প্রধান অভিযুক্ত একটা কিশোর গ্যাং গড়ার চেষ্টা করছিল, এবং অপ্রতিমকেও সে দলে টানতে চেয়েছিল।
প্রধান অভিযুক্ত একটা কিশোর গ্যাং গড়ার চেষ্টা করছিল, এবং অপ্রতিমকেও সে দলে টানতে চেয়েছিল।

মতামত

অপ্রতিম হত্যা, টিকটকের ‘গ্যাং’ এবং আমাদের দায়

নেটফ্লিক্সের ‘অ্যাডোলেসেন্স’ দেখার পর অনেক দিন মাথা থেকে যায়নি তেরো বছরের জেমির কথা। নিজের ঘরে বসেই ছেলেটা অনলাইনের এক অন্ধকার জগতে ঢুকে পড়ে, আর কেউ টেরই পায় না। তখন ভেবেছিলাম, এটা অন্য দেশের গল্প। গত সপ্তাহে কুমিল্লা সে ভুল ভেঙে দিল।

শুক্রবার তেরো বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বেরিয়েছিল, আর ফেরেনি। পরদিন লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গলে তার মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশ বলছে, ফোন কেড়ে নিতে গেলে সে বাধা দেয়, তখন বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়।

তদন্ত যত এগোচ্ছে, ছবিটা তত জটিল হচ্ছে। সপ্তম শ্রেণির এই ছাত্রের বন্ধুত্ব ছিল কয়েক বছরের বড় তরুণদের সঙ্গে। সেই বন্ধুত্বের কেন্দ্রে ছিল মোটরসাইকেলে ঘোরা, ছবি তোলা আর টিকটক ভিডিও। শেষে পরিচিতরাই প্রলোভন দেখিয়ে তাকে পাহাড়ে নিয়ে যায়।

প্রথম আলোর অনুসন্ধান বলছে, প্রধান অভিযুক্ত ১৯ বছরের তুহিন একটা কিশোর গ্যাং গড়ার চেষ্টা করছিল। অপ্রতিমকেও সে দলে টানতে চেয়েছিল। আর টিকটক ভিডিও বানানোর কথা বলে সে অন্য কিশোরদের জড়ো করত। হত্যার সঙ্গে গ্যাংয়ের সরাসরি যোগ আছে কি না, তা এখনো তদন্তাধীন। কিন্তু যে পরিবেশে এটা ঘটেছে, তা নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা নেই।

সহিংসতা যখন ‘কনটেন্ট’

কুমিল্লা শহরে এখন অন্তত ২০টি গ্যাং সক্রিয়। চলতি বছরেই অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধে এদের নাম এসেছে। গত মে মাসে দেড় শ জনের মতো কিশোর-তরুণ দা-চাপাতি হাতে শহরে মহড়া দিয়েছে, আর তার আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোষণা দিয়েছিল। এই গ্যাংগুলোর সদস্যরা জড়ো হয় টিকটক ভিডিও আর অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে।

বেশির ভাগের হাতে দামি ফোন থাকে, সেটা দিয়ে উসকানিমূলক ভিডিও বানিয়ে পোস্ট করা হয়। পুলিশ ২৫০ জনের বেশি সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে অনেকে দ্রুত ছাড়া পেয়ে আবার একই কাজে ফেরে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদের ব্যাখ্যা পরিষ্কার। সোশ্যাল মিডিয়া এমন পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে কিশোরেরা আগ্রাসন দেখিয়ে ‘কুল’ হতে চায়। লাইক আর ফলোয়ার যত বাড়ে, তত তারা নিজেদের নায়ক ভাবে। জেমির গল্পে যেটা ছিল ‘ম্যানোস্ফিয়ার’, আমাদের এখানে সেটা দা হাতে মোটরসাইকেল মহড়ার রিল। অ্যালগরিদম দুটোকেই সমান পুরস্কার দেয়।

মা–বাবার সঙ্গে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম

বিশ্ব এগোচ্ছে

এএফপির হিসাবে বিশ্বের ২০ টিরও বেশি দেশ শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার সীমিত বা বন্ধ করার পদক্ষেপ নিয়েছে।

• অস্ট্রেলিয়া: ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৬-র নিচে নিষিদ্ধ।
• মালয়েশিয়া: জুন থেকে ১৬-র নিচে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর।
• ইন্দোনেশিয়া: মার্চে ১৬-র নিচে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা।
• যুক্তরাজ্য: ১৬-র নিচে টিকটক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুকসহ বড় প্ল্যাটফর্মগুলো বন্ধ।
• ফ্রান্স: ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫-র নিচে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর।

নিষেধাজ্ঞাতে যে সমস্যা নেই তা নয়। অস্ট্রেলিয়ায় কিশোরেরা ব্যাপকভাবে তা ফাঁকি দিচ্ছে। কিন্তু আইন না থাকলে প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর কোনো দায়ও থাকে না। আর দায় থাকলে, সেই দায় যে চাপানো যায়, তার প্রমাণ এখন আছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোতে আদালত মেটাকে মোট ৯৪২ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছে।

আদালত দেখেছেন, প্ল্যাটফর্ম কিশোরদের জন্য আসক্তিকর আর বিষণ্নতা তৈরি করছে, এই তথ্য মেটা জেনেশুনেই উপেক্ষা করেছিল। এরপর মার্কিন অঙ্গরাজ্যগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় মেটা দশ বছরে ১৭ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত দিতে রাজি হয়েছে। সঙ্গে প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের জন্য নিরাপদ করতে বড় পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।

সরকারের কাছে আমার স্পষ্ট অনুরোধ, শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিয়ে একটা জাতীয় নীতি এখনই প্রণয়ন করা হোক। অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে আছে। শিশু অধিকারকর্মী, শিক্ষক, অভিভাবক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আর প্ল্যাটফর্মগুলোকে এক টেবিলে বসালে দ্রুত একটা কাঠামো দাঁড় করানো সম্ভব।

বাংলাদেশ কোথায়?

বাংলাদেশ মেটার বৃহত্তম বাজারগুলোর একটি, এখানে প্রায় ৭২ মিলিয়ন ফেসবুক ব্যবহারকারী। টিকটকেও আমরা বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ-ছয়টি বাজারের একটি। আমাদের ঝুঁকি কোনো অর্থেই কম নয়।
চ্যালেঞ্জও আছে। এখানে শিশুরা প্রায়ই পরিবারের ফোন ব্যবহার করে, তাই শুধু সিম বা এনআইডি দিয়ে বয়স যাচাই কাজ করবে না।

আবার তাড়াহুড়োর আইন শিশুদের পুনর্বাসনের বদলে সংশোধনাগারের পথে ঠেলে দিতে পারে। এই সতর্কতাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সতর্কতা যেন নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত না হয়।

তাই সরকারের কাছে আমার স্পষ্ট অনুরোধ, শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিয়ে একটা জাতীয় নীতি এখনই প্রণয়ন করা হোক। অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে আছে। শিশু অধিকারকর্মী, শিক্ষক, অভিভাবক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আর প্ল্যাটফর্মগুলোকে এক টেবিলে বসালে দ্রুত একটা কাঠামো দাঁড় করানো সম্ভব। প্রতিটা দিনের দেরি মানে আরও একটা শিশুকে ঝুঁকির মুখে রেখে দেওয়া।

কুমিল্লা নগরের কান্দিরপাড় এলাকার রানীর দিঘির দক্ষিণ পাড়ে শতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্যকে মহড়া দিতে দেখা যায়

কী থাকা দরকার

১. বয়সসীমা, দায় প্ল্যাটফর্মের। ১৬-র নিচে স্পষ্ট আইনি সীমা থাকতে হবে, আর বয়স যাচাইয়ের দায় থাকবে প্ল্যাটফর্মের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রে মেটাকে শিশুদের জন্য প্ল্যাটফর্ম বদলাতে রাজি হতে হয়েছে। তাহলে আমাদের শিশুরা কম সুরক্ষা পাবে কেন?

২. সহিংস কনটেন্ট দ্রুত সরানো। অস্ত্রের মহড়া আর হুমকির ভিডিও সরাতে প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাংলাভাষী মডারেশন রাখতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা মানতে হবে।

৩. রাজনৈতিক আশ্রয় বন্ধ। দল-মত নির্বিশেষে গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ না হলে কোনো অ্যাপ বন্ধ করেও লাভ হবে না।

৪. শাস্তি নয়, আগাম হস্তক্ষেপ। স্কুলে কাউন্সেলিং দরকার, ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের আগেভাগে চিহ্নিত করা দরকার। আর যারা জড়িয়ে পড়েছে, তাদের জন্য দরকার পুনর্বাসন।

৫. বিকল্প ‘কুল’। মাঠ, খেলা, গান, নাটক, ফিল্মমেকিং দরকার। শুধু ‘না’ বললে চলবে না, একটা ‘হ্যাঁ’-ও দিতে হবে।

অভিভাবক হিসেবে আমাদের সবার প্রশ্নটাও এড়ানো যাবে না। সন্তানকে ফোন দেওয়া আর তার ভেতরের জগৎ চেনা এক কথা নয়। সে কাদের সঙ্গে সময় কাটায়, কারা অনেক বড় হয়েও তার ‘বন্ধু’, এসব খবর রাখা নজরদারি নয়, এটাই লালন।

কিন্তু এই দায় শুধু ঘরের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। অপ্রতিমের মৃত্যু একটা ব্যবস্থার ব্যর্থতা। এই ব্যবস্থায় অ্যালগরিদম সহিংসতাকে পুরস্কার দেয়, রাজনীতি গ্যাংকে আশ্রয় দেয়, আর শিশুদের অনলাইন সুরক্ষায় রাষ্ট্রের কোনো স্পষ্ট নীতি নেই। ‘অ্যাডোলেসেন্স’ দেখে আমরা শিউরে উঠেছিলাম। অপ্রতিমের পরও যদি শুধু শিউরে উঠি, তাহলে পরের নামটার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

  • আসিফ সালেহ্‌ নির্বাহী পরিচালক, ব্র্যাক

    * মতামত লেখকের নিজস্ব