সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘যেহেতু ঢাকা রাজধানী, এ জন্য সবকিছু ধীরে ধীরে ঢাকার দিকে চলে গেছে। আমাদের অজ্ঞাতে চলে গেছে। আমরা বুঝতেই পারি নাই যে কীভাবে চলে গেছে সবকিছু। ক্রমান্বয়ে ঢাকার দিকে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, পুরো দেশটা ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়া।’
‘চট্টগ্রাম কবে বাণিজ্যিক রাজধানী হবে’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক আজ রোববার নগরের র্যাডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে ভিউর মেঘলা হলে অনুষ্ঠিত হয়। এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে প্রথম আলো। এতে সহায়তা করেছে জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড, আবুল খায়ের গ্রুপ ও টিকে গ্রুপ।
ঢাকায় কেন যেতে হচ্ছে তা চিহ্নিত করে তালিকা করার পরামর্শ দেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় না যাওয়ার জন্য কী কী করতে হবে, তার একটা তালিকা করি। তাহলে দ্রুত সমাধান আসবে। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশগুলোতে প্রায় সব কাজ অনলাইনে হয়। কিন্তু এখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সশরীরে যেতে হয়। যেমন ব্যাংকের ঋণের জন্য ঢাকায় গিয়ে তদবির না করলে হয় না।’
সব ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ার কারণ হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সবাইকে ক্ষমতার কাছে থাকতে হবে। সুতরাং যাঁরা চট্টগ্রামেও বড় বড় ব্যবসায়ী, তাঁরা চট্টগ্রামে থেকে তাঁদের ব্যবসা প্রসার বা সম্প্রসারণ করতে চান, তার জন্য ঢাকায় থাকাটা প্রয়োজন। কারণ, সিদ্ধান্তগুলো সব ঢাকায় হয়। যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা খুব বেশি কেন্দ্রীভূত হয়, ইকোনমিক (অর্থনীতি) ক্ষমতা আস্তে আস্তে ওই জায়গায় চলে যায়। এটি ন্যাচারাল বিষয়।
চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে কার্যকর করতে হলে আমাদের ক্ষেত্রবিশেষে ডিরেগুলেট (অতিনিয়ন্ত্রণমুক্ত) করতে হবে বলে মন্তব্য করেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এটা করতে হবে সিরিয়াসলি। যখন এটা করা হবে তখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু কমে যাবে। ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে বিকেন্দ্রীকরণ করলে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হবে, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে। এতে আমলাতন্ত্রও দুর্বল হবে, দেশের মানুষ বেশি ক্ষমতায় থাকবে। অর্থাৎ সরকারের ক্ষমতা কমিয়ে দেশের মানুষের প্রতিটি ক্ষেত্রে ক্ষমতা বাড়াতে হবে।’
চট্টগ্রামকে লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে বলে মন্তব্য করেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, কারণ, চট্টগ্রামের উপকূল আছে। এটি প্রাকৃতিক। বাংলাদেশে দ্বিতীয় কোনো জায়গা নেই। অনেক জায়গায় বন্দর করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু জনগণের সম্পদ ও অর্থ নষ্ট হয়েছে। আর কিছু হয়নি। উপকূলের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার ওপর জোর দেন তিনি।
চট্টগ্রামকে হাব করা হলে ভারতের উত্তর-পূর্ব ও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়বে বলে মন্তব্য করেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘শুধু চট্টগ্রাম নয়, বাংলাদেশে নগর সরকার খুব প্রয়োজন। মেয়র (চট্টগ্রাম সিটি মেয়র) আমার পাশে বসে আছেন। তিনি বলেছেন বিভিন্ন কাজের সমন্বয় হচ্ছে না। কেননা এখানে নগর সরকার নেই।’
চীনের সাংহাইয়ের উদাহরণ দিয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ওখানকার মেয়রের সবকিছু নখদর্পণে। তিনিই সব সমন্বয় করেন। সেখানে নগর সরকার আছে। চট্টগ্রামে যদি আমরা এটি কার্যকর করতে চাই, আমাদের নগর সরকার দরকার, মেয়র থাকবে এখানে এবং মেয়রের অধীনে পুরো অবকাঠামো থেকে শুরু করে যতগুলো সংস্থা আছে তাতে মেয়র সমন্বয় করবেন। এটার জন্য বিকেন্দ্রীকরণের কথা বারবার বলছি। সেটি সারা দেশে করতে হবে।’
সাবেক মন্ত্রী বলেন, আরেকটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক সিটি করতে হলে এর সরবরাহ শৃঙ্খলা (সাপ্লাই চেইন) নিশ্চিত করতে হবে। এখানে বহুস্তরের যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে; রেলপথ, নদীপথ ও সড়কপথের সমন্বয়ে।
চট্টগ্রামের যানজট নিরসনের জন্য রেলস্টেশন, বাস টার্মিনালগুলো নগরের বাইরে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে আমীর খসরু বলেন, সেবার জন্য মানুষ যত কম সশরীরে সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে যাবেন, তত যানজট কমবে। তাই অনলাইনে সেবার মান বাড়াতে হবে।
চট্টগ্রামে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা আছে জানিয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এখানে পাহাড়, সমুদ্র, নদী আছে। এই সম্পদগুলো ব্যবহার করতে হবে। কানেকটিভিটি বাড়াতে হবে।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘শুধু চট্টগ্রাম নয়, যে অঞ্চলের যে সম্ভাবনা রয়েছে, আমরা তা নিয়ে কাজ করছি। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসছি। আলাপ-আলোচনা করছি। সব সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে অর্থনীতি, মানুষের জীবনযাত্রা পরিবর্তন করতে চাই। প্রত্যেক নাগরিকের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চাই। তাঁদের সুযোগ করে দিতে চাই। অর্থনীতির সুফল যেন সবাই পান, সেটি নিশ্চিত করার পরিকল্পনা আছে। শুধু পৃষ্ঠপোষক গোষ্ঠী লাভবান হবে, এমনটা না। মেগা প্রকল্প করে অর্থ নষ্ট করতে চাই না। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করে যেতে চাই। কেননা কোনো সরকার একা কিছু করতে পারে না। আমরা চাই জাতীয় ঐক্য।’