১৯৭০ মেক্সিকো: পেলের অমরত্ব এবং জুলে রিমে ট্রফির চিরতরে ব্রাজিলের হয়ে যাওয়া

১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর সেই ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপ নামে যে মহাযাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রার কোথাও পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকরি ছোঁয়া, আবার কোথাও জিনেদিন জিদান কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথে হেঁটে যাওয়া—সব মিলিয়েই তো এই ফুটবল-পুরাণ। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে সেই সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফেরানোর আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।

৪০ বছর আর ৯টি বিশ্বকাপ।

অবশেষে চিরস্থায়ী এক ঠিকানা খুঁজে পেল জুলে রিমে ট্রফি।

পেলের অবিশ্বাস্য জাদুতে ভর করে ডানাযুক্ত গ্রিক দেবী ‘নাইকি’র সেই ভাস্কর্যটি চিরতরে নিজেদের করে নিল সেলেসাওরা। তিনটি বিশ্বকাপ জেতার এক অনন্য ও এখন পর্যন্ত অধরা কীর্তি গড়ে ফুটবলে অমরত্ব পেলেন পেলে।

তবে সুইডেন বা চিলির মতো মেক্সিকোতেও সান্তোসের সেই কালো মানিক একা ছিলেন না। কোচ মারিও ‘লোবো’ জাগালো তাঁর চারপাশে সাজিয়েছিলেন এক অবিশ্বাস্য নক্ষত্রমণ্ডল—গার্সন, রিভেলিনো, তোস্তাও ও জেয়ারজিনহো।

জেয়ারজিনহো গড়েছিলেন এক অনন্য কীর্তি, টুর্নামেন্টে প্রতিটি ম্যাচে গোল করার রেকর্ড। চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে দুটি, ইংল্যান্ড, রোমানিয়া, পেরু, উরুগুয়ে ও ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে একটি করে। আর তোস্তাও? আর্জেন্টিনার সাবেক খেলোয়াড় ও কোচ সিজার লুইস মেনোত্তি একবার বলেছিলেন, ‘যদি পেলের জন্ম না হতো, তবে তোস্তাও-ই হতো পেলে।’

কার্ড আর বদলির নতুন যুগ

আগের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচের সেই চরম বিশৃঙ্খলার পর ফিফা এবার প্রথম চালু করল হলুদ ও লাল কার্ডের নিয়ম। সোভিয়েত ইউনিয়নের ইভজেনি লোভচেভ উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকোর বিপক্ষে প্রথম হলুদ কার্ড দেখে ইতিহাসে নাম লেখান। তবে পুরো টুর্নামেন্টের ৩২টি ম্যাচে একজন খেলোয়াড়কেও লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়নি!

তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতা পেলেকে নিয়ে সতীর্থদের উল্লাস।

আরেকটি বড় পরিবর্তন ছিল খেলোয়াড় বদলির নিয়ম। প্রতি ম্যাচে সর্বোচ্চ দুজন খেলোয়াড় বদল করার অনুমতি দেওয়া হয়। উদ্বোধনী ম্যাচেই সোভিয়েত ইউনিয়নের আনাতোলি পুজাখ প্রথমার্ধের পর ভিক্টর সেরেব্রিয়ানিকভের জায়গায় মাঠে নেমে ইতিহাস গড়েন। আর প্রথম বদলি খেলোয়াড় হিসেবে গোল করার কীর্তি গড়েন মেক্সিকোর ইগনাসিও বাসাগুরেন। ৭ জুন আজতেকা স্টেডিয়ামে এল সালভাদরের বিপক্ষে ৭৬ মিনিটে মাঠে নেমে ৮৩ মিনিটে দলের চতুর্থ গোলটি করেন তিনি।

‘শতাব্দীর সেরা ম্যাচ’ এবং ‘প্রিজন ব্রেক’

