
দেশের অগ্রগণ্য সাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই। তাঁর বিচরণ শিল্প-সাহিত্যের বহুমাত্রিক শাখায়। আগামী মে মাসে ৯০ বছরে পদার্পণ করবেন তিনি। ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোর এবারের আয়োজনে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক। দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে নিজের জন্ম, বেড়ে ওঠাসহ জীবনের নানা বাঁকের অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছেন লেখালেখিতে এখনো সক্রিয় হাসনাত আবদুল হাই।
আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি ক্রাউন সিমেন্ট ‘অভিজ্ঞতার আলো’য়। এ অনুষ্ঠানে আমরা বাংলাদেশের অগ্রগণ্য অগ্রজদের কথা শুনি। আজ আমি খুবই আনন্দিত ও সম্মানিত বোধ করছি যে বাংলাদেশের অগ্রগণ্য কথাসাহিত্যিক, বাংলাদেশ সরকারের জ্যেষ্ঠ সচিব এবং নানাভাবে আমাদের অগ্রজ, দেশের অন্যতম পথিকৃৎ কণ্ঠস্বর, বাংলাদেশের বিবেকের কণ্ঠস্বর হাসনাত আবদুল হাইয়ের পাশে আমি এসে বসতে পেরেছি।
স্যার, আপনাকে প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজন ‘অভিজ্ঞতার আলো’য় স্বাগত জানাচ্ছি। এ অনুষ্ঠানে আমরা জীবনের কথা শুনি। আপনার ক্ষেত্রেও তা–ই করব। আমরা আপনার জন্ম থেকেই শুরু করব। তো, এই বইয়ে দেখতে পাচ্ছি, লেখা আছে, জন্ম কলকাতা ১৭ মে ১৯৩৯। আবার আমরা জানি যে আপনি ৮৯-৯০–এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাহলে আপনার আসল জন্মসালটা কত?
হাসনাত আবদুল হাই: না, আমাদের সময়ে ব্রিটিশ শাসনে চাকরি পাওয়া মুসলমানদের জন্য খুব কঠিন ছিল। এ জন্য প্রত্যেক বাবা ছেলেমেয়ের বয়স দুবছর কম দেখাতেন।
অনেক সময় স্কুলের শিক্ষকেরাও ফরম পূরণ করার সময় এটা করে দিতেন।
হাসনাত আবদুল হাই: হ্যাঁ, দুবছর কম দেখাতেন। ওই, চাকরি যেন পেতে পারে, এ জন্য। তো ওই হিসাবে আমারও ’৩৯ দেখিয়েছে, কিন্তু আসলে আমার জন্ম ১৯৩৭ সালে।
তাহলে স্যার, আপনার জন্ম ১৯৩৭ সালে এবং মে মাসে।
হাসনাত আবদুল হাই: মে মাসে।
তার মানে আর এক বছর পরে...
হাসনাত আবদুল হাই: এক বছর নয়, দুই মাস পরই ৯০ বছর হবে।
এটা তো ’২৬, হ্যাঁ মানে ৮৯ পূর্ণ হবে। ৯০তম বছরে আপনার পদার্পণ হবে।
হাসনাত আবদুল হাই: হ্যাঁ, ৯০ বছরে পড়ব।
আপনার জন্ম হয়েছিল কলকাতায়, কিন্তু শৈশবের প্রথম স্মৃতি আপনার মনে আছে রানাঘাটের। তা–ই তো স্যার?
হাসনাত আবদুল হাই: হ্যাঁ।
ওই সময়ের খুব সুন্দর কিছু স্মৃতি এই বইয়ে আছে। যেমন ওই জাপানি বোমা; আরও কিছু কি আপনার মনে পড়ে?
