রাজধানীতে বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে তল্লাশিচৌকি বসিয়ে পুলিশ অবস্থান নেয় সড়কের বিভিন্ন স্থানে। সড়কে গাড়ি থামিয়ে না রাখার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে তাগাদা দিচ্ছেন এক পুলিশ সদস্য। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় দুপুর পৌনে ১২টায়
রাজধানীতে বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে তল্লাশিচৌকি বসিয়ে পুলিশ অবস্থান নেয় সড়কের বিভিন্ন স্থানে। সড়কে গাড়ি থামিয়ে না রাখার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে তাগাদা দিচ্ছেন এক পুলিশ সদস্য। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় দুপুর পৌনে ১২টায়

বিএনপির সমাবেশ

ঢাকায় ঢোকার পথগুলোতে পুলিশের তল্লাশি-জেরা, হয়রানি-ভোগান্তি

ঢাকায় বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে তল্লাশিচৌকি বসিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত থেকে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। গাড়িতে ঢুকে কিংবা গাড়ি থেকে নামিয়ে নানা বিষয়ে জেরা করা হয় যাত্রীদের। অনেকের মুঠোফোন ঘেঁটে সমাবেশে যাচ্ছেন, এমন প্রমাণ খোঁজার চেষ্টা করেন পুলিশ সদস্যরা। পুলিশের এমন তৎপরতাকে অনেক যাত্রী হয়রানি বলছেন। আবার কোথাও কোথাও গাড়ি চলাচল কম থাকায় দৈনন্দিন কাজে বের হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা।

ঢাকার আবদুল্লাহপুর, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড ও রূপগঞ্জ, ঢাকার অদূরে সাভার, মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর ও কেরানীগঞ্জের খেয়াঘাট এলাকা থেকে পাওয়া তথ্যে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।

ঢাকার অন্যতম প্রবেশমুখ আবদুল্লাহপুর মোড়ে যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশি চালায় পুলিশ। রফিকুল ইসলাম নামের এক যাত্রীর দাবি, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নয়। তিনি কোনো সভা-সমাবেশেও যাচ্ছেন না। তবু বাসে তল্লাশির সময় তাঁর ব্যাগ, মুঠোফোন তল্লাশি করা হয়েছে। এতে তিনি বিরক্ত। তাঁর ভাষ্য, ‘তল্লাশির নামে এটা যাত্রী হয়রানি ছাড়া আর কিছু না। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট করা হচ্ছে।’

ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-আশুলিয়া সড়ক এসে যুক্ত হয়েছে আবদুল্লাহপুর মোড়ে। এর মধ্যে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে গাজীপুর, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন জেলাসহ আশপাশের এলাকা থেকে ঢাকায় ঢোকে মানুষ। ঢাকা-আশুলিয়া সড়ক হয়ে টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জসহ রাজশাহী বিভাগের একাধিক জেলার লোকজন রাজধানীতে ঢোকে। এখানে দুটি সড়ক ঘিরেই পুলিশের তল্লাশি ও জেরার তৎপরতা আছে।

সকাল ১০টার দিকে আবদুল্লাহপুরে সরেজমিন দেখা যায়, বিআরটি প্রকল্পের উড়ালসড়কের নিচে বসেছে পুলিশের তল্লাশিচৌকি। পাশেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন ১০ থেকে ১৫ জন পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে দূরপাল্লার কোনো বাস আসতে দেখলেই গতিরোধ করেছেন তাঁরা। বাসে উঠে তাঁরা নাম, পরিচয়, ঠিকানা জিজ্ঞাসা করছেন। কাউকে কাউকে বাস থেকে নামিয়ে তল্লাশি করছেন। চালকের আসন, বাসের আসনসহ তল্লাশি করছেন পুরো বাস। তল্লাশিচৌকিতে থাকা উত্তরা পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাসির বলেন, ‘আমরা রাত থেকেই তল্লাশি চালাচ্ছি। তবে কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না।’

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ঢাকামুখী প্রায় সব গাড়িতেই তল্লাশি করে পুলিশ। যাত্রীবাহী পরিবহনগুলোতে পুলিশের তল্লাশির ফলে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।

টাঙ্গাইলের মধুপুর থেকে ঢাকায় যাবেন সোহেল মিয়া। তিনি বলেন, ‘গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় আসামাত্রই পুলিশ বাস থামিয়ে নারী যাত্রী ছাড়া প্রায় সবাইকে তল্লাশি করেছে। আমরা অযথা হয়রানির শিকার হচ্ছি।’

পুলিশের তল্লাশির কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় যানবাহন কম চলাচল করছে। ঢাকাগামী যাত্রী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘কাকরাইলে যাব। এক ঘণ্টা ধরে গাড়ির জন্য সাইনবোর্ড এলাকায় অপেক্ষা করছি। কিন্তু গাড়ি পাচ্ছি না। অনেকক্ষণ পর কোনো গাড়ি এলেই থামতে না দিয়ে পুলিশ তাড়িয়ে দিচ্ছে, যাত্রীরা যেতে পারছে না।’

