এআই কি কাজের বোঝা কমাল না বাড়াল, গবেষণায় উঠে এল যে চিত্র

ধরা যাক, একটি কাজ করতে আপনার আগে তিন ঘণ্টা লাগত। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে আপনি সেটি মাত্র এক ঘণ্টায় শেষ করছেন। সাধারণ হিসাবে আপনার হাতে এখন দুই ঘণ্টা বাড়তি সময় থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে কি তা–ই হচ্ছে? আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নতুন গবেষণা বলছে ঠিক উল্টো কথা। এআই মানুষের কাজের বোঝা কমানোর বদলে উল্টো কাজের চাপ ও তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছে। ‘এআই ডাজ নট রিডিউস ওয়ার্ক—ইট ইনটেনসিফাইজ ইট’ শীর্ষক এই গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মীরা এখন আগের চেয়ে দ্রুত কাজ করছেন এবং অনেকেই নিয়মিত বিরতি নিতে ভুলে যাচ্ছেন।

গবেষণায় যা দেখা গেছে—

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা টানা আট মাস ২০০ জন কর্মীর কাজের ধরন পর্যবেক্ষণ করেছেন। গবেষণার শুরুতে কাউকে এআই ব্যবহারে বাধ্য করা হয়নি। তবে কর্মীদের বিভিন্ন এআই টুলের প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন দেওয়া হয়েছিল। গবেষকেরা লক্ষ করলেন, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কর্মীরা নিজেরাই কাজের গতি বাড়াতে শুরু করেছেন। এআইয়ের সহায়তায় কাজ দ্রুত হওয়ায় তাঁদের মধ্যে একটি নতুন মানসিকতা তৈরি হয়। তাঁরা ভাবতে শুরু করেন, আগে যা অসম্ভব ছিল, এখন তা সম্ভব। ফলে কাজ জমানোর বদলে বা অন্যকে দেওয়ার বদলে তাঁরা নিজেরাই সব কাজ হাতে নিতে শুরু করেন। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়লেও দিন শেষে কর্মীরা মারাত্মক ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন।

‘আরও কাজ সম্ভব’—এই মানসিকতাই বাড়াচ্ছে চাপ—

গবেষণায় একটি বিশেষ দিকের কথা বলা হয়েছে। আগে যেসব কঠিন কাজ কর্মীরা সহকর্মীদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন কিংবা ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখতেন, এখন এআইয়ের কারণে সেগুলো তাঁরা নিজেরাই করতে শুরু করেছেন। একসময় যা ছিল দলগত কাজ, এখন তা হয়ে দাঁড়িয়েছে একক পরিশ্রমের বিষয়। কাজ দ্রুত শেষ হওয়ায় কর্মীরা বিশ্রামের বদলে নতুন নতুন কাজ হাতে নিচ্ছেন। তাদের মনে হচ্ছে, এআই যেহেতু পাশে আছে, তাই আরও অনেক কাজ করা সম্ভব। এই বাড়তি আত্মবিশ্বাসই মূলত কর্মীদের ওপর কাজের পাহাড় তৈরি করছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, প্রযুক্তির সহায়তায় সময় বাঁচলেও সেই বেঁচে যাওয়া সময়টুকু ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় না করে কর্মীরা আবারও অফিসের কাজেই খরচ করছেন।

কর্মসংস্কৃতি ও বদলে যাওয়া প্রত্যাশা—

শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, এআই মানুষের কাজের চাপ কমিয়ে ভারসাম্য আনবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে প্রযুক্তি যত সহজ হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা ততটাই বাড়ছে। নিয়োগকর্তারা এখন চান একজন কর্মী যেন এআই ব্যবহার করে কয়েক গুণ বেশি কাজ করেন। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতের কর্মীরা এখন এআইয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে কর্মীরা অন্য সহকর্মীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দিয়েছেন। এটি শুনতে ইতিবাচক মনে হলেও আসলে এতে এককভাবে কাজের চাপ বহু গুণ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই কেবল একটি যন্ত্রমাত্র। এটি কাজের পরিমাণ কমাবে কি না, তা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের নীতি এবং কাজের সংস্কৃতির ওপর। প্রযুক্তি যখন কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়, তখন মানুষ অনেক সময় নিজের অজান্তেই বিশ্রামের কথা ভুলে যায়।

এআই কেবল একটি যন্ত্রমাত্র। এটি কাজের পরিমাণ কমাবে কি না, তা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের নীতি এবং কাজের সংস্কৃতিতে। প্রযুক্তি যখন কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়, তখন মানুষ অনেক সময় নিজের অজান্তেই বিশ্রামের কথা ভুলে যায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা—

বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং এবং আইটি খাতের জন্য এই গবেষণার ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। আমাদের দেশের হাজার হাজার তরুণ এখন বিশ্ববাজারের জন্য কাজ করছেন। বিদেশের ক্লায়েন্টরা এখন আগের চেয়ে অনেক কম সময়ে কাজ পেতে চান। এআই আসার পর তাদের চাহিদাও বেড়ে গেছে। আমাদের দেশের কর্মীরাও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে দিন–রাত পরিশ্রম করছেন। এতে আয়ের পরিমাণ বাড়লেও দীর্ঘ মেয়াদে তা শরীর ও মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইন্টারনেটের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। প্রযুক্তির এই জোয়ারে আমাদের টিকে থাকতে হবে ঠিকই, কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, এআই যেন আমাদের চালকের আসনে না বসে পড়ে।

ভবিষ্যৎ কোন দিকে

গবেষণার তথ্য বলছে, প্রযুক্তির উৎকর্ষই শেষ কথা নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকেই কেড়ে নেয়, তবে সেই অগ্রগতির সুফল প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন নীতিমালা তৈরি করতে হবে, যাতে এআই ব্যবহারের ফলে কর্মীরা শোষিত না হন। কর্মীরা যেন নির্দিষ্ট সময় পর কাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে পারেন, সেই নিশ্চয়তা থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, এআই আপনার কাজ সহজ করার জন্য এসেছে, আপনার জীবনকে আরও জটিল করে তোলার জন্য নয়। শেষ পর্যন্ত এআইয়ের ক্ষমতা কতটুকু হবে, তা মানুষের হাতেই থাকা উচিত, যাতে আমরা কাজ এবং জীবন—দুটোকেই সুন্দরভাবে সামলাতে পারি। তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে