কৃ্ত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি প্রতীকী ছবি
কৃ্ত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি প্রতীকী ছবি

অভিমত–বিশ্লেষণ

পদ্মা ব্যারাজ কেন প্রয়োজন, মূল চ্যালেঞ্জ কোথায়

ছয় দশকের বেশি সময় ধরে সমীক্ষা ও পরিকল্পনার পর পদ্মা ব্যারাজ এখন বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসেছে। আগের সমীক্ষাগুলো এ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশল ভিত্তি তৈরি করেছে। এই ব্যারাজ কেন প্রয়োজন এবং এর মূল চ্যালেঞ্জ কোথায়, তা নিয়ে লিখেছেন মো. আতাউর রহমান।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনায় পদ্মা ব্যারাজ একটি বহুল আলোচিত ও দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত প্রকল্প। এর সম্ভাব্য সুফল অনেক—শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ, মৃতপ্রায় নদীর পুনরুজ্জীবন, সেচ সম্প্রসারণ, নাব্যতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধি, মৎস্য উৎপাদন ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদন।

তবে একটি বড় নদীর ওপর ব্যারাজ নির্মাণ কেবল একটি প্রকৌশলগত অবকাঠামো নির্মাণের বিষয় নয়। এর সাফল্য নির্ভর করবে ব্যারাজ নির্মাণের পর সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ বা প্রতিকূলতাগুলোকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে তার ওপর।

সাম্প্রতিককালে কিছু গবেষক পদ্মা ব্যারাজের চ্যালেঞ্জ, পলি ব্যবস্থাপনা ও নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা সমীক্ষা শেষে প্রস্তাবিত ব্যারাজের সুফল ও চ্যালেঞ্জসমূহ নিয়ে দেশি-বিদেশি ১৩টি কারিগরি প্রতিষ্ঠান প্রায় চার বছর মেয়াদি জরিপ, গাণিতিক মডেল স্টাডি, ভৌত মডেল স্টাডি, পরিবেশগত প্রভাব, সামাজিক প্রভাব ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে যে ফিজিবিলিটি স্টাডি রিপোর্ট প্রস্তুত করেছে, উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর অনেকগুলোর উত্তর সেখানে রয়েছে।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের রূপরেখা

বর্তমান পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প দীর্ঘদিন ‘গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প’ নামে পরিচিত ছিল। এর মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশে প্রবেশ করা গঙ্গার পানি নদীর মধ্যেই নিয়ন্ত্রিতভাবে সংরক্ষণ করে বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে প্রয়োজনীয় মিঠাপানি সরবরাহ করা। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজবাড়ীর পাংশায়, গঙ্গা-যমুনার মিলনস্থল গোয়ালন্দ থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার উজানে, গঙ্গার ওপর প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি প্রধান পানি নির্গমন পথ, ১৮টি তলদেশীয় পানি নির্গমন পথ, দুটি মাছ চলাচল পথ, একটি নৌ-লক, চার লেনের রাস্তা এবং প্রয়োজনীয় নদীশাসন অবকাঠামো।

২০২৬ সালের ১৩ মে একনেকে অনুমোদিত প্রথম পর্যায়ের ব্যয় প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা এবং বাস্তবায়নকাল জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩। প্রকল্পে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ এবং পদ্মা ব্যারাজ ও গড়াইয়ের উৎসমুখে মোট ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

গঙ্গা নদী

গঙ্গা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ আন্তসীমান্ত নদী। এর প্রধান উৎসধারা ভারতের উত্তরাখন্ডের হিমালয়ে গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমুখ থেকে উৎপন্ন হয়ে উত্তর প্রদেশ, বিহার, ঝাড়খন্ড ও পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে গঙ্গা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে প্রবেশের পর গঙ্গা চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, পাবনা ও রাজবাড়ী অঞ্চলের পাশ দিয়ে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে গোয়ালন্দের কাছে যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

এই মিলিত প্রবাহ পরবর্তী অংশে পদ্মা নামে প্রবাহিত হয়ে চাঁদপুরের কাছে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। বাংলাদেশে প্রচলিতভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত নদীটিকেও পদ্মা বলা হলেও নদীবৈজ্ঞানিক বিবেচনায় এটি গঙ্গার নিম্নাংশ, অর্থাৎ নদীটির নাম গঙ্গা নদী। ভারত এই নদীর উজানে মূল গঙ্গায় ফারাক্কাসহ ছয়টি ব্যারাজ নির্মাণ করেছে। এ ছাড়া গঙ্গার উপনদীগুলোতে অসংখ্য ড্যাম, ব্যারাজ ও পানি প্রত্যাহার কাঠামো নির্মাণ করেছে ভারত। তবে ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির প্রাপ্যতা ও বণ্টন বাংলাদেশ-ভারত পানি সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের রূপরেখা

বর্তমান পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প দীর্ঘদিন ‘গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প’ নামে পরিচিত ছিল। এর মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশে প্রবেশ করা গঙ্গার পানি নদীর মধ্যেই নিয়ন্ত্রিতভাবে সংরক্ষণ করে বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে প্রয়োজনীয় মিঠাপানি সরবরাহ করা। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজবাড়ীর পাংশায় গঙ্গা নদীর ওপর প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এ স্থানটি গঙ্গা-যমুনার মিলন স্থান গোয়ালন্দ থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার উজানে।

প্রস্তাবিত ব্যারাজে থাকবে ৭৮টি প্রধান পানি নির্গমন পথ, ১৮টি তলদেশীয় পানি নির্গমন পথ, দুটি মাছ চলাচল পথ, একটি নৌ-লক, চার লেনের রাস্তা এবং প্রয়োজনীয় নদীশাসন অবকাঠামো। ২০২৬ সালের ১৩ মে একনেকে অনুমোদিত প্রথম পর্যায়ের ব্যয় প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা এবং বাস্তবায়নকাল জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ পর্যন্ত। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।

পাশাপাশি হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী—গঙ্গানির্ভর এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নদীব্যবস্থা পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্য রয়েছে। পদ্মা ব্যারাজ এবং গড়াইয়ের উৎসমুখে দুটি পৃথক জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে মোট ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

সমীক্ষা ও পরিকল্পনা: ছয় দশকেরও বেশি সময়ের ইতিহাস

পদ্মা ব্যারাজ কোনো সাম্প্রতিক ধারণা নয়; এর পেছনে রয়েছে ছয় দশকেরও বেশি সময়ের সমীক্ষা ও পরিকল্পনা। ১৯৬৩ সালে মার্কিন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ট্যামস গঙ্গার পানির স্তর বাড়িয়ে গড়াইসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শাখানদীগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যারাজ নির্মাণের সম্ভাবনা পরীক্ষা করে। পরে ১৯৬৪ সালে আইইসিও এবং ১৯৬৯ সালে এসিই পাকিস্তান এ বিষয়ে সমীক্ষা চালায়। এসব সমীক্ষা ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর আগেই হয়েছিল; অর্থাৎ গঙ্গা ব্যারাজের ধারণা শুধু ফারাক্কার প্রতিক্রিয়া হিসেবে সৃষ্টি হয়নি।

১৯৭৫ সালে ফারাক্কা চালুর পর শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ, মিঠাপানি সরবরাহ ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৪ সালের বিশেষজ্ঞ সমীক্ষা এবং ১৯৮৯ সালের ফ্রেঞ্চ ইঞ্জিনিয়ারিং কনসোর্টিয়ামের সমীক্ষায় পাংশায় ব্যারাজ নির্মাণের প্রস্তাব সমর্থন করা হয়। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির পর বাংলাদেশের প্রাপ্য পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ২০০২ সালের প্রাক্‌-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০০৯ সালে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশল নকশা প্রণয়ন শুরু করে।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ডিডিসি, বিইটিএস, বিসিএল, এসিই বাংলাদেশ, পাকিস্তানের ডিভাইন এসিই, নেসপাক, আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএমইসি, আইডব্লিউএম, সিইজিআইএস, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, বুয়েট এবং ডাটাএক্সসহ ১৩টি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান তথ্য সংগ্রহ, গাণিতিক মডেলিং, নদীর ভৌত মডেল পরীক্ষা, পরিবেশগত মূল্যায়ন, সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং অন্যান্য কারিগরি সমীক্ষার মাধ্যমে রাজবাড়ীর পাংশায় প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের প্রস্তাব করে এবং ব্যারাজের বিস্তারিত প্রকৌশল নকশা প্রণয়ন করে। পরবর্তীতে কারিগরি পর্যালোচনার মাধ্যমে ২০১৬ সালের মধ্যে নকশা চূড়ান্ত করা হয়।

তিস্তা ব্যারাজ। লালমনিরহাট। ছবিটি সম্প্রতি তোলা

পদ্মা ব্যারাজ কেন প্রয়োজন?

পাঁচটি নদীব্যবস্থা পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা: শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার প্রবাহ কমে গেলে এর প্রভাব মূল নদীতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। শাখানদীগুলোর প্রবাহ কমে গেলে পলি জমে, নাব্যতা হ্রাস পায় এবং অনেক নদীর সঙ্গে মূল নদীর কার্যকর সংযোগ দুর্বল হয়ে যায়। বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে গড়াই, মাথাভাঙ্গা বা হিসনা নদী দিয়ে পর্যাপ্ত পানি প্রবাহিত হতে পারে না, যার ফলে এই অঞ্চলে সেচকাজ এবং সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

এই সমস্যা সমাধানে একটি প্রকৌশলগত উপায় হলো গঙ্গায় একটি পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো বা ব্যারাজ নির্মাণ করা, যা বছরের নয় মাসব্যাপী উজান থেকে আসা পানি জলাধারে সংরক্ষণ, শাখানদীগুলোতে ডাইভার্ট এবং কিছু পানি ভাটিতে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে পরিচালনা করা হবে। ব্যারাজ স্থাপনার মাধ্যমে গঙ্গা নদীর পানি সংরক্ষণ এবং পানির প্রবাহ পরিবর্তনের মাধ্যমে পাঁচটি নদী সিস্টেমকে যথা হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়াল পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে।

কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন: প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রাক্কলনে প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর নিট আবাদযোগ্য জমিতে সেচসুবিধা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। গঙ্গা-কপোতাক্ষ ও উত্তর রাজশাহীসহ ভূপৃষ্ঠের পানিনির্ভর সেচব্যবস্থায় পানির প্রাপ্যতা বাড়তে পারে। গঙ্গা নদী এবং এর অববাহিকা বাংলাদেশের মিঠাপানির মাছের অন্যতম প্রধান উৎস। ব্যারাজের উজানে সৃষ্ট জলাধার শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি মৎস্যসম্পদের জন্যও সহায়ক হতে পারে।

লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ ও সুন্দরবন: গড়াই-মধুমতীসহ সংশ্লিষ্ট নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত মিঠাপানি সরবরাহ করা গেলে তা খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও সুন্দরবনে সমুদ্রের লবণাক্ত পানির অগ্রগতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। এতে কৃষি, মৎস্য, খাবার পানির উৎস এবং সুন্দরবনের প্রতিবেশ উপকৃত হতে পারে। প্রয়োজনীয় পানিপ্রবাহ নির্ধারণে গাণিতিক মডেলের ফল ব্যারাজ পরিচালনায় ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

নাব্যতা বৃদ্ধি: গড়াই-মধুমতীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক নদীতে শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ অত্যন্ত কমে যায়। গড়াইয়ের ক্ষেত্রে অতীতে কোনো কোনো শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। ব্যারাজ থেকে পরিকল্পিতভাবে পানি সরবরাহ করা গেলে নদীর প্রবাহের বেগ ও পলি বহনক্ষমতা বাড়বে। এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় খনন ও উৎসমুখ ব্যবস্থাপনা যুক্ত হলে নাব্যতা পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

জলাবদ্ধতা হ্রাস: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা একটি জটিল নদী ও পলি ব্যবস্থাপনার সমস্যা। পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট নদীসমূহের নাব্যতা ও নিষ্কাশন ক্ষমতা বাড়লে জলাবদ্ধতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে স্থানীয় নিষ্কাশনব্যবস্থা, জোয়ারবাহিত পলি এবং পোল্ডার ও জলকপাট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এর সমন্বয় প্রয়োজন।

সহায়ক সুবিধা—জলবিদ্যুৎ: প্রকল্পে মোট ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে শুষ্ক মৌসুমে সীমিত পানির ক্ষেত্রে নদী ও পরিবেশ, কৃষি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানির চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাই জলবিদ্যুৎকে প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য নয়, বরং একটি সহায়ক সুবিধা হিসেবে দেখা যৌক্তিক।

সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জসমূহ

প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজের কার্যকারিতা ও সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞরা পলি ব্যবস্থাপনা, শুষ্ক মৌসুমে উজানের পানির প্রাপ্যতা, ভাটিতে প্রয়োজনীয় প্রবাহ, নদীভাঙন ও পরিবেশগত প্রভাবসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। গঙ্গার মতো বড় ও গতিশীল নদীতে ব্যারাজ নির্মাণে এসব চ্যালেঞ্জ থাকা স্বাভাবিক।

তবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় তথ্য সংগ্রহ, গাণিতিক ও ভৌত মডেল পরীক্ষা, পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নসহ বিভিন্ন কারিগরি বিশ্লেষণের মাধ্যমে এসব বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে। মূল প্রতিবেদনের ২০টি অধ্যায়ের মধ্যে পানি ও পলিপ্রবাহ, ব্যারাজ পরিচালনা, জলবিদ্যুৎ ও প্রকৌশল নকশার পাশাপাশি উজানে পানি সংরক্ষণ, শাখানদী ও সেচ প্রকল্পে পানি সরবরাহ, ভাটিতে প্রবাহ এবং ২১৭২ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য পলি সঞ্চয়ের বিশ্লেষণ রয়েছে।

পরিবেশগত মূল্যায়নে পলিপ্রবাহ, নদীভাঙন, বন্যা, কৃষি, মৎস্য, লবণাক্ততাসহ ২২টি বিষয়ে সম্ভাব্য প্রভাব ও প্রতিকার আলোচনা করা হয়েছে। তাই প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফল ও ঝুঁকি মূল্যায়নে মূল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং হালনাগাদ তথ্য যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করে সেখানে কোনো অসংগতি থাকলে তা তুলে ধরা যেতে পারে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এই রিপোর্টটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারে এবং রিপোর্টের বিষয়বস্তু সংবাদ সম্মেলন করে জাতির সামনে তুলে ধরতে পারে।

পলি ব্যবস্থাপনা: পদ্মা ব্যারাজের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারিগরি চ্যালেঞ্জ পলি ব্যবস্থাপনা। ব্যারাজের উজানে পানির স্তর বৃদ্ধি ও প্রবাহবেগ হ্রাস পেলে পলি জমে নদীতল উঁচু হওয়া, চর সৃষ্টি, মূল প্রবাহপথ স্থানান্তর এবং পানি ধারণক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে নকশায় ১৮টি তলদেশীয় পানি নির্গমন পথ বা আন্ডারস্লুইস রাখা হয়েছে, যার তলদেশ অন্যান্য গেটের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৫ মিটার নিচে। এর মাধ্যমে তলদেশের অধিক পলিঘন পানি ভাটিতে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে শুধু আন্ডারস্লুইস যথেষ্ট নয়; গেট পরিচালনা, পলিযুক্ত পানিনিষ্কাশন এবং প্রয়োজনীয় খনন সমন্বিত করে বিজ্ঞানভিত্তিক পলি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। পরিকল্পনা অনুযায়ী বছরের তিন মাস (১০ জুলাই থেকে ১০ অক্টোবর) ব্যারাজের সব গেট খোলা থাকবে। সে সময় বর্ষার প্রবল প্রবাহের সঙ্গে জমে থাকা পলির একটি অংশ ভাটিতে পরিবাহিত হতে পারে।

ভাটিতে কত পানি ছাড়া হবে: ব্যারাজে আসা সব পানি ধরে রেখে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পাঠানো সম্ভব বা পরিবেশগতভাবে কাম্য নয়। ভাটির প্রবাহ নদীর গভীরতা, পলি পরিবহন, মাছের আবাসস্থল, নৌচলাচল, তীরের স্থিতিশীলতা এবং নিম্ন পদ্মা-মেঘনায় মিঠাপানি ও পলি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী সবচেয়ে সংকটপূর্ণ মার্চ ও এপ্রিলেও ন্যূনতম প্রায় ৯ হাজার কিউসেক পানি ভাটিতে ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে; অন্য শুষ্ক মাসগুলোতে এর চেয়ে বেশি প্রবাহ রাখা হবে।

ব্যারাজ কি নদীভাঙন বাড়াতে পারে: ব্যারাজ নির্মাণে নদীভাঙন হবে না—এমন নিশ্চয়তা যেমন দেওয়া যায় না, তেমনি ব্যাপক নদীভাঙন অনিবার্য—এমন সিদ্ধান্তও বৈজ্ঞানিক নয়। উজানে পলি সঞ্চয় ও প্রবাহপথ পরিবর্তন এবং ভাটিতে স্থানীয় নদীতল ক্ষয় ও পলির ঘাটতি কোনো কোনো স্থানে ভাঙনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই সমীক্ষায় নদীশাসন ও প্রয়োজনীয় তীররক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নির্মাণের আগে ও পরে নদীর প্রবাহপথ, তলদেশ ও তীরের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি।

গঙ্গা পানিচুক্তি: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো ব্যারাজ পানি তৈরি করতে পারে না; নদীতে আসা পানিই কেবল সংরক্ষণ ও পুনর্বণ্টন করতে পারে। ১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা। ভবিষ্যতে পদ্মা ব্যারাজের পূর্ণ কার্যকারিতার জন্য শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য উজানের প্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীতে পানি সরবরাহ, সেচ, সুন্দরবনে মিঠাপানি, ভাটির পরিবেশগত প্রবাহ ও জলবিদ্যুৎ—সব লক্ষ্য পূরণ কঠিন হবে। তাই ভবিষ্যৎ পানিবণ্টনব্যবস্থায় নিশ্চিত শুষ্ক-মৌসুমি প্রবাহ, পরিবেশগত প্রবাহ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রয়োজন সমন্বিত ও অভিযোজনযোগ্য পরিচালনবিধি

পদ্মা ব্যারাজের সাফল্য শেষ পর্যন্ত শুধু কংক্রিটের কাঠামোর ওপর নয়, বরং এটি কীভাবে পরিচালিত হবে তার ওপর বেশি নির্ভর করবে। একটি কার্যকর পরিচালনবিধিতে একই সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে পানি সংরক্ষণ, পলি প্রবাহ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীতে পানি সরবরাহ, ভাটির পরিবেশগত প্রবাহ, নাব্যতা, লবণাক্ততা, বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি। নদীর পানিপ্রবাহ, পানির স্তর, পলির ঘনত্ব, নদীতলের পরিবর্তন, নদীর তীররেখার পরিবর্তন এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর লবণাক্ততা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য একটি আধুনিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নতুন তথ্য, নদীর পরিবর্তন, খরা-বন্যার প্রকৃতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ভিত্তিতে পরিচালন পদ্ধতি নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে।

শেষ কথা

নদীতে ড্যাম বা ব্যারাজ কোনো নিষিদ্ধ স্থাপনা নয়। নদীর প্রবাহকে যথাযথভাবে ব্যবহার করার জন্য ক্ষেত্রবিশেষে এসব স্থাপনা নির্মাণের প্রয়োজন হয়। তবে পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নকালীন সময়েই এসব স্থাপনার পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার উপায় ও এ স্থাপনাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, ভারত মূল গঙ্গার ওপর ফারাক্কাসহ ছয়টি ব্যারাজ নির্মাণ করেছে এবং গঙ্গার উপনদীগুলোসহ গঙ্গা অববাহিকায় এখন পর্যন্ত ভারত ৭৩টি ব্যারাজ নির্মাণ করেছে। ভারত-পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অন্যতম দীর্ঘ নদী সিন্ধুর ওপর পাকিস্তান ছয়টি ব্যারাজ নির্মাণ করেছে, যেগুলো মূলত সেচকাজ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই ব্যারাজগুলো পাকিস্তানের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে।

পদ্মা ব্যারাজ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৬টি জেলায় পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, নাব্যতা, মৎস্যসম্পদ ও পরিবেশগত ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা রাখে। মৃতপ্রায় নদী পুনরুজ্জীবন, সেচ সম্প্রসারণ, নাব্যতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধি, মৎস্যসম্পদের উন্নয়ন এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদন—সব মিলিয়ে প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফল ব্যাপক। তবে এত বড় নদীতে একটি ব্যারাজের সাফল্য শুধু এর নির্মাণের ওপর নির্ভর করবে না।

প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি হবে—ব্যারাজটি নদীর পানি ও পলির স্বাভাবিক গতিশীলতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে তিনটি বিষয় প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। প্রথমত, শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গায় বাংলাদেশের জন্য পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি পলির উজান-ভাটির ধারাবাহিকতা যতটা সম্ভব বজায় রাখতে বৈজ্ঞানিক পলি ব্যবস্থাপনা করা। তৃতীয়ত, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানির চাহিদা মেটাতে গিয়ে ব্যারাজের ভাটির গঙ্গা-পদ্মার প্রয়োজনীয় পরিবেশগত প্রবাহ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে সমীক্ষা ও পরিকল্পনার পর পদ্মা ব্যারাজ এখন বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসেছে।

আগের সমীক্ষাগুলো এ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশল ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে ব্যারাজ নির্মাণের আগে ও নির্মাণকালীন সময়ে সর্বশেষ পানিপ্রবাহ, পলি পরিবহন, নদীর রূপগত পরিবর্তন, উজানের পানি প্রত্যাহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের তথ্য ব্যবহার করে পূর্ববর্তী সমীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অনুমানগুলো হালনাগাদ করা প্রয়োজন।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিস্তারিত প্রকৌশল নকশার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনগুলো গবেষক ও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করাও জরুরি। এতে প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফল ও ঝুঁকি নিয়ে অনুমাননির্ভর বিতর্কের পরিবর্তে তথ্য ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণনির্ভর আলোচনা সম্ভব হবে। ব্যারাজকে তাই শুধু একটি ব্যারাজ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে হবে পানি, পলি, নদী, কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, উপকূল ও সুন্দরবনকে একই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা একটি সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প।

  • ড. মো. আতাউর রহমান অধ্যাপক, পানিসম্পদ কৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)

    মতামত লেখকের নিজস্ব