১৯৭০ (এবং পরে ১৯৮৬) বিশ্বকাপ হয়েছিল তীব্র গরমে। তবে দুপুরের কড়া রোদে ম্যাচগুলো হলেও ফুটবলের মান ছিল দারুণ। বিশেষ করে ইতালি ও জার্মানির সেই সেমিফাইনাল, যা অতিরিক্ত সময়ে ৪-৩ ব্যবধানে জিতেছিল ইতালি। ফুটবল-ইতিহাসে এই ম্যাচটা পরিচিত ‘শতাব্দীর সেরা ম্যাচ’ (ম্যাচ অব দ্য সেঞ্চুরি) হিসেবে। জার্মানির কার্ল-হেইঞ্জ শ্নেলিঙ্গারের শেষ মুহূর্তের গোলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ৯৪ মিনিটে জার্ড মুলার জার্মানিকে এগিয়ে নেন, ৯৮ ও ১০৪ মিনিটে ইতালি ঘুরে দাঁড়ায়। ১১০ মিনিটে মুলার আবার সমতা ফেরান, কিন্তু তার ঠিক এক মিনিট পরেই জিয়ান্নি রিভেরা গোল করে ইতালির জয় নিশ্চিত করেন।

বিশ্বকাপের সেই ম্যাচ অব দ্য সেঞ্চুরির একটি মুহূর্ত।

যখন মাঠের ভেতরে এই মহাকাব্যিক লড়াই চলছিল, মেক্সিকোর তিস্তলা কারাগারের ২৩ জন কয়েদি দেখল, পাহারাদারদের সবাই খেলা দেখতে পাশের এক সরাইখানায় মগ্ন। ব্যস, রক্ষীদের অস্ত্রশস্ত্র লুট করে চোখের পলকে জেল ভেঙে হাওয়া হয়ে গেল তারা!

‘অ্যাডিডাস’ বলের যুগ

এই আসর থেকেই শুরু হয়েছিল আরেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায়—অফিশিয়াল ‘অ্যাডিডাস’ বলের যুগ। মেক্সিকো বিশ্বকাপের সেই বলের নাম ছিল ‘টেলস্টার’, যা ‘ট্যাঙ্গো’ ‘জাবুলানি’ বা এই বিশ্বকাপের ‘ট্রিয়ন্ডা’ বলের পূর্বসূরি।

ববি মুর এবং ব্রেসলেট চুরির নাটক

বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে, ২৬ মে কলম্বিয়ার বোগোতার এল ডোরাডো বিমানবন্দরে চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি অধিনায়ক ববি মুর! তাঁর বিরুদ্ধে ১ হাজার ৫০০ ডলার মূল্যের একটি সোনা ও পান্নাখচিত ব্রেসলেট চুরির অভিযোগ আনে হোটেলের এক জুয়েলারি দোকানদার। দলের বাকিরা মেক্সিকো চলে গেলেও মুরকে তিন দিন আটকে রাখা হয়। ইংল্যান্ডে মুরের স্ত্রী টিনা এবং ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলো এই অভিযোগকে ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দেয়। কলম্বিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের এক কর্মকর্তার বাসায় বন্দি থাকা অবস্থায়ও মুর প্রতিদিন ভোর সাড়ে ছয়টায় উঠে স্থানীয় ক্লাবের মাঠে দুই ঘণ্টা করে অনুশীলন করতেন। তিন দিন পর মুক্তি পেয়ে মেক্সিকোতে যখন পৌঁছান, তখন তাঁর ওজন কমে গেছে ৭ পাউন্ড।

ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি অধিনায়ক ববি মুর

মাত্র ৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতি নিয়ে রোমানিয়ার বিপক্ষে মাঠে নেমে দলকে ১-০ গোলে জেতান এই ডিফেন্ডার। ওদিকে যে বিক্রয়কর্মী মুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন, সেই ক্লারা প্যাডিলা লন্ডনের সমর্থকদের কাছ থেকে গলা কেটে ফেলার মতো একের পর এক উড়ো হুমকি পেয়ে ভয়ে চাকরি ছেড়ে পুলিশি পাহারায় চলে যান।

