যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক

জুতা ও চামড়া পণ্য রপ্তানি নিয়ে দুশ্চিন্তা

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই দেশ থেকে জুতা ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আদেশ বাড়ছে। তার কারণ, বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চীন থেকে ক্রয়াদেশ সরছে। তার একটা অংশ বাংলাদেশেও আসছে। এতে বিদায়ী ২০২৪–২৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াবিহীন জুতা এবং চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে।

তবে মার্কিন প্রশাসনের আরোপ করা বাড়তি তথা পাল্টা শুল্ক না কমলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের পর চামড়া ও চামড়াবিহীন জুতা এবং চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানিতে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের। কারণ, তৈরি পোশাকের পর এই খাতের রপ্তানিই সবচেয়ে বেশি।

রপ্তানিকারকেরা বলছেন, বাংলাদেশের তৈরি চামড়া ও চামড়াবিহীন জুতা এবং চামড়া পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। এই বাজারে রপ্তানি আরও বাড়ানোর ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারকে উপেক্ষা করে এই খাতের রপ্তানির ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হবে না। কেননা, বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের সোর্সিং যুক্তরাষ্ট্রের বাজার মাথায় রেখেই করা হয়। সে জন্য দীর্ঘ মেয়াদে বাজারটিতে টিকতে হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত পাল্টা শুল্ক কমানো ছাড়া কোনো উপায় নেই।

বাংলাদেশি পণ্য আমদানিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প তথা মার্কিন প্রশাসন ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে, যা ১ আগস্ট কার্যকর হওয়ার কথা। দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা বর্তমানে গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে পণ্য রপ্তানি করেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২ এপ্রিল বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের পণ্য আমদানিতে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। পাঁচ দিনের মাথায় ৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রকে দুটি চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ। ৯ এপ্রিল ট্রাম্প প্রশাসন ন্যূনতম ১০ শতাংশ শুল্ক রেখে সব দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ তিন মাসের জন্য স্থগিত করে। তিন মাসের সময় শেষ হয় ৯ জুলাই। এর আগের দিন ৮ জুলাই ট্রাম্প নতুন করে ঘোষণা করেন যে বাংলাদেশের জন্য পাল্টা শুল্কহার হবে ৩৫ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা পাল্টা শুল্কহার কমাতে তৃতীয় দফার আলোচনা করতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে রয়েছে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল। দলটি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) কর্মকর্তাদের সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার তিন দিনের আলোচনা শুরু করেছে। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশ থেকে ৬৭ কোটি ডলারের চামড়ার জুতা রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় সাড়ে ২৩ শতাংশ বেশি। রপ্তানি হওয়া চামড়ার জুতার মধ্যে ৪৩ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে রপ্তানি হয় ২৮ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের চামড়ার জুতা। তারপরের অবস্থানে রয়েছে নেদারল্যান্ডস, কানাডা ও জার্মানি।

জানতে চাইলে লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) সহসভাপতি নাসির খান প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের পণ্য রপ্তানি দ্রুত বাড়ছিল। বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চীন থেকে ব্যবসা সরাচ্ছে মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। তা ছাড়া বাংলাদেশের কারখানাগুলো দ্রুত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করছে। কিন্তু ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি হুমকির মধ্যে পড়ে যাবে। শুধু তা–ই নয়, চীনারা ইউরোপের বাজারমুখী হওয়ায় সেখানেও তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে।

চামড়ার জুতার মতো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানিও বাড়ছে। বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫২ কোটি ডলারের চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয় ১ কোটি ৯৫ লাখ ডলারের চামড়াবিহীন জুতা। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫১ শতাংশের বেশি।

এনপলি ফুটওয়্যারের মূল প্রতিষ্ঠান এনপলি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রিয়াদ মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘চলতি বছর আমরা কয়েকটি নতুন মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাজ করেছি। পণ্য রপ্তানিও হয়েছে। সেসব ক্রেত আরও বেশি ক্রয়াদেশ দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। তবে বাড়তি শুল্ক আরোপের পর থেকে তারা চুপচাপ রয়েছে। এর চেয়েও ভয়াবহ হচ্ছে, উচ্চ শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রয়াদেশ হারিয়ে চীনারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ক্রেতাদের কম দাম অফার করছে। এতে আমাদের ক্রয়াদেশ স্থগিত হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পাল্টা শুল্ক প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছাকাছি নেমে আসলে আমরা অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াতে পারব।’

বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৪ কোটি ডলারের চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ২১ শতাংশ কম। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ৩৫ কোটি ডলারের চামড়া পণ্য।

চামড়ার জুতার মতো বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্যের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। গত অর্থবছর ৯ কোটি ডলারের চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। তার বাইরে ভারতে ৭ কোটি ১৯ লাখ, জাপানে ৫ কোটি ৬৩ লাখ ও বেলজিয়ামে ২ কোটি ৮২ লাখ ডলারের চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়।

ঢাকার সাভারের এসেন্সর ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদার প্রোডাক্টস নামের প্রতিষ্ঠান প্রতি মাসে গড়ে ১০ লাখ মার্কিন ডলারের চামড়া পণ্য রপ্তানি করে। তাদের মোট রপ্তানির ৯০ শতাংশের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র।

এসেন্সর ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদার প্রোডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কে এম মুশফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কারখানার উন্নত কর্মপরিবেশ ও পণ্যের মানের কারণে নতুন নতুন মার্কিন ক্রেতারা আসছিল। তবে ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ থাকলে তাদের অনেকেই বিকল্প বাজারে চলে যাবে। রাতারাতি না গেলেও ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে সেটি ঘটবে।