ইয়েমেনের রাজধানী সানায় ৬ মার্চ ইরান ও লেবাননের প্রতি সংহতি জানিয়ে হুতি সমর্থকদের মিছিলে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবিসংবলিত পোস্টার মাথায় এক বিক্ষোভকারী
ইয়েমেনের রাজধানী সানায় ৬ মার্চ ইরান ও লেবাননের প্রতি সংহতি জানিয়ে হুতি সমর্থকদের মিছিলে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবিসংবলিত পোস্টার মাথায় এক বিক্ষোভকারী

ইরানের মিত্র হুতিরা কেন এখনো যুদ্ধে জড়ায়নি

ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর পর এই অঞ্চলের যুদ্ধে যোগ দিয়েছে লেবানন ও ইরাকে থাকা ইরানের শিয়া মিত্ররা। তবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা এখনো এ সংঘাতে সরাসরি জড়ায়নি। আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত গোষ্ঠীটি আরব উপদ্বীপের আশপাশে নৌ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটানো এবং উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে।

কারা এই হুতি

হুতিরা মূলত উত্তর ইয়েমেনভিত্তিক সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় একটি গোষ্ঠী। হুতি পরিবারের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীটি শিয়া ইসলামের ‘জায়েদি’ মতাদর্শ অনুসরণ করে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে গেরিলা যুদ্ধ করার ইতিহাস রয়েছে হুতিদের। তবে ২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’–পরবর্তী সময়ে তারা নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করতে শুরু করে। এ সময় তারা ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে।

২০১৪ সালে ইয়েমেনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে গোষ্ঠীটি দেশটির রাজধানী সানা দখল করে নেয়। পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৫ সালে হুতিদের হটাতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে আরব দেশগুলোর একটি জোট সামরিক অভিযান শুরু করেছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে নিজেদের সক্ষমতার জানান দেয় হুতিরা।

কয়েক বছরের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত ইয়েমেনে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করেছে। পরে ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়, যা এখন পর্যন্ত কার্যকর রয়েছে।

লোহিত সাগরে হামলা

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের হামলার পর গাজায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এর প্রতিবাদে ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে হুতিরা। তারা ইসরায়েল লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রও ছোড়ে।

জবাবে ইসরায়েল হুতিদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালায়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও হুতিদের ওপর হামলা চালায়। তবে ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে হুতিরা তাদের হামলা বন্ধ করে।

কেন তারা যুদ্ধে জড়ায়নি

৫ মার্চ হুতি নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি বলেন, তাঁর গোষ্ঠী যেকোনো মুহূর্তে হামলা চালাতে প্রস্তুত। টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘সামরিক তৎপরতা ও অভিযানের প্রশ্নে আমাদের আঙুল যেকোনো মুহূর্তে ট্রিগারেই থাকবে, যদি পরিস্থিতির তেমন প্রয়োজন পড়ে।’

তবে লেবাননের হিজবুল্লাহ বা ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মতো হুতিরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার কোনো ঘোষণা দেয়নি। ধর্মীয় মতাদর্শের ক্ষেত্রেও হিজবুল্লাহ বা ইরাকি গোষ্ঠীগুলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে যেভাবে অনুসরণ করে, হুতিরা ঠিক সেভাবে করে না।

ইরান হুতিদের তাদের আঞ্চলিক ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বা ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর অংশ হিসেবে তুলে ধরলেও ইয়েমেন বিশেষজ্ঞরা অন্য কথা বলছেন। তাঁদের মতে, ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে রাজনৈতিক মিল থাকলেও হুতিদের তৎপরতা মূলত তাদের অভ্যন্তরীণ এজেন্ডা বা উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হিজবুল্লাহর সহায়তায় ইরান হুতিদের অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দেয়। তবে হুতিরা ইরানের ‘প্রক্সি’ বা তল্পিবাহক হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, তারা নিজেরাই নিজেদের অস্ত্র তৈরি করে।

হুতিরা কী করতে পারে

অস্থির প্রকৃতির গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত হুতিদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

কিছু কূটনীতিক ও বিশ্লেষক মনে করেন, হুতিরা হয়তো এরই মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু হামলা চালিয়েছে। তবে রয়টার্স এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।

অন্য বিশ্লেষকদের মতে, হুতিরা আসলে মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায় নিজেদের শক্তি জমিয়ে রাখছে। তারা ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে এমন এক সময়ে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে পারে, যখন সর্বোচ্চ চাপ তৈরি করা সম্ভব হবে।

বিশেষ করে জ্বালানি রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ যদি কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং লোহিত সাগরের ওপর নির্ভরতা অনেক বেড়ে যায়, তবে হুতিরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

তবে ভিন্নমতও রয়েছে।

কিছু বিশ্লেষক বলছেন, হুতিরা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ থেকে পুরোপুরি দূরে থাকার সিদ্ধান্তও নিতে পারে। কারণ হিসেবে তাঁরা ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট এবং যুদ্ধে জড়ালে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, এমনকি সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তীব্র হামলার আশঙ্কার কথা বলছেন।