
চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ও বনাঞ্চলকে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছে সন্ত্রাসীরা—এমন তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব এলাকায় প্রকাশ্যে খুন ও গোলাগুলির পর দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে আত্মগোপন করছে অস্ত্রধারীরা। দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে তাদের ধরতে গিয়ে বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে।
পরপর কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের পর এবার এসব সন্ত্রাসীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে তিন উপজেলায় চারটি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ক্যাম্প স্থাপনের প্রস্তাব করেছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশ। প্রতিটি ক্যাম্পে এক প্লাটুন করে সদস্য রাখার পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের চলাচলের পথগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্যামেরা বসানো এবং থার্মাল ড্রোন দিয়ে নজরদারির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সের সদস্যদের টহলে রাখার কথাও বলা হয়েছে।
গত মাসে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শকের (ডিআইজি) সই করা চিঠিতে এসব প্রস্তাব করা হয়। এতে বলা হয়েছে, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় নিয়মিত টহল চালাতে থানা-পুলিশকে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়। এসব এলাকা ব্যবহার করে অস্ত্র, মাদক, বন্য প্রাণীসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য পরিবহনের তথ্যও রয়েছে পুলিশের কাছে।
তিন উপজেলায় থানা রয়েছে পাঁচটি। ওই সব থানায় পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে ১০টি। এগুলোর সঙ্গে নতুন করে চার ক্যাম্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, রাউজানসহ তিন উপজেলায় চারটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের প্রস্তাব তাঁরা পেয়েছেন। রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকা। সেখানে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন জরুরি। তবে এপিবিএনের লোকবলসংকট রয়েছে। নতুন ব্যাটালিয়ন হলে দ্রুত ক্যাম্প স্থাপনের চেষ্টা করা হবে।
সন্ত্রাসীরা প্রযুক্তির ব্যবহারেও এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের চলাচলের পথগুলোতে নিয়মিত তল্লাশি ও অভিযান জোরদার করতে হবে, যাতে তারা অপরাধ করে সহজে দুর্গম এলাকায় পালিয়ে যেতে না পারে।মো. সাখাওয়াত হোসেন, সহকারী অধ্যাপক, অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাউজানে ২৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ১৮টি রাজনৈতিক বিরোধের জেরে হয়েছে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
সর্বশেষ গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় মাসুদুল হক চৌধুরীকে। তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, পরবর্তী নির্বাচনে ইউপি চেয়ারম্যান পদে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। পুলিশের ধারণা, কর্ণফুলী নদীর বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁকে হত্যা করা হয়। এ মামলায় সন্ত্রাসী রায়হানসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের ২২ এপ্রিল রাউজানের গাজীপাড়ার বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল কর্মী মুহাম্মদ ইব্রাহিমকে (৩০)। তিনটি অটোরিকশায় করে আসা ১০ থেকে ১২ জন অস্ত্রধারী তাঁকে গুলি করে। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এ সময় তাঁর বাবা ও চাচাকেও লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়।
এর দুই দিন আগে ২০ এপ্রিল বাগোয়ান ইউনিয়নের গরিব উল্লাহপাড়া গ্রামের একটি বাসায় ভাত খাওয়ার সময় গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল কর্মী মুহাম্মদ মানিক আবদুল্লাহকে (৩৬)। পরপর দুটি হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ওই দুটি হত্যাকাণ্ডের পর রাউজানে ১০টি তল্লাশিচৌকি বসিয়ে টহল জোরদার করে পুলিশ। এতে অস্ত্র উদ্ধার ও খুনোখুনি কিছুটা কমে আসে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান। এরপরই দুর্গম এলাকাগুলোতে স্থায়ীভাবে পুলিশ ক্যাম্প ও টহল দল রাখার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
