাংশ গুরুতর শারীরিক শাস্তির শিকার হয়। ৫ থেকে ৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে শাস্তির দুই হার যথাক্রমে ৬৭ শতাংশ ও ৩০ শতাংশ।
নরসিংদীর শহরের মাদ্রাসাতুল আবরার আরাবিয়াহ মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী এক শিশুকে গোসল করতে না চাওয়ায় বেত্রাঘাতের অভিযোগ ওঠে। ৩ এপ্রিল মারধরে শিশুটির শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়।
শিশুটির বাবা ২৫ এপ্রিল প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার দিন তিনি ছেলের জন্য খাবার নিয়ে মাদ্রাসায় গিয়ে দেখেন, ছেলে কান্নাকাটি করছে। পাঞ্জাবি তুলতেই সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সেদিন আমি না গেলে হয়তো ছেলেটা মইরাই যাইত। শাসন করার একটা লিমিট আছে। হুজুর যেভাবে মারছে, আমার ছেলে তো কইলজা ফাইট্টা মইরা যাইতে পারত।’
এ ঘটনার পর শিশুটি নরসিংদী জেলা হাসপাতালে ভর্তি ছিল। এখনো তার পিঠে আঘাতের চিহ্ন আছে। পরে পরিবার শিশুটিকে ওই মাদ্রাসা থেকে সরিয়ে বাসার কাছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাকে বেত্রাঘাতের অভিযোগে মাদ্রাসাশিক্ষক নাজমুস সাকিবকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
শিক্ষকের আঘাতে চোখ হারানো শিশু
২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার তিতাস উপজেলার বাতাকান্দি এলাকার সেবা মাল্টিমিডিয়া স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী শিক্ষকের স্কেলের আঘাতে ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারায়। পরে তাকে ঢাকাসহ ভারতে নিয়ে অস্ত্রোপচার করা হলেও চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার দৃষ্টি আর ফিরবে না।
শিশুটির চাচা ২৬ এপ্রিল প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার সময় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক রাহাতুল ইসলাম (সৌরভ) মুঠোফোনে কথা বলছিলেন। শিক্ষার্থীদের হইচইয়ে রেগে গিয়ে তিনি প্রথমে স্কেল দিয়ে তাঁর ভাতিজার পিঠে আঘাত করেন। স্কেল ভেঙে যাওয়ার পর ভাঙা অংশ ছুড়ে মারলে তা শিশুটির ডান চোখে লাগে।
এ ঘটনায় দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩২৬ ধারায় মামলা হয়, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। শিশুটির মা মামলাটি করেছিলেন। গত বছরের মে মাসে ওই শিক্ষক গ্রেপ্তার হলেও ডিসেম্বরেই তিনি জামিনে মুক্তি পান।
শিশুটির চাচা আরও বলেন, নষ্ট হয়ে যাওয়া চোখ নিয়ে অনেক যন্ত্রণায় ভোগে তার ভাতিজা। চোখ ব্যথা করে, পানি পড়ে। এ ঘটনা পুরো পরিবারকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।
শাস্তি থেকে মৃত্যুর অভিযোগ
২০২৪ সালের মে মাসে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার আল মঈন ইসলামী একাডেমি মাদ্রাসার টয়লেট থেকে সাত বছর বয়সী শিশু সানিম হোসেনের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। শিশুটির মায়ের অভিযোগ, পড়া না পারায় শিক্ষকেরা তাকে নিয়মিত মারধর করতেন এবং পিটিয়ে হত্যার পর লাশ ঝুলিয়ে রাখেন।
লক্ষ্মীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল মোন্নাফ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ ঘটনায় মাহমুদুর রহমান নামের এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এরপর সেপ্টেম্বরে ঢাকার হাতিরঝিল এলাকার একটি মাদ্রাসা থেকে ১২ বছর বয়সী তুষার তানভীরের এবং চলতি বছরের ৩ এপ্রিল নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসা থেকে ১১ বছর বয়সী আলী হোসেনের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।
যেসব মাদ্রাসায় নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর মধ্যে কিছু কওমি, হাফেজি ও কিছু ব্যক্তিগতভাবে পরিচালিত। এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই।মোহাম্মদ আরিফুর রহমান মজুমদার, উপপরিচালক (প্রশাসন), মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর
এসব বিষয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, আলিয়া মাদ্রাসা ছাড়া কওমি, হাফেজি ও ব্যক্তিগতভাবে পরিচালিত মাদ্রাসার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ সচিব এসব মাদ্রাসাকে নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নিলেও নেতৃত্বের মতভেদের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
এদিকে নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও কাছাকাছি এলাকায় একাধিক মাদ্রাসা গড়ে উঠছে। দরিদ্র পরিবারগুলো সন্তানদের সেখানে পাঠাচ্ছে, যেখানে শারীরিক শাস্তি, নির্যাতন, এমনকি যৌন সহিংসতা ও হত্যার অভিযোগও রয়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ আরিফুর রহমান মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেসব মাদ্রাসায় নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর মধ্যে কিছু কওমি, হাফেজি ও কিছু ব্যক্তিগতভাবে পরিচালিত। এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই।’
তাহলে শাস্তি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্যাতনের ঘটনায় ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬৭টি দেশে শিশুদের শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও অনেক দেশে এটি এখনো প্রচলিত। শারীরিক শাস্তি শিশুদের আচরণ উন্নত না করে বরং সহমর্মিতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ কমিয়ে দেয় এবং মিথ্যা বলা, চুরি, স্কুল ফাঁকি ও পরবর্তী জীবনে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
শাসন নয়, দরকার বোঝাপড়া
‘শিশুরাই সব’ সংগঠনের আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাস্তি নিষিদ্ধের পরিপত্র থাকলেও বাস্তবে তা বন্ধ হয়নি। অনেক সময় শিক্ষকেরা মেজাজ হারালেও শাস্তিকে ন্যায্যতা দেওয়া যায় না।
লায়লা খন্দকার বলেন, শিশুদের সঠিকভাবে তদারকির জন্য প্রশিক্ষণ প্রয়োজন এবং তাঁদের সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। কারণ, শিশুদেরও মানবাধিকার রয়েছে।
শিক্ষক ও অভিভাবকদের ব্যক্তিগত রাগ, ক্ষোভ বা হতাশা শিশুদের ওপর না ঝাড়ার আহ্বান জানান লায়লা খন্দকার।
লায়লা খন্দকার আরও বলেন, শাস্তির মাধ্যমে শিশুকে সঠিক আচরণ শেখানো যায় না; বরং ভালোবাসা ও বয়সভিত্তিক দিকনির্দেশনাই তাদের বিকাশে সহায়ক। শাস্তি পাওয়া শিশুরা ভবিষ্যতে সহিংস আচরণে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাই শিশুদের ওপর শাস্তি বন্ধ না হলে সমাজে সহিংসতার চক্র ভাঙা কঠিন হবে।