পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য আছে এই ভাসমান হোটেল
পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য আছে এই ভাসমান হোটেল

ঢাকার যেখানে ৫০ টাকায় নদীতে রাত্রিবাস করা যায়

বর্তমান বিশ্বে, বিশেষত উন্নয়নশীল দেশে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্থায়ী আবাসনের অভাব একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকার মতো মেগা সিটিতে এ সমস্যা আরও প্রকট। এ ক্ষেত্রে ভাসমান হোটেল বা বোর্ডিং একটি অস্থায়ী সমাধান হতে পারে। বুড়িগঙ্গা নদীতে এ ব্যবস্থা দীর্ঘকাল ধরে চালুও রয়েছে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন স্থাপত্য ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইনের সহযোগী অধ্যাপক স্থপতি ড. সাজিদ বিন দোজা

গুগলে সার্চ করে পৃথিবীর আর কোথাও ভাসমান নৌকার ওপর এমন সস্তা বোর্ডিং হোটেল আছে কি না, বোঝার চেষ্টা করলাম। পেলাম না। বদলে বিলাসবহুল সব ভাসমান রেস্তোরাঁ ও রিসোর্টের তথ্য আসা শুরু করল। গুগল পাতার এককোণে দেখতে পেলাম বিভিন্ন পত্রিকার নিউজ ফিড ও ফিচারে বুড়িগঙ্গা নদীর বুকে ভাসমান হোটেলের তথ্য। অনেক ইউটিউবারও কভার করেছেন বিভিন্ন সময়—সস্তায় বোর্ডিং, রাত কাটানোর আশ্রয় ও নিম্ন অ্যায়ের মানুষের বিশ্রামের ঠিকানা হিসেবে।

পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য সদা নিবেদিত এই আশ্রয়ণ কারবার। দিনমজুর, হকার, পান-সিগারেট বিক্রেতা, ফল ব্যবসায়ী ও অন্য শহর থেকে আসা ঠিকানাহীনদের অস্থায়ী আবাস এই ভাসমান বোর্ডিং। ঢাকা শহরের আবাসনসংকটে কি কোনো ভূমিকা রাখছে ভাসমান হোটেল? তৃণমূল ও নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য কতখানি সংবেদনশীল, কারিগরি দিক থেকেই–বা কতখানি টেকসই? এসব প্রশ্ন মাথায় রেখেই বিষয়টি নিয়ে একটা গবেষণা দাঁড় করাই। আর এ কাজে অনেকবার সরেজমিনে সেসব জায়গা পর্যবেক্ষণ করে বিস্তারিত বুঝতে চেষ্টা করেছি।

১৯৬০-৭০–এর দশক থেকে শুরু হওয়া এই হোটেলগুলো নদীর পাড়ে স্থায়ীভাবে ভাসমান অবস্থায় আছে। সাধারণত একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে। বুড়িগঙ্গার বাবুবাজার ব্রিজের নিচে একসময় ১০-১১টি বোট ছিল, মুক্তিযুদ্ধের পর সংখ্যা কমতে থাকে, বর্তমানে মাত্র ৫টি বোট আছে—‘বুড়িগঙ্গা’, ‘উমা-উজালা’, ‘ফরিদপুর মুসলিম হোটেল বোর্ডিং’, ‘শরীয়তপুর’। বেশির ভাগই অত্যন্ত পুরোনো। ব্যবহারের উপযোগী রাখতে নিয়মিত মেরামতের কাজ চলতে থাকে।

 লঞ্চ থেকে বোর্ডিং

লঞ্চের ভেতরে এভাবে সংস্কার করে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে

বুড়িগঙ্গার তীরে বাঁধা ভাসমান হোটেলগুলো মূলত পুরোনো লঞ্চ। একসময় এগুলো বিভিন্ন নৌরুটে চলাচল করত। যাত্রীর চাপ আর কর্মীদের হাঁকডাকে মুখর থাকত সারা দিন। বছরের পর বছর ধরে চলতে চলতে একসময় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। যাত্রী বহনে আনফিট হওয়ার পরই লঞ্চগুলোর নতুন পরিচয় হয় ‘অস্থায়ী আবাসিক হোটেল’।

হোটেলগুলোর অবস্থানও বেশ সুবিধাজনক। শ্রমজীবী বা নিম্ন আয়ের মানুষদের কাজের জায়গার কাছাকাছি। পাড় থেকে ওঠার জন্য সাধারণত কাঠের সিঁড়ি। বসবাসের জন্য মোটামুটি সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।

