
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে তিন সাঁওতাল হত্যার বিচারসহ সাত দফা দাবিতে সমাবেশ করেছেন ওই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর লোকজন। গোবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর আঞ্চলিক সড়কের গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটামোড় এলাকায় আজ সোমবার এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ আদিবাসী ইউনিয়ন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা শাখার আয়োজনে দুপুর ১২টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচি পালিত হয়। এর আগে পতাকা, ফেস্টুন ও ব্যানার হাতে উপজেলার মাদারপুর ও জয়পুর গ্রাম থেকে তিন শতাধিক সাঁওতাল ও বাঙালি নারী-পুরুষ মিছিল বের করেন। মিছিলটি গোবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর সড়কের বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করে।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ইউনিয়নের গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি বার্নাবাস টুডু। বক্তব্য দেন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক মিহির ঘোষ, বাংলাদেশ আদিবাসী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রেবেকা সরেন, আদিবাসী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা সিপিবি নেতা বদিউজ্জামান, সিপিবির জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য গোলাম রব্বানী, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা সাধনা মহল, হাসিব উদ্দিন ও শামিউল ইসলাম, বাংলাদেশ কৃষক সমিতির উপজেলা সভাপতি তাজুল ইসলাম, ভূমি আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শেখ নজির উদ্দীন, সাংগঠনিক সম্পাদক স্বপন ভূঁইয়া, সিপিবি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা সভাপতি অশোক আগরওয়ালা ও সাধারণ সম্পাদক আল-মামুন, সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাফরুল ইসলাম প্রধান, আদিবাসী নেতা গণেশ মুরমু, রাফায়েল হাসদা, রোমিলা কিছুকু, তিন সাঁওতাল হত্যা মামলার বাদী থোমাস হেমব্রম প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, তিন সাঁওতাল হত্যার বিচারের দাবিতে তাঁরা ছয় বছর ধরে আদালতসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের দ্বারস্থ হয়েছেন। কিন্তু বিচার শুরু হয়নি—যা রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা। প্রশাসন হত্যাকারীদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে। বিচারের নামে টালবাহানা করে যাচ্ছে। এ হত্যা মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের কেউ গ্রেপ্তার করছে না। এ কারণে সাঁওতালদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
বক্তারা আরও বলেন, সাঁওতালদের বাপ-দাদার জমি ফেরত না দিয়ে তাঁদের উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। উন্নয়নে পিছিয়ে থাকা গাইবান্ধা জেলায় সর্বজন গ্রহণযোগ্য স্থানে ইপিজেড করার দাবিকে অগ্রাজ্য করা হচ্ছে। সাঁওতালদের জমিতে এ ইপিজেড করার চেষ্টা ষড়যন্ত্রেরই অংশ। অবিলম্বে তিন সাঁওতাল হত্যার বিচার, সাঁওতালদের বাপ-দাদার জমি ফেরতসহ সাত দফা দাবি মেনে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বক্তারা।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম এলাকায় রংপুর চিনিকলের আওতায় ১ হাজার ৮৪২ একর জমি আছে। ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর পুলিশ সঙ্গে নিয়ে বিরোধপূর্ণ ওই জমিতে আখ কাটতে যান চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারীরা। এ সময় নিজেদের বাপ-দাদার জমি দাবি করে বাধা দেন সাঁওতালরা। এতে পুলিশ, চিনিকলের শ্রমিক ও সাঁওতালদের ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে রমেশ টুডু, শ্যামল হেমব্রম ও মঙ্গল মার্ডি নামের তিন সাঁওতাল নিহত হন। আহত হন উভয় পক্ষের ২০ জন। সাঁওতালদের পক্ষে ২৬ নভেম্বর থোমাস হেমব্রম বাদী হয়ে সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বুলবুল আহম্মেদসহ ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে অজ্ঞাতনামা দেখিয়ে মামলা করেন।
পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের নির্দেশে গাইবান্ধার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মামলাটি তদন্ত করে। পিবিআই চলতি বছরের ২৩ জুলাই শাকিল আহম্মেদসহ ৯০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। মামলার বাদী থোমাস হেমব্রম আদালতে দেওয়া পিবিআইয়ের অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজির আবেদন করেন। গত ৪ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পার্থ ভদ্রের আদালতে সেই আবেদনের শুনানি হয়। শুনানি শেষে আদালত আজ শুনানি ও আদেশের দিন–তারিখ ধার্য করেন।
এর পর থেকে সাঁওতালরা দফায় দফায় ওই জমি দখল করেন। এ পরিস্থিতিতে সাহেবগঞ্জ এলাকায় রংপুর চিনিকলের জমিতে ইপিজেড স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (বেপজা) কর্তৃপক্ষকে ইপিজেড বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু সাঁওতালরা সেখানে ইপিজেড না করার জন্য আন্দোলন করে আসছেন।