একটা সম্পর্ক থেকে বের হয়ে বিরতি নিয়ে সেরে উঠে তারপর হুট করেই আপনার মনের ভেতর আবার প্রজাপতির ওড়াউড়ি! মনে হলো, এই মানুষটা যেন ঠিক আপনার সেই স্বপ্নের মানুষ। অবশেষে আপনি তাঁর দেখা পেলেন। কিন্তু ছয় মাস গড়াতে না গড়াতেই দেখা গেল, ‘যেই লাউ সেই কদু।’ নতুন প্রেমিক বা প্রেমিকা আদতে রেডফ্ল্যাগওয়ালা আপনার সেই ‘এক্স’; কেবল নাম–চেহারা ভিন্ন। প্রশ্ন হলো, কেন আপনি বারবার ভুল মানুষের দুষ্টচক্রে আটকা পড়েন?
গ্রাউন্ডহগিং একধরনের রোমান্টিক ‘টাইম লুপ’ বা প্যাটার্ন, যেখানে কেউ বারবার একই ধরনের ভুল মানুষকে ডেট করে। যদিও প্রতিবার মনে হয় ‘এবারের ব্যাপারটাই আলাদা’, ‘এবার অন্য রকম হবে’, ‘অবশেষে জীবনে সঠিক মানুষের দেখা পেলাম’—এই ভাবনা ভেবে আপনি যখন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন, এর কিছুদিন পরই বাস্তবতার সঙ্গে আপনার চোখাচোখি হওয়া শুরু হয়।
অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত ফল একই রকম হয়। মানে এবারও যথারীতি ভুল মানুষ! একেই বলে গ্রাউন্ডহগিং।
১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া জনপ্রিয় মার্কিন, কমেডি, ফ্যান্টাসি, রোমান্টিক সিনেমা ‘গ্রাউন্ডহগ ডে’। এই সিনেমা থেকেই এর নামকরণ। সিনেমার মুখ্য চরিত্র একজন আবহাওয়া প্রতিবেদক প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে একই রকম দিন পার করেন। তাঁর কাছে প্রতিটি দিনের অভিজ্ঞতা একই রকম, যত দিন না তিনি নিজের আচরণ ও মানসিকতায় পরিবর্তন আনেন।
গবেষণা জানাচ্ছে, মানুষের মস্তিষ্ক সাধারণত পরিচিত বা কমফোর্ট জোন পছন্দ করে। এমনকি যদি সেটা সম্পর্কের জন্য অস্বাস্থ্যকর বা অসন্তুষ্টিজনক হয়, তবুও।
ঠিক এ কারণেই টক্সিক সম্পর্ক থেকেও বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কেননা সেটির সঙ্গে তিনি তত দিনে পরিচিত হয়ে পড়েছেন। সেই সম্পর্ক একধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়।
আমাদের সাবকনশাস প্যাটার্ন, বিশেষ করে শৈশবের অভিজ্ঞতা বা সম্পর্কের ধরন আমাদের একই ধরনের মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে। তাই নতুন নাম ও চেহারা বা পরিস্থিতি নতুন হলেও, সম্পর্কের ভিত্তি বা আচরণগত বৈশিষ্ট্য একই থাকে।
আগের সম্পর্কে যোগাযোগ বা আচরণ যেমন ছিল, নতুন সম্পর্কেও ঠিক তেমনটাই হয়। শুরুতে ‘এই সম্পর্কটা আলাদা’—এমন আত্মবিশ্বাস থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা দুর্বল হতে থাকে। একসময় ভেঙে যায়।
এ ধরনের সম্পর্ক যদি টিকে থাকে, তাহলে তা নিতান্তই বিশেষ কোনো সুবিধাজনিত কারণে। লোকে কী বলবে, পারিবারিক বা সামাজিক চাপ, নতুন পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলানোর ভয় বা কমফোর্টের কারণে অথবা স্রেফ ‘টিকিয়ে রাখতে হবে, তাই টিকিয়ে রাখা’।
এ ধরনের সম্পর্ক আপনার ব্যক্তিগত উন্নয়ন, মানসিক বৃদ্ধির জন্য বাধা। সম্পর্কগুলোয় নতুন অভিজ্ঞতা, মানসিক নিরাপত্তা বা আসল সংযোগ তৈরি হয় না। ফলে সম্পর্কে থেকেও আপনি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
এ ধরনের সম্পর্ক আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের বারোটা বাজানোর জন্য যথেষ্ট। সম্পর্কে থেকে আপনি মানসিক শান্তির কথা ভুলে যেতে বাধ্য।
নিজের সম্পর্কের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করতে হবে। কেন একই ধরনের ব্যক্তিই আপনাকে আকর্ষণ করে? কোন বৈশিষ্ট্যগুলো বারবার আসছে?
‘রোমান্টিক টাইপ’, ‘সুন্দরী/সুন্দর’ বা ‘লম্বা’ অথবা ‘ধনী’ সঙ্গী চাই—এমন চাহিদা ভুলে সঙ্গী বাছাইয়ে ব্যক্তির মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দিন।
নিজের আবেগ, সংযম ও সীমায় ভারসাম্য রাখুন। যেকোনো সম্পর্কে সুস্থতার চর্চা আর মানসিক স্থিতি খুঁজুন।
একটা বিচ্ছেদ একা সামলে উঠুন। প্রয়োজনে পরিবার, বন্ধু বা পেশাদারের সাহায্য নিন। বিচ্ছেদ সামলানোর জন্য বা সেই ভঙ্গুর সময়ে মানসিক সমর্থন ও সহানুভূতির জন্য সম্পর্কে জড়াবেন না।
জোর করে বা বাইরের কোনো কিছু দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সম্পর্কে জড়াবেন না। সম্পর্কটি স্বাভাবিকভাবে এগোতে দিন।
সূত্র: মিডিয়াম