
স্ত্রীর দুই হাতে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের স্মারক চেক ও ট্রফি। শরীফুল ইসলাম অবশ্য দুই হাতে সবকিছু সামলাতে পারেননি। তাঁর ডান হাতে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারির স্মারক চেক, বাঁ হাতে ট্রফি ও কোলে ‘ভবিষ্যৎ’।
শরীফুল তাঁর সেই ভবিষ্যৎ অর্থাৎ সন্তানকে উৎসর্গ করেছেন টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার। ফেসবুকে পারিবারিক এই ছবিটি পোস্ট করে লিখেছেন, ‘প্লেয়ার অফ দ্যা টুর্নামেন্ট টা বাবা তোমার জন্য।’
শরীফুল একজন পেসার—স্বাভাবিকভাবেই যেকোনো টুর্নামেন্টেই বোলারদের মধ্যে উইকেট নেওয়ায় শীর্ষে থাকাটা তাঁর লক্ষ্য। কিন্তু একটি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হওয়া, সেটাও ব্যাটসম্যানদের পেছনে ফেলে, অবশ্যই সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার চেয়েও বড় অর্জন। আর কে না জানে, মা–বাবারা সব সময় সন্তানদের জন্য সেরাটা চান, দিতে চান নিজের সেরা অর্জনগুলোও।
শরীফুল হয়তো জানেন না, গতকাল বিপিএলের ফাইনালের পর তাঁর অলক্ষ্যেই পরিসংখ্যানের পাতায় যোগ হয়েছে আরও বড় এক অর্জন। জানলে নিশ্চয়ই সেটাও উৎসর্গ করতেন তাঁর সন্তানকেই। অবশ্য এমন অর্জনের নেই কোনো স্মারক চেক কিংবা ট্রফি। কেউ এসে আলাদা করে প্রাইজমানিও হাতে তুলে দেবে না। কিন্তু তালিকাটা দেখার পর শরীফুল তো বটেই, বাংলাদেশের যেকোনো ক্রিকেটপ্রেমীরই গর্ব লাগার কথা।
স্বীকৃত টি-টুয়েন্টি টুর্নামেন্টে এক মৌসুমে অন্তত ২৫ উইকেট নেওয়া আইসিসি টেস্ট খেলুড়ে দেশের বোলারদের মধ্যে সেরা ইকোনমি রেট এখন শরীফুলের।
এবার বিপিএলে চট্টগ্রাম রয়্যালসের হয়ে ১২ ম্যাচে ১২ ইনিংসে ৪৪.৫ ওভার (২৬৯ ডেলিভারি) বোলিং করে সর্বোচ্চ ২৬ উইকেট পেয়েছেন শরীফুল। যেহেতু বোলার, তাই নামের পাশে কত উইকেট—সেটাতেই লক্ষ থাকে সবার। টি-টুয়েন্টিতে ইকোনমি রেট খুব গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাতে খুব একটা চোখ পড়ে না সবার। অথচ এবারের বিপিএলে ফাইনালে হেরে যাওয়া শরীফুলের ইকোনমি রেট দেখুন—৫.৮৪!