হাসনাত আবদুল হাই: হ্যাঁ, আমার প্রথম যে স্মৃতি, সেটা রানাঘাটেই। এর আগের কথা আমার মনে নেই। রানাঘাটে আমার তিন কি চার বছর বয়স হবে। আমার আব্বা ওখানে থানার দারোগা ছিলেন। ওখানে ওই থানার পাশেই আমাদের বাসা ছিল। একতলা বাসা। ওই বাসায় একটা জানালা ছিল। আমি যেহেতু ছোট, এ জন্য আমার বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওই জানালার পাশে শিক ধরে বাইরে তাকিয়ে দেখতাম। বাইরে তাকিয়ে থাকা একটা ক্যালাইডোস্কোপের মতো। মানে দিনের বিভিন্ন প্রহরে ওখানে দৃশ্য বদলে যাচ্ছে। যেমন সকালে, বাড়ির সামনে একটা পাকা ইঁদারা ছিল; ওখানে একধরনের লোক আসে, তারা গোসল করে চলে যায়। তারপর দুপুরের পর দেখি মেয়েরা আসে। তারা এসে কাপড় কাচে, ঘরে নিয়ে যায়। এ–ই। তো আমি আমার বড় বোনকে জিজ্ঞেস করি, মেয়েরা সকালে আসে না কেন? বোন বলল, ‘না, পুরুষদের আগে আসতে হয়! পুরুষেরা আগে আসবে, তারপর মেয়েরা আসবে।’ সেই প্রথম আমার একটা জ্ঞান হলো যে বিভিন্ন ব্যাপারে মেয়েদের স্থান পুরুষের পরে। তো ওই জানালা দিয়ে আমি দেখতাম, নানা ধরনের লোক আসত। একটা লোক খুব কাশত। আমি বললাম, ও কাশে কেন? বোন বলল, ‘ওর যক্ষ্মা হয়েছে।’ যক্ষ্মা কী? বলল, ‘রাজরোগ।’ রাজরোগ কী? বলল, ‘রাজরোগ হলো যেটা রাজারাজড়া ছাড়া কেউ চিকিৎসা করাতে পারে না।’
একদম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর...
হাসনাত আবদুল হাই: একেবারে ডাকঘরের মতো। আমার ওই জানালা দিয়েই আমি সব দেখেছি। দুর্ভিক্ষ দেখেছি, যক্ষ্মা রোগী দেখেছি। দেখেছি, থানার সামনের রাস্তা দিয়ে স্বদেশিরা পতাকা নিয়ে ‘কুইট ইন্ডিয়া’ বলে মিছিল করে আসছে। তারপর দেখেছি, হঠাৎ একদিন আমাদের বাড়ির সামনের মাঠে খুব পোশাক–পরিচ্ছদে সুসজ্জিত নরনারী। আমি বললাম, এরা কারা? বলল, ‘এরা কলকাতা থেকে এসেছে। ওখানে জাপানিরা বোমা ফেলছে।’ জাপানিরা বোমা ফেললে কী হয়? ‘বোমা ফেললে মারা যায়।’ তখন আমি জানালাম যে মানুষ যক্ষ্মায় মারা যায়, মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যায়, মানুষ বোমা পড়লে মারা যায়। তো, ওই আমার ছোটবেলায় এই সব জ্ঞান হয়েছে। ওই জানালা দিয়ে দেখেই আমার এই সব জ্ঞান হয়েছে।
তারপরে স্যার, আপনার আব্বার পুলিশের চাকরি; কিন্তু বদলি চাকরি ছিল।
হাসনাত আবদুল হাই: বদলি চাকরি।
আপনার প্রথম স্কুল কি নড়াইল মক্তব ১৯৪৩ সালে?
হাসনাত আবদুল হাই: নড়াইল মক্তব।
মানে আব্বা বদলি হয়ে নড়াইলে চলে গেলেন।
হাসনাত আবদুল হাই: আব্বা নড়াইলে গেলেন। নড়াইলে ইন্সপেক্টর হয়ে গেলেন। ওখানে পাশেই ছিল হাইস্কুল। সেখানে আমার বড় দুই ভাইকে ভর্তি করালেন। কিন্তু আমাকে ওখানে ভর্তি না করিয়ে মক্তবে ভর্তি করালেন। আমি পরে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আমাকে পাশের স্কুলে না পড়িয়ে মক্তবে কেন পড়ালেন? তিনি বললেন, ‘দেখো, আমাদের যে মুসলিম ঐতিহ্য তাহজিব, এটা আমরা হারিয়ে ফেলছিলাম। যেমন তোমার বড় ভাইদের আমি যখন চিঠি লিখি, শ্রীমান আবদুল হান্নান লিখি। তুমি বড় ভাইকে যখন ডাকো, বড়দা বলো। এগুলো হয়ে গেছে, কেননা আমরা এই সমাজের মধ্যে এসেছি। তো আমাদের যে আইডেন্টিটি, এটাও অন্তত কিছুটা ধরে রাখার জন্য আমি চাই যে আমাদের ছেলেমেয়েরা অন্তত মক্তবে পড়ুক। তারপর তারা হাইস্কুলে পড়বে।’
এমনিতে আপনার দাদার বাড়ি তো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।
হাসনাত আবদুল হাই: দাদার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানায়।
আর এই যে মনিঅন্ধ পাঠশালা...
হাসনাত আবদুল হাই: মনিঅন্ধ হলো নানাবাড়ি।
হাম্মাদিয়া হাইস্কুল; এটা ঢাকায়।
হাসনাত আবদুল হাই: ঢাকা।
১৯৪৬–৪৭; তখন আপনার বয়স ১০ হয়ে গেছে।
হাসনাত আবদুল হাই: হ্যাঁ, ঠিক পাকিস্তান হওয়ার ছয় মাস আগে আমরা কলকাতা থেকে বদলি হয়ে আসি। আমাদের বাড়ির সামনেই ছিল হাম্মাদিয়া স্কুল আর পেছনে আরমানিটোলা। আমাকে হাম্মাদিয়ায় ভর্তি করল। আমার এটা পছন্দ হয় নাই। ওটা মাদ্রাসার মতো। আমি আব্বাকে পরে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে আমাকে আরমানিটোলায় ভর্তি না করে ওখানে কেন ভর্তি করালেন? আব্বা বললেন, ‘দেখো, তখন ঢাকায় রায়ট হচ্ছিল। তুমি স্কুলে যাবে, রাস্তায় কে তোমাকে ছুরি মেরে বসবে, মেরে ফেলবে! এটা আমি কি করে সহ্য করব? এ জন্য বাড়ির সামনে নিরাপদ। তুমি দৌড় দিয়ে চলে আসতে পারবে। এ জন্য তোমাকে ভর্তি করিয়েছি।’
যশোর একাডেমিতে ছিলেন ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯, মানে ১০ থেকে ১২ বছর। ফরিদপুর জিলা স্কুলে ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৪; এইটার স্মৃতি থাকার কথা।
হাসনাত আবদুল হাই: হ্যাঁ, ওটাই সবচেয়ে; না, সব স্মৃতিই আমার আছে। যশোরের স্মৃতিও খুব ভালো আছে। যশোরে গিয়ে আমরা যেখানে ছিলাম, স্টেশন রোড। ওটাই ওদের মেইন রোড। থানা থেকে কালীমন্দির থেকে স্টেশনে গেছে স্টেশন রোড। ওই রাস্তার পাশে একতলা–দোতলা বাড়ি ছিল। আমাদের বাড়িটা এক হিন্দু উকিলের। রিকুইজিশন করে আমরা ওখানে থাকলাম। আব্বা ওখানে অ্যাডিশনাল এসপি হলেন। ওখানে আশপাশের সব পরিবার হিন্দু। ওখানে আমার যারা বন্ধু হলো, সবাই হিন্দু। ওদের জন্যই আমার বই পড়ায় আগ্রহ হলো। কেননা ওরা পাড়ায় পাড়ায় বইয়ের লাইব্রেরি করত। আমি ওই লাইব্রেরির সদস্য হলাম। সেখানে প্রতিযোগিতা চলত, কে কোন বই পড়ে শেষ করল। আমরা ওখানে ‘মোহন সিরিজ’ শুরু করলাম। ‘মোহন সিরিজ’ শেষ করে আমরা চলে গেলাম অ্যাডাল্টে। অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্তর বেদে, তারপর সুশীল জানার বই, তারপর মনোজ বসুর বই—এই সব বই আমরা স্কুলে থাকতে পড়া শুরু করেছি। এটা আমার হিন্দু বন্ধুরা ছাড়া আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। সুতরাং আমার এই যে বই পড়ার অভ্যাস, এটার জন্য আমি আমার হিন্দু বন্ধুদের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। বই পড়েই আমি লেখক হয়েছি। সুতরাং আমার লেখক সত্তার পেছনেও আমার হিন্দু বন্ধুদের অবদান আছে।
ফরিদপুর জিলা স্কুলে এসে আপনি দেয়ালপত্রিকা করেছিলেন?
