বাংলাদেশের আইনি ও সাংবিধানিক সংস্কার আলোচনায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে। বিশেষত, বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি দুই দশক ধরে বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় ধারাবাহিকভাবে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে এসেছে। তাদের প্রস্তাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টে ন্যস্ত করা, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিচারক নিয়োগপ্রক্রিয়াকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত রাখা।
এ দাবিগুলোর পেছনে রাজনৈতিক বাস্তবতাও ছিল। বিএনপি নিজেই বহুবার অভিযোগ করেছে যে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে তাদের নেতা–কর্মীদের হয়রানি করা হয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে বিতর্কিত মামলায় দণ্ডিত করা, কারাবন্দী রাখা এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে বাধা দেওয়া—এসবই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা না থাকার উদাহরণ। একইভাবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচারের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁকেও বিভিন্ন মামলার কারণে দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকতে হয়েছে।
বিএনপি বিভিন্ন সময়ে বলেছে, বিচার বিভাগ নিরপেক্ষ থাকলে তাদের নেতা–কর্মীদের বিচারিক হয়রানির মধ্যে পড়তে হতো না। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি বৈপরীত্য লক্ষ করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলার পর, বিএনপির বর্তমান অবস্থান অনেকের কাছে অসংগতিপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। তারা অতীতে ৩১ দফা কর্মসূচি, জুলাই সনদ, নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ এবং এমনকি গণভোটের আহ্বানের ক্ষেত্রেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, পৃথক সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগে উপযুক্ত আইনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু এ–সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ সংসদে বাতিলের জন্য বিল তোলায় বিএনপির বিরুদ্ধে আগের অবস্থান থেকে সরে আসার অভিযোগ উঠেছে।
আপিল বিভাগ থেকে অন্য কোনো আদেশ না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের রায় মানা বাধ্যতামূলক। কেননা হাইকোর্টে রায়ের বিষয়ে আপিল বিভাগের কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ নেই।
এ প্রেক্ষাপটে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ, যা অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয় নির্ধারণ করে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে এই ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত ছিল। কিন্তু চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয় এবং পরবর্তীতে পঞ্চম ও পঞ্চদশ সংশোধনীতে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শের কথা বলা হয়।
জনস্বার্থে করা একটি মামলায় ২০২৫ সালে প্রদত্ত রায়ে, যার পূর্ণাঙ্গ পাঠ ৭ এপ্রিল প্রকাশিত হয়েছে; হাইকোর্ট ১১৬ অনুচ্ছেদকে ১৯৭২ সালের অবস্থায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ অধস্তন আদালতের ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনরায় সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে একটি পৃথক সচিবালয় গঠনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এসব বিষয়ে যথেষ্ট অগ্রগতিও হয়েছে।
আপিল বিভাগ থেকে অন্য কোনো আদেশ না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের রায় মানা বাধ্যতামূলক। কেননা হাইকোর্টে রায়ের বিষয়ে আপিল বিভাগের কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ নেই। তাই হাইকোর্টের রায়ের আলোকে পৃথক সচিবালয়ের কার্যক্রম যদি চলমান না থাকে অথবা অধস্তন আদালত যদি সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে, তাহলে তা হাইকোর্টের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। এতে আদালত অবমাননা হতে পারে।
যেহেতু একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নির্বাহী প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগ সুশাসনের অন্যতম পূর্বশর্ত, সেহেতু নাগরিক হিসেবে আমরা আশা করব, ১১৬ অনুচ্ছেদ মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া রায় আপিল বিভাগেও বহাল থাকবে এবং এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে, অর্থাৎ অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করা হবে এবং এই নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের অধীনে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় কার্যকর থাকবে।
ড. শরীফ ভূঁইয়া সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী
মতামত লেখকের নিজস্ব