‘লাকি’ থারটিন

১৩ সংখ্যাটির কুখ্যাতির কারণে ফিফা প্রস্তাব করেছিল কোনো খেলোয়াড় চাইলে নম্বর ছাড়া খেলতে পারবেন। কিন্তু জার্মানির গার্ড মুলার বেছে নিলেন সেই ১৩ নম্বর জার্সিই। ১৯৫৮ সালে জাস্ট ফন্টেইনের ১৩ গোলের রেকর্ড ছোঁয়ার লক্ষ্য ছিল তাঁর। রেকর্ড ছোঁয়া না হলেও ১৩ নম্বর জার্সি গায়ে দিয়ে ১০ গোল করে ঠিকই আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন ‘দ্য বোম্বার’।

হাত বাড়াল আর্জেন্টিনা

ব্রাজিলের গোলরক্ষক ফেলিক্স মিয়েনি ভেনেনান্দোর হাত দুটি ছিল বেশ বড়। মেক্সিকো গিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন, তাঁর সাধের পুরোনো গ্লাভস জোড়া একেবারেই ক্ষয়ে গেছে। স্থানীয় স্পোর্টসের দোকানগুলোতে হন্যে হয়ে খুঁজেও নিজের দানবীয় হাতের মাপে কোনো গ্লাভস পেলেন না। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে এমন খালি হাতে তো আর ব্রাজিলের গোলপোস্ট পাহারা দেওয়া যায় না! বেগতিক দেখে আসরে নামতে হলো ব্রাজিলিয়ান কূটনীতিবিদদের। খোদ ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করে শুরু হলো ‘অপারেশন গ্লাভস’। মেক্সিকো থেকে জরুরি বার্তা পাঠানো হলো লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে—‘যেকোনো মূল্যে ফেলিক্সের হাতের মাপের পেশাদার গ্লাভস চাই!’

ব্রাজিলের গোলরক্ষক ফেলিক্স মিয়েনি ভেনেনান্দো।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যেন দেবদূতের মতো বার্তা পাঠাল বুয়েনস এইরেসের ব্রাজিলিয়ান কনস্যুলেট। জানা গেল, আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি গোলরক্ষক আমাদিও কারিজোর কাছে ফেলিক্সের মাপের বেশ কয়েক জোড়া নতুন গ্লাভস মজুত আছে। কারিজো তো একবাক্যে রাজি! বুয়েনস এইরেসের কূটনৈতিক হেডকোয়ার্টারের এক বিশেষ দূত তড়িঘড়ি করে কারিজোর কাছ থেকে চার-চার জোড়া গ্লাভস নিয়ে প্রথম ফ্লাইটে মেক্সিকোর বিমানে তুলে দিলেন।

আর্জেন্টিনা সেবার বাছাইপর্ব পার হতে না পারায় ফুটবলাররা টিভিতে খেলা দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে সেই দুঃখ ভুলে কারিজো ঠিকই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের গোলরক্ষকের ‘হাত’ শক্তিশালী করেছিলেন!

তোস্তাওয়ের চোখের জল

ব্রাজিল ফরোয়ার্ড তোস্তাও

ব্রাজিলের তোস্তাও মেক্সিকোতে গিয়েছিলেন প্রায় অলৌকিকভাবে। আগের বছর ক্লাব ম্যাচে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার দিতাওয়ের জোরালো শটে তাঁর বাম চোখের রেটিনা ছিঁড়ে যায়। হিউস্টনে পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচারের পর তিনি মাঠে ফেরেন। ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে কার্লোস আলবার্তোর করা চতুর্থ গোলটি তোস্তাও চোখ দিয়ে দেখতে পাননি। চোখের সমস্যার জন্য নয়, আনন্দের অশ্রুর জন্য! তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘জেয়ারজিনহোর তৃতীয় গোলের পরেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম আমরা জিতে গেছি। আমি আনন্দে কাঁদতে শুরু করি। শেষ ১৫ মিনিট আমি ঝাপসা চোখে খেলেছি।’ ৪-১ গোলে ইতালিকে হারানোর পর হিউস্টনে গিয়ে সেই সার্জনকে নিজের সোনার মেডেলটি উপহার দেন তোস্তাও। ফুটবল ছাড়ার পর তোস্তাও চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি নেন। তাঁর স্পেশালিটি কী ছিল জানেন? চক্ষু!