সোহাগ বিশ্বাস
সোহাগ বিশ্বাস

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা: সোহাগ বিশ্বাসদের জীবনের হিসাব মিলছে না

কবি হেলাল হাফিজ বলেছিলেন, ‘মিছিলের সব হাত পা কণ্ঠ এক নয়।’ বিক্ষোভ কিংবা বিদ্রোহের ভিড় থেকে মাঝেমধ্যে এমন কিছু স্বরের সৃষ্টি হয়, যা প্রচলিত স্লোগানের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের প্রতিবাদে ১১ জানুয়ারি মিরপুরের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সামনে যখন বিক্ষোভ চলছিল, তখন সেই ভিড়ের এক কোণে দাঁড়িয়ে শান্ত স্বরে কথা বলছিলেন সোহাগ বিশ্বাস। কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করা এই তরুণের দুচোখে ছিল গভীর অনিশ্চয়তা। সোহাগ বলছিলেন, ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েছি, অথচ আজ নিজের জীবনের হিসাবই মেলাতে পারছি না। সোহাগ বিশ্বাসদের জীবনের হিসাব আজ আর মিলছে না।’

সোহাগের কথায় উঠে এল এক মেধাবী তরুণের দীর্ঘশ্বাসের গল্প। তিনি বলছিলেন, ‘ইচ্ছা করলেই এত দিনে কোনো প্রাইভেট কোম্পানিতে একটা চাকরি জোগাড় করতে পারতাম। কিন্তু আমি তা করিনি। আমি একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পড়াশোনা করেছি। দেশের জন্য আমার কিছু কর্তব্য আছে, দেশের মানুষের প্রতি একটা দায় আছে। তাই বেতন কম জেনেও দেড় বছর ধরে নিজেকে তিল তিল করে প্রস্তুত করেছি প্রাথমিকে শিক্ষক হওয়ার জন্য। ভেবেছিলাম, দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার দায়িত্ব নেব। কিন্তু নিয়োগ পরীক্ষায় যে হারে ডিজিটাল নকল হয়েছে, তাতে স্বপ্ন আজ ফিকে হয়ে আসছে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে ডিভাইসের মাধ্যমে প্রশ্ন বাইরে চলে যাচ্ছে—রাষ্ট্রীয় আয়োজনে এমন অনাচার বছরের পর বছর চলছে, কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই।’

১০ লাখের বেশি আবেদনকারী পরীক্ষা দিচ্ছে, অথচ কোনো বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক নেতা কিংবা বড় কোনো বুদ্ধিজীবীকে দেখলাম না রাষ্ট্রকে সচেতন করার জন্য পরীক্ষার পূর্বে কোনো ধরনের সতর্কবার্তা, বক্তব্য কিংবা বিবৃতি দিতে।
সোহাগ বিশ্বাস, চাকরীপ্রার্থী
বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন শত শত চাকরিপ্রার্থী। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মিরপুর, ঢাকা, ১১ জানুয়ারি ২০২৬

সোহাগের আলাপচারিতায় সমাজের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিশেষজ্ঞদের প্রতি তীক্ষ্ণ শ্লেষ ফুটে ওঠে। তিনি বলছিলেন, ‘১০ লাখের বেশি আবেদনকারী পরীক্ষা দিচ্ছে, অথচ কোনো বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক নেতা কিংবা বড় কোনো বুদ্ধিজীবীকে দেখলাম না রাষ্ট্রকে সচেতন করার জন্য পরীক্ষার পূর্বে কোনো ধরনের সতর্কবার্তা, বক্তব্য কিংবা বিবৃতি দিতে। ডিজিটাল মাধ্যমে যখন জালিয়াতির শত শত চিত্র ভাইরাল হলো, কানের ভেতর থেকে ইয়ারফোন বের করার ভিডিও সবাই দেখল, তখনো তাঁরা রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ। আমাদের বিশেষজ্ঞরা সভা-সমাবেশ আর সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে বড় বড় নীতিবাক্য ছাড়েন, কিন্তু দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এই চরম সংকটে তাঁদের কোনো ভূমিকা নেই। তাঁরা সমস্যার গোড়ায় হাত দিতে ভয় পান। একটি দেশের প্রাথমিক শিক্ষার বনিয়াদ যদি এভাবে দুর্নীতির ওপর দাঁড়ায়, তবে সেই জাতি কোনো দিনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। এই নিয়োগ পরীক্ষা যদি বাতিল না হয়, তবে যাঁরা অনৈতিক উপায়ে সফল হবেন, তাঁরাই শিক্ষক হবেন। রাষ্ট্র কি তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে একজন অনৈতিক মানুষকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে? সেই শিক্ষক কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কোন নৈতিকতার শিক্ষায় আলোকিত করবেন? আমাদের দেশে যে সৎ ও দক্ষ মানুষের আকাল, তার কারণ এই শিক্ষা খাতের পচন।’