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাব সুলতানা কামাল সেতু এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, পুলিশ ঢাকামুখী বাস, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসে তল্লাশির পাশাপাশি যাত্রীদের কাছে ঢাকায় যাওয়ার কারণ জানতে চাচ্ছে। অনেক যাত্রীর মুঠোফোন তল্লাশি করছে। ঢাকামুখী তিনটি মাইক্রোবাস থামিয়ে জেরা করলে যাত্রীরা বলেন, তাঁরা ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশে যাচ্ছেন। পুলিশ তাদের নাম-পরিচয় ও মুঠোফোন নম্বর লিখে রেখে বাড়িতে ফেরত পাঠান।

মাইক্রোবাসে থাকা যাত্রীদের একজন আবদুল কাইয়ুম নিজেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর পৌরসভা শ্রমিক দলের নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘পুলিশ আমাদের মহাসমাবেশে যেতে দেয়নি। তারা আমাদের ১০ জনের নাম-ঠিকানা, মোবাইল নম্বর লিখে রেখেছে। আমাদের গাড়িটি চালকসহ আটক করেছে। পুলিশ হুমকি দিয়ে বলেছে, ঢাকার সমাবেশে গেলে আমাদের নামে গাড়ি ও মোটরসাইকেল চুরির মামলা দেবে। মহাসমাবেশে কোনো গ্যাঞ্জাম হলে আমাদের নামে মামলা করবে।’

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর, সাভার, হেমায়তেপুর, আমিনবাজার এলাকায় তল্লাশি চালান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ ছাড়া সাভারের বিরুলিয়া, আশুলিয়ার ধউর, জিরানী, জিরাবো ও বাইপাইলেও তল্লাশি করা হয়। সাভারের আমিনবাজার এলাকার তল্লাশিচৌকিতে রাখা প্রিজন ভ্যানে আটকে রাখা কয়েকজন বলেন, ‘দল করি বইলা হেরা গ্রেপ্তার করল।’ একই তল্লাশিচৌকিতে সকাল ৮টার দিকে সাভারের ইকবাল হোসেন নামের এক ব্যক্তির মুঠোফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে দেখা যায় এক পুলিশ সদস্যকে।

মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার মানিকগঞ্জ-হেমায়েতপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে যানবাহনে পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছে। সেই সঙ্গে এই মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নিয়েছেন। তাঁরা বিএনপির বিপক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছেন। সিঙ্গাইর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সায়েদুর রহমানের নেতৃত্বে দলীয় নেতা-কর্মীরা অবস্থান করছেন। তবে আওয়ামী লীগের নেতা সায়েদুর রহমান দাবি করেন, বিএনপির নেতা-কর্মীদের হয়রানি করতে তাঁরা অবস্থান নেননি। ঢাকায় তাঁদের ‘তারুণ্যের জয়যাত্রা’য় দলীয় নেতা-কর্মীরা যাতে সুশৃঙ্খলভাবে যেতে পারেন, তা তদারক করছেন।

বুড়িগঙ্গা নদী পাড়ি দিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের আগমন ঠেকাতে কয়েকটি খেয়াঘাটে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী ও পুলিশ সদস্যরা অবস্থান নিয়েছেন। আজ সকাল থেকেই খেয়াঘাটগুলোতে নৌকা চলাচল বন্ধ আছে। এ কারণে নদী পার হতে ভোগান্তিতে পড়েছেন অনেকে। রাজধানীর তিনটি প্রবেশমুখ কেরানীগঞ্জের বছিলা সেতুর কাছে ঘাটারচর এলাকায়, বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতুর কাছে কদমতলী এলাকায় এবং ঢাকা-মাওয়া সড়কের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঢাকাগামী যানবাহনগুলোতে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। পুলিশের একটি সূত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছে, বছিলা সেতুর কাছ থেকে ১৩ জন এবং বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু এলাকা ও বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতুর দক্ষিণ প্রান্ত থেকে ৭২ জনকে আটক করা হয়েছে।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কালীগঞ্জ বাজার এলাকার বাসিন্দা মো. রমিজ উদ্দিন বলেন, ‘আমি পুরান ঢাকার সদরঘাট এলাকায় ইস্ট বেঙ্গল মার্কেটে চাকরি করি। আজ শুক্রবার ছুটির দিন থাকা সত্ত্বেও মালিক বলেছেন, সকাল সকাল দোকানে যেতে হবে। সকাল সাড়ে আটটায় পূর্ব আগানগর এলাকার আলম মার্কেট এলাকায় বুড়িগঙ্গার খেয়াঘাটে এসে দেখি নৌকা চলাচল বন্ধ। ঘাটে পুলিশ বসে আছে।’