হাসনাত আবদুল হাই: জিলা স্কুলে এসে প্রথমবার আমি একটা ভালো স্কুলে পড়লাম। এর আগে আমি কোনো ভালো স্কুলে পড়ি নাই। কিন্তু আমি গেলাম বছরের মাঝামাঝি। হেডমাস্টার বললেন, ‘মাঝামাঝি হবে না। তুমি অন্য স্কুলে যাও।’ আমি বললাম, ‘স্যার, আমি যে স্কুল থেকে এসেছি, সেখানে আমি ফার্স্ট বয় ছিলাম।’ তিনি হেসে বললেন, ‘ওটা তো জিলা স্কুল ছিল না।’ আমি বললাম, ‘স্যার, আমি জিলা স্কুলেরও ফার্স্ট বয় হব।’ তিনি আমার দিকে তাকালেন। তাকিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা, এটার বাংলা থেকে ইংরেজি করো। ছেলেরা রৌদ্রে দৌড়াদৌড়ি করিতেছে।’ আমি বললাম, ‘বয়েজ আর রানিং অ্যাবাউট ইন দ্য সান।’ হেডমাস্টার অ্যাডমিট লিখে দিলেন, আমার উত্তর শুনে। কেননা ওটাই সঠিক উত্তর ছিল। রানিং অ্যাবাউট। আমি যদি অ্যাবাউট না বলতাম, তাহলে হতো না। ছয় মাস পর বার্ষিক পরীক্ষায় আমি ফার্স্ট হলাম। ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে উঠলাম। এরপর কোনো ক্লাসের পরীক্ষায় আমাকে কেউ দ্বিতীয় করতে পারেনি। বাইরে থেকে অনেক নতুন ছাত্র গিয়েছিল। এই তোমার মতির স্ত্রীর যে ছোট ভাই হালিম, ও আমার ক্লাসফ্রেন্ড। ও এল। ও ফার্স্ট বয়। আমাকে সবাই বলল, ‘এবার তো তুমি পারবে না।’ পারল না। কাজী জামান হাসিল বলে একজন এল; রাজবাড়ীর এসডিওর ছেলে। সে ভর্তি হলো। সে ফার্স্ট বয়। সবাই বলল, ‘এবার তো তুমি পারবে না।’ আমাকে কেউ হারাতে পারেনি। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় চারটা লেটার পেয়ে আমি সিক্সথ হয়েছি। ফার্স্ট হতে পারতাম, যদি আমার অ্যাডিশনাল সাবজেক্ট বিজ্ঞান না হয়ে অঙ্ক হতো। বিজ্ঞানে ওরা লেটার মার্ক দেয় না। আমাকে ৬০–৬৫ দিয়েছে। অঙ্ক পেলে আমি অনায়াসে ৮০–র ওপরে পেতাম। যা–ই হোক, এইভাবে আমি জিলা স্কুলে পড়েছি। ওখানে শেষের এক বছর হোস্টেলে ছিলাম। কেননা আব্বা তখন নোয়াখালীতে বদলি হয়ে গেলেন এসপি হয়ে। আমাকে হেডমাস্টার বললেন, ‘তোমাকে তো আমরা ছাড়তে চাই না। তুমি তো স্ট্যান্ড করবে।’ আমি বললাম, ‘আব্বাকে বলেন।’ আব্বা বলল, ‘তুমি থাকতে পারবে? তুমি তো কোনো দিন একা থাকোনি। হোস্টেলে থাকতে পারবে?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ পারব।’ তো, হোস্টেলে থাকলাম। সে হোস্টেলের জীবনও খুব বিচিত্র জীবন। খুব কড়া। আমাদের যে সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন, তিনি খুবই কড়া। সন্ধ্যার পর বাইরে যাওয়া যাবে না। কিন্তু আমার খুব সিনেমা দেখার শখ। আমার আরেকজন রুমমেট ছিল, সালাম। আমরা একদিন করলাম কি, আমাদের বেড়া ছিল…। আমরা অন্যদের বললাম, ‘দেখো, আমরা আগুন লাগাব। আগুন লাগিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নিভিয়ে ফেলব। তারপর আমরা পালিয়ে যাব। তোমরা সুপারিনটেনডেন্টকে বলবে যে ওরা ভয় পেয়ে চলে গেছে।’ আমরা গিয়ে সিনেমা হলে ‘দাগ’ সিনেমা দেখছি, দিলীপ কুমারের গান হচ্ছে… ‘অ্যায় মেরে দিল কহি কাজ...’ আমরা গান শুনে এসে ৯টার সময় পুকুরপাড়ে ঘাটলায় বসে আছি। পূর্বপ্রস্তুতি অনুযায়ী। অন্য ছাত্ররা গিয়ে বলল, ‘স্যার, ওরা এসেছে। ওরা ওখানে বসে আছে।’ আমাদের সুপারিনটেনডেন্ট এসে বলেন, ‘ঠিক আছে, এ রকম অ্যাক্সিডেন্ট হয়। তো ভবিষ্যতে...’ উনি টেরই পেলেন না যে আমরা সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম।
আপনি ’৫৪ সালে ম্যাট্রিক পাস করলেন। মানে ’৫২ সালে আপনি জিলা স্কুলেই পড়েন।
