জগন্নাথপুরে হাওরের ৬ বাঁধে ফাটল, ঝুঁকিতে ১০টি, শঙ্কায় কৃষকেরা

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরের দুটি ফসল রক্ষা বাঁধ গতকাল রোববার রাতে ফাটল দেখা দেয়। স্থানীয় কৃষকেরা সেখানে সংস্কারকাজ চালান
ছবি: প্রথম আলো

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় নলুয়ার হাওরসহ ছোট–বড় কয়েকটি হাওরের আরও ছয়টি ফসল রক্ষা বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিতে আছে আরও অন্তত ১০টি বাঁধ। বাঁধগুলো রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) লোকজন দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। শঙ্কার মধ্যে কৃষকেরা অধিকাংশ ফসল রক্ষা বাঁধে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছেন।

পাউবো, স্থানীয় কৃষক ও এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার নলুয়ার হাওরের বেতাউকা গ্রামের পাশের ১৪ নম্বর প্রকল্পের ফসল রক্ষা বাঁধটি গতকাল রোববার রাতে ধসে যায়। আজ সোমবার সকাল থেকে ওই বাঁধ রক্ষায় কাজ চলছে। একইভাবে নলুয়ার হাওরের ডুমাইখালি এলাকার ৮ ও ৯ নম্বর প্রকল্পের ফসল রক্ষা বাঁধে গতকাল রাতে ফাটল দেখা দিলে হাওরের ১০ হাজার হেক্টর জমির ফসল হুমকিতে পড়ে। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাজেদুল ইসলাম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনুপম দাস, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাঠ কর্মকর্তা হাসান গাজীর উপস্থিতিতে পিআইসির লোকজন ফাটল ধরা জায়গায় সংস্কারকাজ চালান। এ সময় এলাকার লোকজন স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করেন। অন্যদিকে গতকাল রাতে সৈয়দপুর শাহারপাড়া ইউনিয়নের ঝিলকার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে ফাটল দেখা দেয়। পরে স্থানীয় মসজিদের মাইকে বাঁধ রক্ষার আহ্বান জানালে আশপাশের কয়েক গ্রামের দুই শতাধিক মানুষ এসে বাঁধ সংস্কার করেন।

সৈয়দপুর শাহারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ঝিলকার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে ফাটলের খবরে স্থানীয় লোকজন নিয়ে সারা রাতের চেষ্টায় বাঁধটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়। হাওরে সৈয়দপুর শাহারপাড়া, আশারকান্দি ও পাইলগাঁও ইউনিয়নের কয়েক গ্রামের মানুষের জমি আছে। আজ ভোরে সৈয়দপুর শাহারপাড়া ইউনিয়নের তেঘরিয়ার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে ফাটল দেখা দেয়। বাঁধ রক্ষায় এলাকার লোকজন প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।

এ ছাড়া জগন্নাথপুর পৌর এলাকার শাহপুর বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দিলে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর কামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে কৃষকেরা সংস্কারকাজ করছেন। কাউন্সিলর কামাল উদ্দিন বলেন, এ বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকলে শাহপুর হাওর ও পিংলার হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। কৃষকেরা এখনো বাঁধ টেকসই করতে কাজ করছেন।

পানির চাপে হাওরের বিভিন্ন ফসল রক্ষা বাঁধ ঝুঁকিতে পড়েছে। ছবিটি মেন্দিপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর হাওরের বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে তোলা

মীরপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক জানান, মীরপুর ইউনিয়নের জামাইকাটা হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে ফাটল দেখা দিলে কৃষকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে এলাকার লোকজনের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বাঁধটি রক্ষা পায়। নলুয়ার হাওরবেষ্টিত চিলাউড়া হলদিপুর ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম জানান, নলুয়ার হাওরের কমপক্ষে ১০টি ফসল রক্ষা বাঁধ এখনো ঝুঁকিতে আছে। গত দুই দিনে তিন-চারটি বাঁধে ফাটল দেখা দেয়। স্থানীয় কৃষক ও পিআইসির লোকজন ফাটলের জায়গাগুলো সংস্কার করেন।

হাওর বাঁচাও আন্দোলন জগন্নাথপুর উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ২৮টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে নির্মিত ফসল রক্ষা বাঁধের অন্তত ১০টি বাঁধ এখনো ঝুঁকির মধ্যে আছে। সরেজমিনে তাঁরা বাঁধগুলো দেখেছেন, নলুয়ার হাওরের ৫ থেকে ১৪ নম্বর প্রকল্পের সব কটি বেড়িবাঁধ ঝুঁকিতে আছে। কাজের মান সন্তোষজনক না হওয়ায় বাঁধগুলো ঝুঁকির মধ্যে আছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শওকত ওসমান মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাসহ কৃষি বিভাগের লোকজন ফসল রক্ষায় বাঁধ সংস্কারে দিনরাত কাজ করছেন। তিনি বলেন, উপজেলার ছোট–বড় ১৫টি হাওরে এবার ২১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। তার মধ্যে এখনো ১০ থেকে ১২ হেক্টর জমির ফসল হুমকিতে আছে। দ্রুত ধান কাটা চলছে বলেও তিনি জানান।

পাউবোর মাঠ কর্মকর্তা হাসান গাজী বলেন, নলুয়ার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধগুলো পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন বেড়িবাঁধ। অন্যদিকে ফাটল দেখা দেওয়া বাঁধগুলো পাউবোর ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধ না হলেও তাঁরা সব বাঁধ রক্ষায় মাঠে আছেন।

জগন্নাথপুর উপজেলায় ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকছে। নিরুপায় হয়ে আধা পাকা ধান কাটছেন কৃষকেরা

ইউএনও সাজেদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ফাটল দেখা দেওয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো রক্ষায় তাঁরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। উজানে পাহাড়ি ঢলের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় এখনো ঝুঁকি আছে। তবে ঝুঁকি নিয়েই কৃষকেরা বাঁধ রক্ষা ও ধান কাটা অব্যাহত রেখেছেন।