সোহাগ বিশ্বাস

সোহাগ বিশ্বাসের বাড়ি মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায়। বাবা একজন প্রান্তিক কৃষক। সোহাগের বড় দুই ভাইও হিসাববিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আজ বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতা করছেন। সোহাগের বাবা সব সময় বলতেন, ‘তুমি জ্ঞানের আলো পেয়েছ, তাই তোমার সামাজিক ধর্ম হচ্ছে সেই আলো সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া।’ বড় দুই ভাই বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ করলেও সোহাগ আজ মাঝপথে থমকে দাঁড়িয়েছেন। রাষ্ট্রের এই প্রশাসনিক ব্যর্থতা সোহাগকে দারুণভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। তিনি বলছিলেন, ‘আমি মাগুরার ছেলে, পড়েছি কুষ্টিয়ায়। ছাত্রজীবনে যখনই মন খারাপ হতো, লালন একাডেমিতে চলে যেতাম। বাউলদের গান আর তত্ত্বকথার মাঝে জীবনের মানে খুঁজতাম। অথচ আজ এই আধুনিক যুগেও মানুষ লালনকে নিয়ে অরুচিকর মন্তব্য করে। আমার মনে হয়, লালনকে বুঝতে যে স্তরের জ্ঞানের প্রয়োজন, আমাদের সমাজ সেই স্তরে এখনো পৌঁছাতে পারেনি। তাই তাকে গালি দিয়ে আমরা আনন্দ পাই। আমাদের জ্ঞানের দৈন্যই লালনকে বুঝতে বাধা দেয়।’ তাঁর মতে, ‘আমাদের সমাজ লালনকে বুঝতে ব্যর্থ বলেই তাঁকে গালি দিয়ে আনন্দ পায়। ঠিক একইভাবে, রাষ্ট্র মেধাবীদের মর্ম বুঝতে পারছে না বলেই নিয়োগ পরীক্ষায় ডিজিটাল জালিয়াতির মতো মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে।’

১০ লাখ পরিবারের স্বপ্ন জড়ানো এই নিয়োগ পরীক্ষা ছিল এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষার সমপরিমাণ পরীক্ষার্থীর এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সরকারের নজরদারির ঘাটতি সোহাগের মতো মেধাবীদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে। প্রতিটি কেন্দ্রের চারপাশে ১৪৪ ধারা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে আইনের কোনো প্রয়োগ ছিল না বলেই প্রার্থীরা অভিযোগ করছেন। সোহাগ বিশ্বাস হতাশ নন, কিন্তু দারুণভাবে লজ্জিত এই ব্যবস্থার ওপর। তিনি বলছিলেন, ‘আমি এই দেশকে ভালোবাসি, এই মাটি-প্রকৃতি ছেড়ে কোথাও যেতে পারব না। কিন্তু এই অনৈতিক ব্যবস্থার কাছে হার মানাও সম্ভব নয়। লড়াইটা জারি রাখতে চাই।’

সোহাগ বিশ্বাসের জীবনের হিসাব আজ হয়তো মিলছে না, কিন্তু ১০ লাখ পরিবারের এই দীর্ঘশ্বাস যদি রাষ্ট্রকে সজাগ করতে না পারে, তবে আগামীর বাংলাদেশ এক বিশাল নৈতিক সংকটের মুখে পড়বে—সেটাই আজ বড় শঙ্কা।