হাসনাত আবদুল হাই: হ্যাঁ। জিলা স্কুলে ’৫২ সালে ঢাকায় একটা জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় আমাদের আসার কথা। আমি বাংলায় আর আসাফউদ্দৌলা ইংরেজিতে। আমরা স্কুল থেকে আসব। এ সময় শোনা গেল যে ঢাকায় গুলি হয়েছে। আমরা স্কুল থেকে সব বেরিয়ে গেলাম। স্কুল করলাম না। সারা শহরে মিছিল করলাম, স্লোগান দিলাম। ’৫২ সালে ফরিদপুরে, অন্যান্য শহরেও হয়তো হয়েছে, ফরিদপুরে আমরা ছাত্ররা স্কুল করিনি, আমরা বিক্ষোভ মিছিল করেছি।
ভাষা আন্দোলনে যোগ দিলেন। তারপর ঢাকা কলেজ থেকে আপনার উচ্চমাধ্যমিক।
হাসনাত আবদুল হাই: হ্যাঁ, ঢাকা কলেজ। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েই আমি চলে আসি। আব্বা তখন বদলি হয়ে ঢাকায় এসেছেন। উনি এসপি। আমরা লালবাগে একটা বাড়িতে থাকতাম আজাদ অফিসের উল্টো দিকে। ওখানে একটা ফায়ার ব্রিগেডের অফিস ছিল। ওই ফায়ার ব্রিগেডের অফিসের পাশে একটা একতলা দালান। ওখানে আমরা থাকতাম। তখন ঢাকা কলেজ ছিল ফুলবাড়িয়ায়। আমরা যেতাম হেঁটে হেঁটে। আমি, আমার ফ্রেন্ড মেহেদী, ও মারা গেছে; মনসুর, সেও মারা গেছে। আমরা হেঁটে হেঁটে আগামসি লেনটেন হয়ে ওখানে যেতাম।
আপনার স্মৃতির ওই ঢাকা তো খুব সুন্দর ছিল নিশ্চয়ই?
হাসনাত আবদুল হাই: ঢাকা সুন্দর মানে, এই অর্থে যে খুব শান্ত পরিবেশ ছিল। গাড়িঘোড়ার ভিড় ছিল না। ট্রাফিকের নয়েজ ছিল না, দূষণ ছিল না। লোকজন খুব ভদ্র ছিল। মেয়েরা নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরা করত। তারা শাড়ি পরেই আসত, রিকশা করে যেত। কোনো দিন তাদের কোনো টিজিংয়ের মুখোমুখি হতে হয়নি। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
ফুলবাড়িয়া–গুলিস্তান, বড়জোর পুরানা পল্টন—এই পর্যন্তই তো ঢাকা ছিল, স্যার?
হাসনাত আবদুল হাই: হ্যাঁ, এই পর্যন্তই ছিল। এদিকে ছিল নতুন ঢাকা, যেখানে ধানমন্ডি। তখনো হয় নাই যখন... মেডিকেল কলেজ হয়েছে, কার্জন হল হয়েছে, তারপর বঙ্গভঙ্গের পর সলিমুল্লাহ হল হয়েছে। তারপর আবাসিক ডেভেলপমেন্ট—এগুলো। পাকিস্তানের পরে আজিমপুর দিয়ে শুরু হলো। আজিমপুর, মতিঝিল—এগুলো দিয়ে শুরু। তারপর ধানমন্ডি এল। তারপর মোহাম্মদপুর হলো, এ–ই।
তারপরে আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে...
হাসনাত আবদুল হাই: তখন ঢাকায় আমাদের হেঁটে হেঁটে যেমন…বিকেলে আমাদের দুটো রিক্রিয়েশন ছিল। একটা রিক্রিয়েশন ছিল নিউমার্কেট হয়েছে; নিউমার্কেটে গিয়ে আমরা চক্কর দিতাম। এই চক্কর দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, মেয়েরা যদি কিনতে আসে, মেয়েদের দেখা। এ জন্য আমরা চক্কর দিতাম। আরেকটা রিক্রিয়েশন ছিল যে আমি তখন এসএম হলে থাকি, আমরা হেঁটে হেঁটে জিন্নাহ অ্যাভিনিউয়ে যেতাম। জিন্নাহ অ্যাভিনিউয়ে গিয়ে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে; রেলিং ছিল ফুটপাতে, গুলিস্তানের উল্টো দিকে, যেখানে বেবি আইসক্রিম ছিল, তারপরে কয়েকটা রেস্টুরেন্ট ছিল, একটা রেস্টুরেন্ট ছিল গলির মধ্যে, বেবি নাকি স্টার; ওখানে কাবাব পরোটা হতো। আমরা বিকেলে গিয়ে ওখানে দাঁড়াতাম। দেখতাম যে ট্রাফিক যাচ্ছে, গাড়ি যাচ্ছে। আর যেদিন পকেটে থাকত, আমরা ওই শামি কাবাব আর পরোটা খেতে যেতাম। এ–ই ছিল আমাদের রিক্রিয়েশন।
আপনার সাহিত্যচর্চা বগুড়ায়। ফরিদপুর জিলা স্কুল বার্ষিকী দিয়ে শুরু হলো?