বোলার উইকেটশিকারি হলে সে জন্য একটু বেশি রান দেওয়াটা বিচিত্র কিছু না। আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টিতে শরীফুলের ইকোনমি রেট যেমন ৮.১১ এবং ঘরোয়া টি-টুয়েন্টিতে ৮.২৪। সেখানে এবারের বিপিএলে শরীফুল উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি রান দেওয়াতেও কিপটেমির চূড়ান্ত করে ছেড়েছেন।
তাতে পেছনে পড়েছেন শ্রীলঙ্কান কিংবদন্তি লাসিথ মালিঙ্গা। ২০১১ আইপিএলে মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের হয়ে মোট ৬৩ ওভার (৩৭৮ ডেলিভারি) বোলিং করে ২৮ উইকেট নেওয়া মালিঙ্গার ইকোনমি রেট ছিল ৫.৯৫। এত দিন স্বীকৃত টি-টুয়েন্টি টুর্নামেন্টের এক মৌসুমে আইসিসি টেস্ট খেলুড়ে দেশের বোলারদের মধ্যে এটাই ছিল সেরা ইকোনমি রেটের রেকর্ড। ছিল—শব্দটি কেন ব্যবহার করতে হচ্ছে, তা এতক্ষণে আপনার জানা। কারণ, সর্বকালের অন্যতম সেরা টি-টুয়েন্টি বোলারকে পেছনে ফেলে তালিকাটির শীর্ষে উঠেছেন শরীফুল।
শুধু শরীফুল ও মালিঙ্গারই এক টুর্নামেন্টে ওভারপ্রতি গড়ে রান দেওয়ার (ইকোনমি রেট) হার ৬–এর নিচে। বাকি সবার ৬–এর ওপরে। তৃতীয় নিউজিল্যান্ডের স্পিনার জিতান প্যাটেল—২০১৪ ন্যাটওয়েস্ট ব্লাস্টে ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে ১৫ ইনিংসে ২৫ উইকেট নেওয়ার পথে তাঁর ইকোনমি রেট ছিল ৬.১১।
এই তালিকার শীর্ষ দশে আছেন আরও একজন বাংলাদেশি। তাসকিন আহমেদ! ২০২৪-২৫ বিপিএলে দুর্বার রাজশাহীর হয়ে ১২ ইনিংসে ৪৬.২ ওভার বোলিং করে ২৫ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ৬.৪৯ ইকোনমি রেট নিয়ে তালিকায় নবম তাসকিন। এই তালিকার শীর্ষ দশে শুধু তিনজন বোলারই ইনিংসে ৫ উইকেট পেয়েছেন। তাতে বাংলাদেশের দাপট বেশি। শরীফুল ও তাসকিন পেয়েছেন ৫ উইকেট, শ্রীলঙ্কা থেকে পেয়েছেন মালিঙ্গা।
আইসিসির সহযোগী সদস্য ও পূর্ণ সদস্যদেশগুলো মিলিয়ে স্বীকৃত টি-টুয়েন্টি টুর্নামেন্টের এক মৌসুমে সেরা ইকোনমি রেট উগান্ডার বাঁহাতি স্পিনার আলপেশ রামজানির। ২০২৩ সালে ইস্ট আফ্রিকা কাপে ১১ ইনিংসে ৪.৪৭ ইকোনমি রেটে ২৫ উইকেট নেন এই বাঁহাতি স্পিনার।
শরীফুল অবশ্য অন্য এক তালিকায় শীর্ষে। আইসিসির টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর বোলারদের মধ্যে স্বীকৃত টি-টুয়েন্টি টুর্নামেন্টের এক মৌসুমে সেরা বোলিং গড় এখন তাঁর এবং সেটা এবারের বিপিএলের পারফরম্যান্সের কারণে। এবার বিপিএলে তাঁর বোলিং গড় ১০.০৭।
দুইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বাঁহাতি পেসার বেউরান হেনড্রিকস—২০১৩-১৪ মৌসুমে রাম স্ল্যাম টি-টুয়েন্টিতে ১১ ইনিংসে তাঁর বোলিং গড় ছিল ১০.২৮। পাকিস্তানের শাদাব খান ২০২৩-২৪ মৌসুমে ন্যাশনাল টি-টুয়েন্টি কাপে ১০ ইনিংসে ১১.৬৪ গড় নিয়ে তৃতীয়। এই তালিকার শীর্ষ পাঁচে তাসকিনও আছেন। ২০২৪-২৫ বিপিএলে ১২.০৪ বোলিং গড় নিয়ে পাঁচে তাসকিন।
তবে সেরা গড়ের এই তালিকায় আইসিসির সহযোগী সদস্যদেশগুলোকে আমলে দুইয়ে নেমে যাবেন শরীফুল। ২০২৩ সালে সেই ইস্ট আফ্রিকা কাপেই রামজানির বোলিং গড় ছিল ৭.৬৪।