ইসলামের ইতিহাসে আয়েশা (রা.)-এর নাম উচ্চারিত হলেই এক অনন্য সম্পর্কের কথা মনে পড়ে—যে সম্পর্ক ছিল গভীর ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও আধ্যাত্মিক বন্ধনে পরিপূর্ণ।
তিনি ছিলেন মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর অন্যতম প্রিয় স্ত্রী। নবির প্রতি তাঁর ভালোবাসা যেমন ছিল অপরিসীম, তেমনি নবিও তাঁকে ভালোবাসতেন অত্যন্ত গভীরভাবে।
এই ভালোবাসা কখনো প্রকাশ পেয়েছে মমতাময় আচরণে, কখনো স্নেহমাখা কথায়, আবার কখনো তাঁর প্রতি বিশেষ যত্ন ও গুরুত্ব প্রদানের মাধ্যমে।
সাহাবিদের মধ্যে একটি বিষয় প্রচলিত ছিল—যদি কেউ রাসুল (স)-কে কোনো উপহার দিতে চাইতেন, তবে চেষ্টা করতেন সেই দিনটি বেছে নিতে যেদিন তিনি আয়েশা (রা)-এর ঘরে অবস্থান করতেন।
কারণ সবাই জানতেন, প্রিয় স্ত্রীর সান্নিধ্যে নবীজি অধিক প্রসন্ন থাকেন। মানবিক অনুভূতির অংশ হিসেবেই এই বিষয়টি অন্য স্ত্রীদের মাঝে কিছুটা ঈর্ষার সৃষ্টি করত।
এই কারণে নবীজির অন্য স্ত্রীরা তাঁর কন্যা ফাতিমাকে পাঠালেন যেন তিনি বাবাকে এ বিষয়ে কিছু বলেন। ফাতিমা (রা.) বিষয়টি তুললে রাসুল (সা.) অত্যন্ত কোমলভাবে উত্তর দিলেন, ‘হে আমার কন্যা, আমি যাকে ভালোবাসি তুমি কি তাকেও ভালোবাসো না?’
ফাতিমা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘অবশ্যই ভালোবাসি।’ পরে স্ত্রীরা উম্মে সালামা (রা.)-কে অনুরোধ করলে তিনি তাঁকে বলেন, ‘আয়েশার ব্যাপারে তোমরা আমাকে কষ্ট দিও না। কেননা, তোমাদের মধ্যে আয়েশা ছাড়া আর কারও সঙ্গে একই কম্বলের নিচে অবস্থানকালে আমার ওপর ওহি অবতীর্ণ হয়নি।’ (সহিহ বুখারি: ২৫৮১, ৩৭৭৫; সহিহ মুসলিম: ২৪৪১)
একবার সাহাবি আমর ইবনে আস (রা.) নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনি মানুষদের মধ্যে কাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন?’
উত্তরে তিনি নিঃসংকোচে বললেন, ‘আয়েশাকে।’ এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘পুরুষদের মধ্যে কাকে?’
তখন তিনি বললেন, ‘তার বাবাকে’ (অর্থাৎ আবু বকর)। এই উত্তর নবীজির ভালোবাসার আন্তরিকতা ও স্বচ্ছতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। (সহিহ বুখারি: ৩৬৬২; সহিহ মুসলিম: ২৩৮৪)
একদিন আয়েশা (রা.) নিজেই নবিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি আমাকে কেমন ভালোবাসেন?’ উত্তরে রাসুল (সা.) বললেন, ‘তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা শক্ত রশির মতো, যার পাকগুলো পরস্পরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে আছে।’
এরপর মাঝে মাঝেই আয়েশা (রা.) মজার ছলে জিজ্ঞেস করতেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, সেই রশির অবস্থা কেমন আছে?’ তিনি হাসিমুখে বলতেন, ‘আগের মতোই আছে, কোনো পরিবর্তন হয়নি।’ (হিলয়াতুল আউলিয়া: ২/৪৪)
এক যুদ্ধের সফরে আয়েশা (রা.)-এর একটি হার হারিয়ে যায়। নবীজি (সা.) পুরো বাহিনীকে হারটি খুঁজে বের করার নির্দেশ দিলেন। হার খুঁজতে খুঁজতে সন্ধ্যা হয়ে গেল এবং কাফেলাকে পানির ব্যবস্থা নেই এমন স্থানে রাত কাটাতে হলো।
সাহাবিরা চিন্তিত হয়ে পড়লেন যে অজু করবেন কী দিয়ে? তখনো তায়াম্মুমের বিধান অবতীর্ণ হয়নি।
আবু বকর (রা.) আয়েশার ওপর কিছুটা রাগান্বিত হয়ে তাঁকে শাসন করতে গেলেন, কিন্তু তিনি একটুও নড়লেন না। কারণ নবীজি তাঁর কোলে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিলেন। পরে যখন নবীজির ঘুম ভাঙল, আল্লাহ তায়াম্মুমের আয়াত অবতীর্ণ করলেন।
এই দেখে সাহাবি উসাইদ ইবনে হুজাইর (রা.) বলেছিলেন, ‘আপনাদের পরিবারের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের অনেক বড় নেয়ামত দান করেছেন।’ (সহিহ বুখারি: ৩৩৬, ৩৬৭২; সহিহ মুসলিম: ৩৬৭)
নবীজি আয়েশাকে আদর করে ‘আয়িশ’ কিংবা ‘হুমায়রা’ নামে ডাকতেন। মৃত্যুর আগে অসুস্থ অবস্থায় তিনি প্রতিদিন জিজ্ঞেস করতেন—আগামীকাল তিনি কোথায় থাকবেন। তিনি মূলত আয়েশা (রা.)-এর ঘরে থাকার পালাটির অপেক্ষা করতেন।
শেষ পর্যন্ত তাঁর কোলেই মাথা রেখে নবীজি ইন্তেকাল করেন। (সহিহ বুখারি: ৪৪৫০)
তবে এত ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও রাসুল (সা.) স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার বজায় রাখতেন। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! এটি আমার ক্ষমতার মধ্যে থাকা বণ্টন। কিন্তু যে বিষয়গুলো আমার নিয়ন্ত্রণে নেই, সে বিষয়ে আমাকে তিরস্কার করবেন না।’ (সুনানে তিরমিজি: ১১৪০)
নবীজির পারিবারিক জীবন ছিল ভালোবাসা, দয়া ও ন্যায়বিচারের এক অপূর্ব সমন্বয়। আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর এই অমলিন সম্পর্ক কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর জন্য দাম্পত্য জীবনের আদর্শ হয়ে থাকবে।
আহমাদ সাব্বির : আলেম ও লেখক