পাথেয়

সম্পদের সঠিক ব্যবহার শেখায় কোরআনের ১০ আয়াত

জীবনধারণের জন্য সম্পদ অপরিহার্য, তবে এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। পবিত্র কোরআনে সম্পদের উপার্জন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও বরকত অর্জনে সহায়ক এমন ১০টি আয়াতের বর্ণনা দেওয়া হলো:

১. মধ্যপন্থা অবলম্বনেই সার্থকতা

ব্যয়ের ক্ষেত্রে অতিভোজ বা কৃপণতা—কোনোটিই কাম্য নয়। ভারসাম্যপূর্ণ ব্যয়ই মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

  • উচ্চারণ: ওয়াল্লাযিনা ইযা আনফাকূ লাম ইউসরিফূ ওয়া লাম ইয়াকতুরূ ওয়া কানা বাইনা যালিকা কাওয়ামা।

  • অর্থ: আর যারা ব্যয় করার সময় অপচয় করে না এবং কৃপণতাও করে না; বরং তারা এই দুইয়ের মধ্যবর্তী পন্থায় থাকে। (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৭)

২. অপচয়কারী আল্লাহর অপ্রিয়

খাদ্য ও পানীয়র অপচয় কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি একটি সামাজিক অপরাধও বটে।

  • উচ্চারণ: ইয়াবানি আদামা খুযূ যিনাতাকুম ইনদা কুল্লি মাসজিদিন ওয়া কুলূ ওয়াশরাবূ ওয়ালা তুসরিফূ; ইন্নাহু লা ইউহিব্বুল মুসরিফীন।

  • অর্থ: হে আদম সন্তান, তোমরা প্রত্যেক নামাজের সময় সাজসজ্জা গ্রহণ করো; খাও ও পান করো কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)

৩. পরকালের বিনিয়োগ

আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করাকে একটি বীজের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যা থেকে শতগুণ ফসল উৎপন্ন হয়।

  • উচ্চারণ: মাছালুল্লাযিনা ইয়ুনফিকূনা আমওয়ালাহুম ফী সাবীলিল্লাহি কামাছালি হাব্বাতিন আমবাতাত সাবআ সানাবিলা ফী কুল্লি সুমবুলাতিম মিআতু হাব্বাহ।

  • অর্থ: যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মতো, যা সাতটি শিষ উৎপন্ন করল এবং প্রতিটি শিষে একশ দানা। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬১)

৪. সম্পদ পুঞ্জীভূত করার পরিণাম

সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখা এবং জাকাত না দেওয়া গুরুতর পাপ। এটি সমাজে অর্থের প্রবাহ কমিয়ে দেয়।

  • উচ্চারণ: ওয়াল্লাযিনা ইয়াকনিযূনায যাহাবা ওয়াল ফিদ্দাতা ওয়ালা ইয়ুনফিকূনাহা ফী সাবীলিল্লাহি ফাবাশশিরহুম বিআযাবিন আলীম।

  • অর্থ: আর যারা সোনা ও রুপা জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দাও। (সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৪-৩৫)

৫. স্বজনদের হক আদায়ে অগ্রাধিকার

সম্পদের ব্যয়ে নিজের পরিবারের পর নিকটাত্মীয় ও দুস্থদের প্রাধান্য দেওয়া ইসলামের শিক্ষা।

  • উচ্চারণ: ওয়া আতি যাল কুরবা হাক্কাহু ওয়াল মিসকীনা ওয়াবনাস সাবীলি ওয়ালা তুবাজযির তাবযীরা।

  • অর্থ: আত্মীয়স্বজনকে তাদের প্রাপ্য দাও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদেরও। আর কোনোভাবেই অপচয় করো না। (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৬)

৬. উপার্জনের পথ হতে হবে স্বচ্ছ

কেবল ব্যয় নয়, সম্পদ আসার পথটিও হতে হবে হালাল ও পবিত্র। হারাম উপার্জন ইবাদত কবুলের পথে অন্তরায়।

  • উচ্চারণ: ইয়া আইয়্যুহান নাসু কুলূ মিম্মা ফিল আরদ্বি হালালান তাইয়্যিবা।

  • অর্থ: হে মানুষ! পৃথিবীতে যা আছে তা থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু আহার করো। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬৮)

৭. কৃপণতা ও অপব্যয়ের পরিণাম

সম্পদ আগলে রাখা যেমন নিন্দনীয়, সব বিলিয়ে দিয়ে নিঃস্ব হওয়াও তেমনি অনুচিত।

  • উচ্চারণ: ওয়ালা তাজআল ইয়াদাকা মাগলূলাতান ইলা উনুকিকা ওয়ালা তাবসুতহা কুল্লাল বাসতি ফাতাকউদা মালূমাম মাহসুরা।

  • অর্থ: তুমি তোমার হাত তোমার গলায় বেঁধে রেখো না (কৃপণ হয়ো না) এবং তা একেবারে খুলেও দিও না; তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হয়ে পড়বে। (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৯)

৮. বিশুদ্ধ নিয়তে দান

মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়, বরং কেবল স্রষ্টাকে সন্তুষ্ট করার জন্য দান করলেই সম্পদে বরকত আসে।

  • উচ্চারণ: আল্লাযী ইয়ূতী মালাহু ইয়াতাযাক্কা... ইল্লাবতিগাআ ওয়াজহি রাব্বিহিল আলা।

  • অর্থ: যে পবিত্রতা অর্জনের জন্য নিজের সম্পদ দান করে... কেবল তার মহান রবের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। (সুরা লাইল, আয়াত: ১৮-২০)

৯. আমরা সম্পদের রক্ষক মাত্র

সম্পদ আমাদের চিরস্থায়ী মালিকানা নয়, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি আমানত বা পরীক্ষা।

  • উচ্চারণ: আমিনূ বিল্লাহি ওয়া রাসূলিহী ওয়া আনফিকূ মিম্মা জাআলাকুম মুস্তাখলাফীনা ফীহ।

  • অর্থ: তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো এবং তা থেকে ব্যয় করো যার উত্তরাধিকারী তিনি তোমাদের করেছেন। (সুরা হাদিদ, আয়াত: ৭)

১০. আখিরাতের পাথেয়

মৃত্যু আসার আগেই নিজের অর্জিত সম্পদ থেকে আর্তমানবতার সেবায় ব্যয় করা বুদ্ধিমানের কাজ।

  • উচ্চারণ: ইয়া আইয়্যুহাল্লাযিনা আমানূ আনফিকূ মিম্মা রাযাকনাকুম মিন কাবলি আই ইয়াতিয়া ইয়াউমুল লা বাইউন ফীহি ওয়ালা খুল্লাতুও ওয়ালা শাফাআহ।

  • অর্থ: হে মুমিনগণ, আমি তোমাদের যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করো সেই দিন আসার আগে, যেদিন কোনো কেনাবেচা, বন্ধুত্ব ও সুপারিশ থাকবে না। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৪)

পরিশেষে, সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসলামি দর্শনের মূল কথা হলো—হালাল পথে উপার্জন, মিতব্যয়িতা এবং মানবতার সেবায় ব্যয়। আল্লাহ আমাদের সম্পদের সঠিক ব্যবহারের তৌফিক দিন। আমিন।