
সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসির) বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিসিএস পরীক্ষায় আবেদনকারী এবং চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের মধ্যে বড় একটি অংশই তরুণ। বিশেষ করে ২৪ থেকে ২৬ বছর বয়সীদের মধ্যে আবেদনের হার যেমন বেশি, চূড়ান্ত সাফল্যের দৌড়েও তাঁরাই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকছেন। তবে ৪৪তম থেকে ৪৯তম বিসিএসের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পঁচিশের কোঠার ঠিক পরেই ২৭ থেকে ২৯ বছর বয়সীরাও সাফল্যের বড় একটি অংশ দখল করে রাখছেন।
পিএসসির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি বিসিএসেই ২৪ থেকে ২৬ বছর বয়সী প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় আবেদন করছেন। ৪৪তম বিসিএসে এই বয়সী আবেদনকারী ছিলেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯১৩ জন, যা মোট আবেদনকারীর ৫০ শতাংশের বেশি। একইভাবে ৪৫তম বিসিএসেও এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ৭৮২ জন। সর্বশেষ বিসিএসগুলোতেও এই ধারার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি।
৩০ বা এর বেশি বয়সী প্রার্থীদের মধ্যে আবেদন ও সাফল্যের হার—উভয়ই তুলনামূলকভাবে বেশ কম।
সাফল্যের পরিসংখ্যান বলছে, চূড়ান্ত সুপারিশের ক্ষেত্রেও ২৪-২৬ বছর বয়সীরাই এগিয়ে। ৪৪তম বিসিএসে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ১ হাজার ৬৭৬ জনের মধ্যে ১ হাজার ১৫ জনই ছিলেন ২৪ থেকে ২৬ বছর বয়সী। অর্থাৎ মোট সুপারিশপ্রাপ্তদের প্রায় ৬০ শতাংশই এই বয়সভিত্তিক শ্রেণির। ৪৫তম বিসিএসেও ১ হাজার ৮০৭ জনের মধ্যে ১ হাজার ১৯০ জনই ছিলেন এই বয়সের।
পরিসংখ্যানে ২৪-২৬ বছর বয়সীরা শীর্ষে থাকলেও প্রতিযোগিতার মাঠে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ২৭-২৯ বছর বয়সীদের সংখ্যাটিও বেশ বড়। ৪৪তম বিসিএসে এই বয়সসীমার ৪৩৭ জন (২৬.০৭%) এবং ৪৫তম বিসিএসে ৩৮২ জন (২১.১৪%) চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছেন। বিশেষ করে ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে (চিকিৎসক) ২৪-২৬ বছর বয়সীদের ছাড়িয়ে গেছেন ২৭-২৯ বছর বয়সীরা। এই বিসিএসে ২৭-২৯ বছর বয়সী প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮০৭ জন (৫১.৬৩%) চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছেন। অর্থাৎ কর্মজীবনের শুরু বা প্রস্তুতির মধ্যগগনে থাকা এ দুই বয়সভিত্তিক শ্রেণিই বিসিএসের মূল প্রাণশক্তি।
আবেদনের বয়সকে চূড়ান্ত নিয়োগের বয়স ধরা যাবে না। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হতে দুই-তিন বছর পর্যন্ত লেগে যায়। এরপর প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও সময় লাগে।তারিক মনজুর, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অন্যদিকে ৩০ বা এর বেশি বয়সী প্রার্থীদের মধ্যে আবেদন ও সাফল্যের হার—উভয়ই তুলনামূলকভাবে বেশ কম।
এ বিষয়ে শিক্ষা ও ক্যারিয়ার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২৪ থেকে ২৬ বছর বয়সে শিক্ষার্থীরা সাধারণত স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শেষ করে পূর্ণ উদ্যমে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। এই বয়সে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় একাগ্রতা ও ধৈর্য বেশি থাকে। এ ছাড়া একাডেমিক পড়ালেখার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকায় সাধারণ জ্ঞান ও অন্যান্য বিষয়ে দখল তাঁদের অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা বাড়লে প্রস্তুতির মান কিছুটা প্রভাবিত হতে পারে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে পিএসসির পরিসংখ্যানে।
এদিকে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা নিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের আলোচনা চলছে। বিসিএসসহ সরকারি চাকরির পরীক্ষাগুলোয় আবেদনের বয়স বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন সময়ে প্রার্থীদের আন্দোলন করতে দেখা যায়। গত বছরের শেষ দিকে বয়সসীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩২ করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কিছু প্রার্থী আবেদনের বয়স ৩৫ করার দাবি জানিয়ে আসছেন। এটি করা হলে দেশের মেধা ও তারুণ্যশক্তির গুরুতর অপচয় হবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আবেদনের বয়সকে চূড়ান্ত নিয়োগের বয়স ধরা যাবে না। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষ করে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হতে দুই-তিন বছর পর্যন্ত লেগে যায়। এরপর প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও সময় লাগে। ফলে বয়স ৩৫ করা হলে দেখা যাবে, এ ধরনের একজন প্রার্থী ৩৭-৩৮ বছর বয়সে কাজ শুরু করছেন।
তারিক মনজুর আরও বলেন, যাঁরা আরও বয়স বাড়ানোর দাবি করেন, তাঁদের বোঝা দরকার, এখন একজন প্রার্থী লড়ছেন তিন-চার লাখ প্রতিযোগীর সঙ্গে। তখন সম্ভাব্য পাঁচ-ছয় লাখ প্রতিযোগীর সঙ্গে লড়তে হবে। এর চেয়ে বরং দাবি ওঠানো দরকার—যাতে বিসিএসকে নিয়মিত করা যায়। এতে ৩০-৩২ বছরের মধ্যে পাঁচ-সাতবার পরীক্ষা দিয়েও যাঁদের সরকারি চাকরি হবে না, তাঁরা পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে ভিন্ন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে নেওয়ার চিন্তা করতে পারবেন।
পিএসসির এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট করে যে তারুণ্যের উদ্দীপনাই বিসিএস ক্যাডার হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
পিএসসির এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে ৪৪, ৪৫ ও ৪৯তম বিসিএসে আবেদন ও চূড়ান্ত সাফল্যের ক্ষেত্রে ২৪-২৬ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে আছেন। তবে ৪৮তম বিশেষ বিসিএস (চিকিৎসকদের জন্য) ক্ষেত্রে ২৭-২৯ বছর বয়সীদের সুপারিশের সংখ্যা কিছুটা বেশি দেখা গেছে। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, স্নাতক শেষ করার পরপরই যাঁরা পরীক্ষায় বসছেন, তাঁদের মধ্যেই ক্যাডার হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি।
নারীদের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, ২৪-২৬ বছর বয়সেই আবেদনের হার সবচেয়ে বেশি। তবে মোট আবেদনের তুলনায় পুরুষ প্রার্থীদের চূড়ান্ত সুপারিশের হার অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীদের তুলনায় বেশি লক্ষ করা গেছে।