পুলিশের প্রস্তাব অনুযায়ী, রাউজানে একটি এবং রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর ও পদুয়া এলাকায় দুটি এপিবিএন ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। ফটিকছড়িতে হবে আরও একটি ক্যাম্প। প্রতিটি ক্যাম্পে এক প্লাটুন এপিবিএন সদস্যসহ ৫৫ জনের জনবল চাওয়া হয়েছে। চারটি ক্যাম্পের জন্য মোট ২২০ জনের জনবল প্রয়োজন হবে।
প্রস্তাবনায় রাউজানের ভৌগোলিক অবস্থার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। উপজেলার পূর্ব দিকে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ও রাবারবাগান এবং উত্তরে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার বনাঞ্চল রয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, এসব বনাঞ্চলে অবস্থান নিয়ে অস্ত্রধারীরা রাউজান ও চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে গোলাগুলি ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আবার দুর্গম এলাকায় আত্মগোপন করে।
বনভূমির মধ্যে থাকা গুচ্ছগ্রামগুলোও সন্ত্রাসীদের অপরাধের প্রস্তুতি ও পালিয়ে থাকার জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের প্রস্তাব অনুযায়ী, রাউজানে একটি এবং রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর ও পদুয়া এলাকায় দুটি এপিবিএন ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। ফটিকছড়িতে হবে আরও একটি ক্যাম্প। প্রতিটি ক্যাম্পে এক প্লাটুন এপিবিএন সদস্যসহ ৫৫ জনের জনবল চাওয়া হয়েছে। চারটি ক্যাম্পের জন্য মোট ২২০ জনের জনবল প্রয়োজন হবে।
এপিবিএন ক্যাম্পের পাশাপাশি তিন উপজেলার প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং সন্ত্রাসীরা যেসব পথ ব্যবহার করে, সেসব জায়গায় এআই ক্যামেরা বসানোর প্রস্তাব করেছে পুলিশ। শনাক্ত সন্ত্রাসীদের ছবি ও তথ্য ক্যামেরার নজরদারি ব্যবস্থায় যুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় থার্মাল ড্রোন দিয়ে নজরদারির প্রস্তাব রয়েছে। অস্ত্রধারীদের অবস্থান শনাক্ত ও তাদের চলাচলের ওপর নজরদারি বাড়াতে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন যানবাহনে তল্লাশি ও নজরদারিও জোরদারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মো. নাজিমুল হক সরেজমিনে ঘুরে এই প্রস্তাব তৈরি করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির পাহাড়ি ও বনাঞ্চল সন্ত্রাসীরা নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। তাদের কাছে ভারী অস্ত্রও রয়েছে। এ কারণে দুর্গম এলাকায় ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এপিবিএনের চারটি ক্যাম্প স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
মো. নাজিমুল হক বলেন, ক্যাম্প স্থাপনের পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের চলাচলের পথগুলোতে এআই ক্যামেরা বসানো এবং থার্মাল ড্রোন দিয়ে নজরদারি করা হবে। এতে সন্ত্রাসীদের চলাচল শনাক্ত করা সহজ হবে। যানবাহনে তল্লাশিও বাড়ানো হবে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের প্রস্তাবে রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর ও পদুয়া এবং ফটিকছড়ির দুর্গম পাহাড়ি ও বনাঞ্চলের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব এলাকায় অস্ত্রধারীদের অবস্থান ও অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে পুলিশের উদ্বেগ রয়েছে।
রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, রাঙ্গুনিয়ার দুটি ইউনিয়নে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন খুবই জরুরি। বিষয়টি নিয়ে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। দ্রুত ক্যাম্প স্থাপন হবে বলে তিনি আশা করেন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমও বলেন, পুলিশ ক্যাম্পগুলো চালুর জন্য তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সন্ত্রাসীরা প্রযুক্তির ব্যবহারেও এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের চলাচলের পথগুলোতে নিয়মিত তল্লাশি ও অভিযান জোরদার করতে হবে, যাতে তারা অপরাধ করে সহজে দুর্গম এলাকায় পালিয়ে যেতে না পারে।