চটাইন্ন্যা বিলে পরিযায়ী লালমাথা ভূতিহাঁস
চটাইন্ন্যা বিলে পরিযায়ী লালমাথা ভূতিহাঁস

পাখি গুনতে টাঙ্গুয়ার হাওরে

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে ফেব্রুয়ারি মাসে পানি একেবারে কমে যায়। পরিযায়ী পাখির খাবারের সুবিধার জন্য এ সময়টা একেবারে ঠিকঠাক। এবার টাঙ্গুয়ায় গেলাম ফেব্রুয়ারি মাসের ৬ তারিখে। পরের দিন পাখিশুমারি করব।

এ হাওরের লেচুয়ামারা বিলে ঢুকে চারপাশটা হলুদাভ মনে হলো। জলজ উদ্ভিদগুলোর জীবনকাল প্রতিবছর এ সময় ফুরিয়ে যায়। এ জন্য হলুদ রংটা জ্বলজ্বল করে। এ রকম একটি প্রাকৃতিক কম্বিনেশনে পাঁচটি দেশি মেটেহাঁসের দেখা পেলাম। পানির সঙ্গে পাখিগুলোর গায়ের রং দারুণভাবে মিলে গেছে। ক্যামেরায় ফোকাস করতেও বেশ বেগ পেতে হলো। এই পাখিটি হাওর এলাকায় ডিম পাড়ে ও বাচ্চা ফোটায়। এক যুগ আগেও এ প্রজাতির হাঁসের দেখা পেয়েছি দু-তিন হাজার। এখন শীতের পাখিশুমারিতে দেখা মেলে ১০-২০টি। মূলত পাখির বাসা বানানোর জায়গা না থাকায় এই সংকট। হাওরে গোচারণের ফলে ঘাসবন ধ্বংস হয়েছে। হাওরে এমন পাখির আর বাসা বানানোর জায়গা নেই বললেই চলে।

টাঙ্গুয়ার এই লেচুয়ামারা বিলটি পাখিদের স্বর্গ। দুই যুগ ধরে এই বিলে নিয়মিত পাখি গণনা করি। এই এক বিলেই দেখা মেলে এক লাখের বেশি জলচর পরিযায়ী হাঁসের। এ বছর এই বিলে কোনো পাখি নেই। এই বিলের পশ্চিম পাশে হাতিরগাথার বিলের কান্দা। সেখানেই মাত্র ২০০ পাখির দেখা পেলাম। টাঙ্গুয়ায় পাখিশুমারিতে এসে এই প্রথম এত হতাশ হলাম। এ দেশে যত জলচর হাঁসপাখি আসে, তার অর্ধেকই দেখা যায় টাঙ্গুয়ায়। কিন্তু এ বিলে ঢুকে সে রকম পাখি পেলাম না।

লেচুয়ামারা বিল থেকে হাতিরগাথা, বল্লারডুবি ও বেরবেরিয়া বিলে গেলাম। এই বিলগুলো একটার সঙ্গে অন্যটি লাগানো। এত বড় এলাকায় হাতে গোনা কয়েক জোড়া পরিয়ায়ী হাঁসের দেখা পেলাম। পিয়ং হাঁস আর মরচেরং ভূতিহাঁস ছাড়া আর কিছু নেই। এতটুকু ঘুরতে গিয়ে প্রায় ১১টা বেজে গেল। শীতের রোদ, তাই ভালোই লাগছিল। তবে পাখির দেখা না পেয়ে একদমই হতাশ হয়ে গেলাম। আমাদের প্রিয় টাঙ্গুয়ার এই রূপ দেখতে হবে আগে ভাবিনি। তবে আশায় রইলাম অন্য বিলে অনেক পাখির দেখা পাব।

বল্লারডুবি হয়ে রুপাভুঁই বিলে ঢোকার মুখে ঘাসবনের ফাঁকে ফাঁকে শ খানেক শামুকখোলের সঙ্গে বেগুনি কালেমের দেখা পেলাম। এখানেই দেখা মিলল কয়েকজন অসাধু জেলের। তাঁরা অবৈধ জাল চায়না দুয়ারি দিয়ে মাছ ধরায় ব্যস্ত। এ ধরনের জালের কারণেই মাত্র পাঁচ বছরে হাওরটি চোখের সামনে মাছশূন্য হয়ে গেল। হাওরের অন্য বিলগুলোতেও এই জালের রাজত্বে হাওরের জলজ পরিবেশ ধ্বংসের মুখে।

রুপাভুঁই বিলে ঢুকেই মনটা ভরে গেল। কয়েক হাজার হাঁসের একটি বড় দল দেখতে পেলাম। এই বিলেই হাঁসগুলো দিনের বেলা বিশ্রাম নিচ্ছে। মূলত এই হাঁসগুলো রাতের বেলায় খেতে যায়। এই বিলে দুটি ফুলুরি হাঁসের দেখা পেলাম। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখলাম এক ঝাঁক খয়ার কাস্তেচরার। পানি কম থাকায় শত শত কালা পানকৌড়ি ও সাদা বকের যেন মেলা বসেছে এই বিলে। পুরো বিলটায় আমার কাছে সাদা-কালো মনে হলো। পাখি দেখার অসাধারণ এক অনুভূতি।

রুপাভুঁই থেকে চটাইন্ন্যা বিলে ঢুকে গেলাম। প্রায় দুপুর ১২টা বাজে। পুরো বিলে যেন প্রাণের মেলা। তিন হাজার খয়ার কাস্তেচরার সঙ্গে পেলাম প্রায় দশ হাজার হাঁসপাখির একটি বড় দল। এই দলে প্রায় আট প্রজাতির হাঁসপাখি ছিল। সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় পেলাম উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস। একসঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৭০০ পাখির এক বড় ঝাঁক। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগল কয়েক জোড়া নীলশীর হাঁসের সঙ্গে এক ডজনের দেশি মেটে হাঁসের দেখা পেয়ে। এই এক বিলেই প্রায় দুই ঘণ্টা কাটিয়ে দিলাম।

টাঙ্গুয়ার হাওরে এবার ৪৭ জাতের ২৯ হাজার পাখি দেখা গেছে। এর মধ্যে পরিযায়ী প্রজাতি ছিল ৩৬টি। সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় দেখা গেছে লালমাথা ভূতিহাঁস। সংখ্যায় প্রায় ৬ হাজার।

  • সীমান্ত দীপু: বন্য প্রাণী গবেষক