শীতের সময় লেপ, কম্বল, তোশক, বালিশ ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও করা হয়। মিটফোর্ড হাসপাতালের বিপরীতে এমনই একটি ভাসমান হোটেলের একজন ম্যানেজার জানান, সিঙ্গেল সিটের ভাড়া ৫০ টাকা এবং কেবিনের ভাড়া ১৫০ টাকা। দেশের অন্যান্য আবাসিক হোটেলের তুলনায় যা অত্যন্ত সস্তা।

ভাসমান হোটেলের রাতে থাকা এক রিকশাচালক বলেন, ‘বাসাবাড়ি বা হোটেলে থাকার সামর্থ্য আমাদের নেই, আগে রিকশার সিটে রাত কাটাতাম, কিন্তু ভাসমান হোটেলটির সন্ধান পাওয়ার পর থেকে এখানে থাকি।’

 অতিথিরা যেন একটি পরিবার

ভাসমান এই হোটেলগুলোর বাসিন্দাদের কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে আছেন

প্রতিটি লঞ্চে ৫০ জন লোক থাকার ব্যবস্থা আছে। পাঁচটি বোটে প্রায় ২০০ মানুষ ছোটখাটো একটি মহল্লা তৈরি করে নিয়েছেন। একে অপরকে সাহায্য-সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে তাঁরা এখানে জীবন যাপন করছেন। এই ভাসমান হোটেলগুলো দীর্ঘকাল ধরে ঢাকা শহরের অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রার একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভাসমান এই হোটেলগুলোর বাসিন্দাদের কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে আছেন। এ কারণে বাসিন্দা-বাসিন্দা, কর্মী-বাসিন্দার মধ্যে একধরনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। কথা বলে জানা গেল, এখানকার কর্মীরা প্রয়োজনে অতিথিদের টাকা ধার দেন, অভাবের সময় বিনা ভাড়ায় থাকার সুযোগও করে দেন।

রাসেল নামের একজন অতিথি বলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরেই এখানে আছি। ঢেউয়ের ওপর নৌকার দুলুনি আমি খুবই উপভোগ করি। টার্মিনাল থেকে যথেষ্ট দূরে হওয়ায় এখানে বেশি শব্দ নেই। বর্ষাকালে সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায়, টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার শব্দ শুনতে পাই।’

এই ভাসমান হোটেলগুলোতে খাবারের ব্যবস্থা থাকে না। অতিথিরা বাইরে থেকে খাবার আনতে পারেন।

কারিগরি রেজিলিয়েন্স

নদীতে দীর্ঘকাল ভাসমান অবস্থায় থাকে বলে এ ধরনের হোটেলগুলোর নির্মাণসামগ্রী হওয়া উচিত যথাযথ মানসম্পন্ন, রক্ষণাবেক্ষণও জরুরি। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় হোটেলগুলোর রেজিলিয়েন্স নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে এ ধরনের আবাসনব্যবস্থা কতটুকু নিরাপদ, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

 স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত প্রভাব

এ ধরনের আবাসনব্যবস্থায় বেশ কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যাও আছে

ভাসমান হোটেলগুলো পরিবেশের জন্য কতটুকু উপকারী বা ক্ষতিকর, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এসব হোটেল যেহেতু নদী বা জলাশয়ের ওপর ভাসমান থাকে, তাই এটি স্থানীয় জলব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। মলত্যাগ, প্লাস্টিকের বর্জ্য ও আবর্জনা ফেলার কারণে পানিতে দূষণ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এ ধরনের আবাসনব্যবস্থায় বেশ কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যাও আছে। গাদাগাদি করে থাকা, নোংরা পরিবেশ ও যথাযথ শৌচাগার–সুবিধার অভাব এসব হোটেলে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তবে কিছু ভাসমান হোটেল আবার দেখলাম স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার চেষ্টা করছে। যেমন জলবাহী টয়লেট, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে তারা। সুতরাং এই হোটেলগুলোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে উৎসাহিত করা জরুরি।

নিম্ন আয়ের মানুষের অস্থায়ী আশ্রয় হিসেবে এই বোর্ডিং হোটেলগুলোকে আরও সফল করা সম্ভব। লঞ্চগুলোর ভেতরে সঠিকভাবে কক্ষবিন্যাস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা আরও উন্নত করা যেতে পারে। স্বাস্থ্যকর ও টেকসই আবাসনব্যবস্থা তৈরির জন্য বিশেষ ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া এসব হোটেলের স্থায়িত্ব ও রেজিলিয়েন্স বাড়াতে আরও বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি সমাধান প্রয়োজন।

(লেখাটি প্রথম আলোর বিশেষ ম্যাগাজিন বর্ণিল বসত ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত)