বাড়িতে অনেকেই সঙ্গীর সঙ্গে মেজাজ দেখান
বাড়িতে অনেকেই সঙ্গীর সঙ্গে মেজাজ দেখান

বাড়ির বাইরে অমায়িক, কিন্তু বাড়িতে মেজাজ?

বাড়ির বাইরে যেকোনো জায়গায় তাঁকে অমায়িক, ভদ্র একজন ব্যক্তি বলে মনে হয়। অথচ বাড়িতে তাঁর আচরণ দেখলে হয়তো চমকে উঠবেন অনেকেই। বাড়িতে তাঁর মেজাজ থাকে চরমে। আপনজনদের সঙ্গে করেন দুর্ব্যবহার। এই ‘তিনি’টা হতে পারেন আপনি কিংবা আপনার চেনা কেউ। কেন এমন হয়? এ ব্যাপারের কি কোনো সমাধান আছে? এ বিষয়ে শিশু-কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক ও যুক্তরাজ্যের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ফেলো ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষের সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন রাফিয়া আলম

যেসব কারণ থাকতে পারে

কোনো একটা নির্দিষ্ট কারণে যে একজন ব্যক্তি বাড়িতে আর বাইরে দুই রকম আচরণ করেন, তা নয়। বরং এর পেছনে থাকতে পারে একাধিক বিষয়।

বাড়িকে আমরা নিরাপদ আশ্রয় মনে করি। বাড়ির বাইরে কে কী ভাবল, তা নিয়ে একটা ভয় থাকে। তাই নিজের খারাপ আচরণ লুকিয়ে রাখার একটা তাগিদ থাকে সেখানে।

আপনজনদের প্রতি আমাদের আস্থা থাকে সর্বোচ্চ। অনেকে ধরেই নেন, ‘আমাকে তো ওরা বুঝবে।’ বাড়ির বাইরে নিজের ‘ক্লিন ইমেজ’ ধরে রাখার চেষ্টায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁরা। কিন্তু বাড়িতে সেই তাড়না না থাকায় আবেগের ‘বিস্ফোরণ’ ঘটিয়ে ফেলেন অনেকে।

বাড়ির বাইরে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপে নিজের অনুভূতি প্রকাশে বাধা পেলে সেই ‘ঝাল মেটানো’র জন্যও বাড়ির সদস্যদের বেছে নেন অনেকে

যেকোনোভাবে নিজের আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশের জন্য আপনজনদের ‘টেকেন ফর গ্র্যান্টেড’ ধরে নেন কেউ কেউ। সারা দিনের সব আবেগ তাই তাঁদের ওপর ‘উগড়ে’ দেন তাঁরা। নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণের অক্ষমতারও দায় আছে এর পেছনে।

বাড়ির বাইরে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপে নিজের অনুভূতি প্রকাশে বাধা পেলে সেই ‘ঝাল মেটানো’র জন্যও বাড়ির সদস্যদের বেছে নেন অনেকে। অফিসের বসকে মুখের ওপর দুটো কথা শুনিয়ে দিলে হয়তো চাকরিটা চলে যাবে। বাড়িতে তো সেই ভয় নেই!

আবার অনেকেই শৈশব থেকে পারিবারিক পরিবেশে একধরনের বৈষম্য দেখে বড় হন। সেখানে থাকে নিয়ন্ত্রণের চর্চা। বড় হওয়ার পর সেই ধারা বজায় রেখেই বাড়িতে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য চড়া মেজাজ দেখান কেউ কেউ। এমনকি মেজাজ খারাপের তেমন কোনো কারণ না থাকলেও।

প্রভাব পড়ে সম্পর্ক ও স্বাস্থ্যে

আপনজনের সঙ্গে নিশ্চয়ই সব আবেগ, সব অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া যায়। কিন্তু একজন ব্যক্তি নিজের অনুভূতি কীভাবে প্রকাশ করছেন, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। খারাপ অনুভূতির কথাও মার্জিতভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে। নইলে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে সম্পর্কে।

বাইরে যত মানসিক চাপই সামলাতে হোক না কেন, তার নেতিবাচক প্রভাব ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর পড়তে দেওয়া উচিত নয়। নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণও সম্পর্কের জন্য খারাপ। কারও দুর্ব্যবহারের প্রভাব পড়তে পারে পরিবারের যেকোনো সদস্যের ওপর।

জীবন থেকে হারিয়ে যেতে পারে সুখ। জীবনসঙ্গী মনে আঘাত পেতে পারেন। তিনি ভুগতে পারেন মানসিক চাপে। উঠতি বয়সী সন্তানের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

সমাধান যেভাবে

যিনি এমন আচরণ করেন, তাঁর নিজের দিক থেকে বিষয়টা সমাধানের চেষ্টা থাকা জরুরি। মানসিক চাপে থাকলে বাড়িতে ফিরে মেজাজ না দেখিয়ে বলুন, ‘আমি খুব চাপে আছি। নিজেকে সামলাতে আমার একটু সময় প্রয়োজন।’

২০-৩০ মিনিট বা সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার মধ্যে আপনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
খারাপ লাগার মুহূর্তে নিজের মনকে অন্যদিকে সরিয়ে নিতে চেষ্টা করুন। লম্বা করে শ্বাস নিন, নিশ্বাস ছাড়ুন। বইয়ের পাতা ওলটান, কিংবা শরীরচর্চা করুন।

কোনো একটা জিনিসের দিকে তাকিয়ে সেটিকে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করারও চেষ্টা করতে পারেন। নিজেকে সামলানোর এমন নানা পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায়।

খারাপ ব্যবহারের কারণে সম্পর্কে মান–অভিমান চলে আসে

‘তোমাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ পর কথা বলছি।’—এমন একটা বাক্যেই আপনার কাছের মানুষেরাও বুঝতে পারবেন, আপনি কোনো সমস্যায় আছেন।

মনে রাখবেন, আপনজনদের কাছেই আমাদের সবচেয়ে মায়াময় রূপ উন্মোচিত হওয়ার কথা। জীবনসঙ্গী, সন্তান, মা, বাবা, ভাই, বোন—এই আপনজনদেরই আপনার প্রতি সর্বোচ্চ দাবি। এমনকি ঘরের সহায়তাকর্মীর সঙ্গেও মেজাজ দেখানো অনুচিত।

যে কারও সঙ্গে কথা বলার সময় কণ্ঠ সংযত রাখুন। ঘরে-বাইরে যে কারও সঙ্গে মেলামেশার ক্ষেত্রে কিছু স্বাস্থ্যকর সীমানা রাখুন। সব বিষয়কে আবেগীয়ভাবে গ্রহণ করবেন না।

এমন সমস্যার সমাধানে আপনজনদের সমর্থনও অবশ্যই প্রয়োজন। দুর্ব্যবহারের জন্য কটূক্তি না করে ওই মানুষটিকে সময় দিন। পরে ঠান্ডা মাথায় বুঝিয়ে বলুন, তাঁর আচরণে আপনি আহত হচ্ছেন।

তাঁকে দোষারোপ না করে তাঁর প্রতি মমতা নিয়েই আলোচনা করুন তাঁর আচরণগত সমস্যাটি নিয়ে। কিছু সময়ের খারাপ আচরণের জন্য সারা জীবনের মায়ার কথা ভুলে যাবেন না। প্রয়োজনে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে পেশাদার ব্যক্তির সহায়তা নিন।