কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগর গ্রামে সম্প্রতি পীরের দরবারে পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগর গ্রামে সম্প্রতি পীরের দরবারে পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়

মতামত

‘পরিকল্পিত’ মব সহিংসতায় সরকারের অবস্থান কী

মাজার নিয়ে বাংলাদেশে বহুকাল ধরে ধর্মতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক আলাপ-আলোচনা করা হচ্ছে। ওয়াজ মাহফিল থেকে শুরু করে বিদ্যায়তনিক জগৎ পর্যন্ত সব পরিসরে মাজারের পক্ষে-বিপক্ষে এবং প্রতিটি পক্ষের ভেতরেও নানা কিসিমের বাহাস চালু আছে।

এই ধরনের বাহাস বা তর্ক-বিতর্কের সহাবস্থান মোটেই অস্বাভাবিক নয়, বরং একটি সুষ্ঠু স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক সমাজেরই আলামত। কিন্তু তর্ক-বিতর্কের উপস্থিতি, নিজের মতকে ওয়াজ–নসিহত দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করা এক জিনিস এবং নিজের মতকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে আরেকজনের জীবনযাপনকে গুঁড়িয়ে দেওয়া একেবারেই ভিন্ন জিনিস।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে মাজার, খানকা ও দরবার ভাঙার যে ‘উৎসব’ শুরু হয়েছিল এবং যা আজতক জারি আছে, তা এখানকার রাজনৈতিক ইতিহাসে একেবারে নতুন প্রবণতা। যে প্রবল নাগরিক ঐক্যের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতন নিশ্চিত হয়েছিল, সেই ঐক্যের প্রথম ফাটল ধরে মাজারগুলোতে হামলার মধ্য দিয়ে।

এখন পর্যন্ত কতগুলো মাজারে হামলা হয়েছে, তার কয়েকটি হিসাব পাওয়া যায়। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশের ৬৫টি স্থানে মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে ৬৭টি (বণিক বার্তা, ১৮ এপ্রিল ২০২৬)।

অন্যদিকে সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘মাকাম’ যে হিসাব দিয়েছে, সেটা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। তারা বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭ মাসে সারা দেশে ৯৭টি মাজারে হামলা হয়েছে। এসব হামলায় ৩ জন নিহত ও ৪৬৮ জন আহত হয়েছেন বলে ‘মাকাম’ উল্লেখ করেছে (প্রথম আলো, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। মাজার ভাঙা ও লুটপাটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই এই হামলা, ইতিমধ্যে লাশ তুলে পুড়িয়ে ফেলা এবং পিটিয়ে মেরে ফেলার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে।

৫ আগস্টের পরপর হামলা শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সরকারের তরফ থেকে ‘সক্রিয়’ নীরবতা চোখে পড়ার মতো। প্রথম দিকে আইনশৃঙ্খলার নাজুক পরিস্থিতিকে ‘নীরবতা’র জন্য দায়ী করা হলেও, ধীরে ধীরে দেখা গেল কঠোর বিবৃতি দেওয়া ছাড়া সক্রিয়তা অতি অল্প। প্রায় ৬১ শতাংশ ক্ষেত্রে মামলাই হয়নি (নিউ এজ, ২২ এপ্রিল ২০২৬)। মাকামের প্রতিবেদন মতে, ৯৭টি মাজার হামলার মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র ১১টি; ৮৯ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা খেয়াল করেছে তারা। আশা করেছিলাম, নির্বাচিত সরকার এসব ঘটনা মোকাবিলায় সক্রিয় পদক্ষেপ নেবে।

কিন্তু এই নীরবতা নতুন সরকারের বেলাতেও প্রকট আকারে দেখা গেল কুষ্টিয়ার ঘটনায় (১১ এপ্রিল)। দিনদুপুরে লোক জড়ো করে পরিকল্পনা করে পিটিয়ে মেরে ফেলার মতো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও সরকারের তরফ থেকে সক্রিয়তা দেখা যায়নি। প্রথমে তো এই ঘটনায় মামলাই করা হয়নি; মামলা না হওয়ার সংবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়; এরপর মামলা হয়েছে। এমন ভয়াবহ ঘটনার পর যে ভুক্তভোগীরা মামলা করতে ভয় পান বা পাবেন, তা অনুমান করা যায়।

প্রায় প্রতিটি মাজার ও দরবার শরিফে হামলার সময় কিছু সাধারণ প্রবণতা খেয়াল করা যায়। হামলাগুলো ‘মব’-এর চেহারা নিলেও, মব বলতে আদতে যে ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত ও অসংগঠিত গণজটলা বা ক্রাউড বোঝায়, এর একটাও এমন নয়। বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেই ঘোষণা কেবল লিখেই নয়, ভিডিও বার্তাও দিতে দেখা গেছে; অতঃপর প্রায়ই মিটিং করতে দেখা যায়; মাইকেও আহ্বান করে লোক জড়ো করা হয়; এরপর ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

আজকে যারা কেবল নিজেদের মত ও বিশ্বাসের সঙ্গে মিলছে না বলে মাজার, খানকা, দরবার শরিফ ভাঙছে; মাজারে পিটিয়ে মেরে ফেলছে, লাশ তুলে আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে, রাষ্ট্র ও সরকারের নিষ্ক্রিয়তা তাদের আরও সাহস জোগাচ্ছে। বিচিত্র দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে এই আগুন, ইতিমধ্যে এর আলামতও দেখা যাচ্ছে। এগুলো সমাজে গভীর চিড় রেখে যাচ্ছে।

কোনো কোনো জনপ্রিয় ইসলামি বক্তাকেও ফেসবুকে হামলার ঘোষণা দিতে দেখা গেছে। অর্থাৎ প্রতিটি হামলাই ছিল পূর্বপরিকল্পিত। সাধারণত ‘মব ভায়োলেন্স’ বলতে যেমন আচানক জড়ো হয়ে সহিংস কর্মকাণ্ড বোঝানো হয়ে থাকে, মাজার ও দরবার শরিফে হামলার ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটাই ঘটতে দেখা যায়। হামলার ক্ষেত্রে বুলডোজার বা ভেকু ব্যবহার আদতে ‘পরিকল্পনার’ই নজির। ‘মাকাম’ তাদের প্রতিবেদনে এমন ছয়টি ঘটনার উল্লেখ করেছে, যেখানে বুলডোজার ব্যবহার করা হয়েছে।

সম্প্রতি বণিক বার্তার একটি প্রতিবেদনে যদিও দাবি করা হয়েছে, মবের মধ্যেই সব সময় ‘প্রশিক্ষিত দল’ থাকে; বলা হয়েছে যে এসব ঘটনায় প্রথমে একটি মব তৈরি হয়, তারপর ‘ভিড়ের আড়ালে সংগঠিত একটি গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে’ (বণিক বার্তা, ১৮ এপ্রিল ২০২৬)। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি পরিস্থিতি আসলে উল্টো। পরিকল্পনা করেই বরং ‘মব’–এর আয়োজন করা হয় এবং দিন শেষে মূল পরিকল্পনাকারীরা ‘তৌহিদি জনতা’ বা এমন বিভিন্ন নামের ব্যানার ব্যবহারকারী ‘মব’–এর আড়ালে নিজেদের চেহারা লুকিয়ে ফেলে।

এই ধরনের পরিকল্পিত ‘মব’ ও হামলায় যাঁরা অংশ নেন, তাঁদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাকেও অস্বীকার করার জো নেই। এই ধরনের উপস্থিতির মধ্যে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সদস্যের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপির সদস্যদের বিভিন্ন মাত্রায় উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।

সাম্প্রতিক কুষ্টিয়ার হামলার ঘটনাতেও এটা দেখা গেছে। যাঁদের নামে মামলা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও রয়েছেন। হামলার সামনের সারিতে ছাত্রদলের নেতাদের উপস্থিতিও ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে (যুগান্তর, ১৯ এপ্রিল ২০২৬) প্রতিটি হামলার ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করলে এর রাজনৈতিক দিকটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে মনে করি।

এখানে কয়েকটা বিষয় লক্ষণীয়। যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত মাজার ও দরবার শরিফ হেফাজতে সরকারের চরম উদাসীনতার দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রথমত, প্রতিটি হামলার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার দেখতে পাচ্ছি। ফেসবুকে প্রায়ই হামলার ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এসব প্রতিরোধে সরকার ও প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা ও উদাসীনতার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। উল্টো সম্প্রতি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া বা কার্টুন শেয়ার করা ইত্যাদির দিকে ঠিকই সরকারের কড়া ‘নজর’ দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, হামলাকারী ও পরিকল্পনাকারীদের চেহারা স্পষ্ট থাকলেও (ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে) অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকার ও পুলিশ বাহিনী যেন ‘চোখ বন্ধ’ করে রয়েছে। কুষ্টিয়ার ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, হামলার সামনের সারিতে উপস্থিত ছাত্রদলের নেতাদের নাম মামলায় নেই। এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তারের সংবাদ পাওয়া যায়নি। পরিকল্পিত হামলা এবং হামলার পর সরকারের ‘নীরব হয়ে বসে থাকা’ পুরো পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলছে।

মাজার ও দরবার শরিফ হেফাজতে যত দ্রুত সম্ভব সরকার ও রাষ্ট্রকে সক্রিয় হতে হবে। গত দুই বছরে যত হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, সবগুলোর সুষ্ঠু বিচার করতে হবে, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র যদি এই ধরনের নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের বেলায় চুপ করে থাকে, তাহলে পরোক্ষভাবে এ ধরনের হামলাকে জায়েজ করে তোলা হয়, হামলাকারীদের উসকে দেওয়া হয়।

লেখার শুরুতে যে ধরনের বাহাসমূলক সুষ্ঠু পরিবেশের কথা বলেছি, তার প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে নাগরিকের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা। সমাজের সব গোষ্ঠীর জীবন চর্চাকে সুরক্ষা প্রদান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

আজকে যারা কেবল নিজেদের মত ও বিশ্বাসের সঙ্গে মিলছে না বলে মাজার, খানকা, দরবার শরিফ ভাঙছে; মাজারে পিটিয়ে মেরে ফেলছে, লাশ তুলে আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে, রাষ্ট্র ও সরকারের নিষ্ক্রিয়তা তাদের আরও সাহস জোগাচ্ছে। বিচিত্র দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে এই আগুন, ইতিমধ্যে এর আলামতও দেখা যাচ্ছে। এগুলো সমাজে গভীর চিড় রেখে যাচ্ছে।

  • সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক

    মতামত লেখকের নিজস্ব