হাসনাত আবদুল হাই: না, বার্ষিকী না। ক্লাস সেভেনে থাকতেই হাতে লিখে একটা পত্রিকা বের করি আমরা। আমাদের ওপরের ক্লাসে হালিমের বড় ভাই ছিল। সে বোধ হয় পরে ডাক্তার হয়েছে। ডাক্তার মুক্তাদির তো আর্টিস্ট হয়েছে। মুক্তাদিরও ওর এক ভাই। ওরা অনেক ভাই। যা–ই হোক, ওরা একটা হাতে লেখা পত্রিকা করল। হালিম বলল, ‘আমাদেরও একটা করতে হয়।’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, করি।’ তো আমি ওটা লিখলাম। আমি সম্পাদক...
হালিম সাহেব, আবদুল হালিম; উনি মার্ক্সবাদের অ আ ক খ—এই সব বই লিখেছিলেন পরে?
হাসনাত আবদুল হাই: না। ও ম্যাথমেটিকসের প্রফেসর ছিল। লেখালেখি করত না। বই পড়ত অনেক। ও বামপন্থী। ওর পুরো পরিবার বামপন্থী ছিল। ওর বড় ভাই তো ফাইন্যান্স সেক্রেটারি হয়েছিল। হ্যাঁ।
তো আপনি ওই হাতে লেখা পত্রিকায় লিখলেন জিলা স্কুলে, পরে জিলা স্কুলের বার্ষিকীতে লিখলেন। ঢাকা কলেজ বার্ষিকীর আপনি যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন।
হাসনাত আবদুল হাই: যুগ্ম সম্পাদক ছিলাম।
এরপর সলিমুল্লাহ হলের বার্ষিকীরও আপনি সম্পাদক ছিলেন। আর আপনার স্মৃতিকথার মধ্যে পড়লাম যে জহির রায়হান দেয়ালপত্রিকা করেছিলেন সেসব কথা একটু...
হাসনাত আবদুল হাই: হ্যাঁ, আমরা যখন ইউনিভার্সিটিতে গেলাম তো গিয়ে দেখি যে পর্টিকো, মানে সিঁড়িঘরের সামনে যে গাড়িবারান্দা ওখানে দেয়ালে একটা দেয়ালপত্রিকা, সেখানে সাহিত্য, গল্প, কবিতা এই সব আছে। জহির রায়হান ওটার সম্পাদক। তো আমরা জহির রায়হানকে বললাম, জহির ভাই, আমাদের লেখা...বলেন, ‘না না, এটা ছোট জায়গা, এখানে আর নতুন দেওয়া যাবে না, তোমরা আলাদা করো।’ তখন আমি এবং আমাদের কয়েকজন বন্ধু মুস্তাফা জামান আব্বাসী, মনসুর আহমেদ—আমরা মিলে এনামুল হক জাদুঘরের পাশে আরেকটা করলাম, ওটারও আমি সম্পাদক হলাম। দেয়ালপত্রিকার।
আপনার প্রথম প্রকাশিত ভ্রমণকাহিনি দৈনিক আজাদে ১৯৫৫ সালে। প্রথম প্রকাশিত ছোটগল্প ১৯৫৭ সালে। প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘অরণ্যনগর’১৯৫৯ সালে। আপনার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ হলো ১৯৬০ সালে। তার মানে আপনি প্রথম উপন্যাস যখন করেছেন তখন আপনি ছাত্র।
হাসনাত আবদুল হাই: তখন ছাত্র, আমি দুটো উপন্যাস লিখেছি ‘অরণ্যনগর’ আরেকটা হলো ‘ছায়া সঙ্গিনী’ বোধ হয়। এই দুটো উপন্যাস লিখেছি আমি ছাত্র হিসেবে। একটা বেরিয়েছিল একটা সাহিত্য পত্রিকায়, আরেকটা বেরিয়েছিল একটা সিনেমা পত্রিকায়। এই দুটো উপন্যাস লিখেছি।
তবে স্যার আপনি তো ভালো ছাত্র, ফার্স্ট–সেকেন্ড হন না, এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো ইকোনমিকস নিয়ে পড়লেন। আপনি এই বাংলা সাহিত্যের মধ্যে যুক্ত হলেন, এই আগ্রহটা কোথা থেকে পেলেন, প্রেরণাটা?
হাসনাত আবদুল হাই: ওই পড়া থেকে। ওই যে আমি ছেলেবেলায় বইপড়া শুরু করলাম। আমার প্রথম বইপড়া হলো ভূপর্যটক রমানাথ বিশ্বাসের ‘লাল চীন’। এইটা আমার প্রথম পড়া, আমি তখন ক্লাস ফোর কি ফাইভে পড়ি, ঢাকায়। এরপর পড়লাম ‘তৈমুর লংয়ের দেশে’। ‘তৈমুর লংয়ের দেশে’ এটা পড়লাম। তারপরে তো যশোরে গিয়ে ‘মোহন’ সিরিজ অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত, হেমেন্দ্র কুমার রায়, পাঁচকড়ি দে, যত ডিটেকটিভ বই— এই সব ডিটেকটিভ বইটই পড়লাম। তারপরে তো অ্যাডাল্টদের যে উপন্যাস...
তো স্যার আপনার কখনো মনে হয়নি যে আপনি সাহিত্যিক হওয়ার জন্য ছন্নছাড়া জীবন যাপন করবেন? কাজী নজরুল ইসলামের মতো, রবীন্দ্রনাথের মতো ফেল করতে থাকবেন, সেইটাই জীবনের মোক্ষ হওয়া উচিত, কাম্য হওয়া উচিত। কিন্তু আপনি তো অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত, মেধাবী, অধ্যবসায়ী জীবন যাপন করলেন।
হাসনাত আবদুল হাই: না, আমার ও রকম কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। আমরা যখন বই পড়ি, আমি যখন বই পড়ি, তখন আমি লেখক হব, এই ইচ্ছা আমার ছিল না। বই পড়াই একটা আলাদা নেশা ছিল।
কিন্তু প্রথম উপন্যাসটা যখন বেরিয়ে গেল তখনো মনে হলো না যে এই লেখাপড়া, এই সব দরকার নেই?
হাসনাত আবদুল হাই: না, তখন আমাদের সময়ে… এখনো লেখালেখি তো একটা পেশা না। …এখনো না। সুতরাং আমি লেখক হবো, এটা কেউই বলতে পারত না। আমাদের সময়ে বলতে পারে না, এখনো বলতে পারে না। যে আমি এক হুমায়ূন ছাড়া আমাদের দেশে একমাত্র লেখা নিয়ে জীবন যাপন করা, এটা সম্ভব হয়নি। সুতরাং আমি লেখক হবো, এটা কেউ কখনো ভাবতে পারে না। লেখাটা সব সময় একটা বাই প্রোডাক্টের মতো। যে আমার একটা মূল পেশা থাকবে, তার পাশে আমি লিখছি।
হুমায়ূন আহমেদ স্যারকেও নাটক পরিচালনা, প্রযোজনা, এগুলো করেছেন উনি, হয়তো শখ করেই করেছেন।
হাসনাত আবদুল হাই: না। কিন্তু ওগুলো তো সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এরপরে আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে পাস করে বের হয়ে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করতে চলে গেলেন ১৯৬০ থেকে ’৬২।
হাসনাত আবদুল হাই: হ্যাঁ, আমি এমএ পরীক্ষা দিয়েই চলে যাই। এমএ পরীক্ষার রেজাল্ট বের হওয়ার আগেই আমি একটা স্কলারশিপ পাই, ওটা পেয়ে আমি চলে যাই। ওখানে গিয়ে দুবছর আমি মাস্টার্স করি। ওখানে গিয়ে একটা লাভ হলো, বাংলাদেশে ঢাকায় তো সব ইংরেজি পাওয়া যেত না, যেমন ধরো সার্ত্রের একটা বই পেলাম, বাকি বইগুলো পাচ্ছি না। একটা লেখকের যে সব বই পড়ব কেমন তাহলে একটা লেখক সম্পর্কে ভালো একটা ধারণা করা যায় যে এই লেখক এই। তো আমি ঢাকায় বসে কামুর একটা পাচ্ছি, সার্ত্রের একটা পাচ্ছি, আঁদ্রে জিদের একটা পাচ্ছি, ডিএইচ লরেন্স একটা পাচ্ছি, তাদের সব বই পাচ্ছি না। কিন্তু আমেরিকায় গিয়ে আমি ওইভাবে একজন লেখকের…
যে লেখকের নাম বলছেন এরা বেশির ভাগই তো অস্তিত্ববাদী। ওই এই বিষয়ে কি আপনার বিশেষ রকম আগ্রহ আছে?
হাসনাত আবদুল হাই: হ্যাঁ, ওই সময় আগ্রহ ছিল। ওই সময় আগ্রহ ছিল কেননা ওটা তখন একটা ফ্যাশনও ছিল। লেখক হলে অস্তিত্ববাদী হতে হবে, অ্যাবসার্ডিস্ট হতে হবে, এই। তো এটা ছিল একটা।
ছিল, আচ্ছা। এরপরে আপনি চলে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করলেন।
হাসনাত আবদুল হাই: হ্যাঁ, এক বছর পড়ালাম। আমার ইচ্ছা ছিল, কারণ আমি আমেরিকা থেকে এসে কিন্তু দুবছর ইংল্যান্ডে আমি পড়েছি। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে আমি পড়েছি।
সেটা পড়লেন তো ১৯৭৮–৭৯–তে?
হাসনাত আবদুল হাই: ’৬০ থেকে ’৬২।
তাহলে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে কবে পড়লেন?
হাসনাত আবদুল হাই: আগে, ’৬০ থেকে ’৬২।
ওয়াশিংটন?
হাসনাত আবদুল হাই: ওয়াশিংটনে, আর ’৬২ থেকে ’৬৪।
’৬২ থেকে ’৬৪ লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস।
হাসনাত আবদুল হাই: ’৬২ থেকে ’৬৪ লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস। তো ওখানে আমাকে পিএইচডিতে ট্রান্সফার করল; কিন্তু আমার তখন টাকার অভাব হয়ে গেল। তো ওখানে ওসমান গনি সাহেব গেলেন ভাইস চ্যান্সেলর, উনি আমাকে দেখে চেনেন, আমি এস এম হলের জেনারেল সেক্রেটারি ছিলাম। বলেন, ‘হাসনাত, তুমি এখানে কী করছ?’ আমি বললাম, স্যার এখানে তো আমি পিএইচডি করতে চাচ্ছি; কিন্তু আমার তো একটা সমস্যা হয়ে গেল যে ওরা স্কলারশিপ দিচ্ছে না। তো বলেন, ‘তুমি ইয়ে করো, ইকোনমিকস ডিপার্টমেন্টে, আমি জানি ওখানে খালি আছে, তুমি অ্যাপ্লাই করো, তোমার চাকরি হয়ে যাবে। আর চাকরি হয়ে গেলে তুমি পরের বছরই কমনওয়েলথ স্কলারশিপে আসবে।’ তো আমি আসলাম। আসার পরে এক বছরের মধ্যে আমার বাবা–মা দেখলাম যে তাদের ইচ্ছা আমি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিই। কারণ, আমার বড় দুই ভাই তখন শিক্ষক। একজন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে একজন ময়মনসিংহ কলেজে। তো বাবা–মা দেখি বলাবলি করে সব শিক্ষক হয়ে গেল এই। তখন তো সরকারি চাকরির একটা ইয়ে ছিল, স্ট্যাটাস সিম্বল। যে আমার ছেলে সরকারি চাকরি করে। আর সিএসপি হলে তো কথাই নেই। তো আমি বাবা–মার মন রাখার জন্য তাদের খুশি করার জন্য পরীক্ষা দিলাম। ওটাই আমার শেষ পরীক্ষা, শেষ বছর। এরপরে আমার বয়স দেওয়া হতো না। আমি শেষ পরীক্ষা দিয়ে সমস্ত পাকিস্তানে সেকেন্ড হলাম। সমস্ত পাকিস্তানে আমি সেকেন্ড হলাম। তো আমি আমার প্রেফারেন্স দিয়েছিলাম ফরেন সার্ভিস। তো বাবা–মা দেখি মনে মনে বলে, ছেলেটা এল এত দিন পরে, আবার বিদেশে চলে যাবে। তো আমি তারপরে ইন্টারভিউ দেওয়ার সময় বললাম যে স্যার আমার যদি অ্যালাউ করেন আমি ফরেন সার্ভিস থেকে সিভিল সার্ভিস...তো আমাকে সিভিল সার্ভিসে দিল, এই।
প্রথম পোস্টিং কোথায় হলো?
হাসনাত আবদুল হাই: প্রথম পোস্টিং হলো ময়মনসিংহ অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার, ময়মনসিংহ।
তো স্যার আপনার কোনো রিগ্রেট আছে, আপনি যেহেতু লেখক হয়েছেন, খুবই গুরুত্বপূর্ণ লেখক, যদি শিক্ষকতাতেই থাকতেন তাহলে লেখক হিসেবে আরেকটু কদর বেশি পাওয়া যেত?
হাসনাত আবদুল হাই: না, আমার কোনো রিগ্রেট নেই। আমার রিগ্রেট নেই এই জন্য আমি বলেছি যে শিক্ষক হলে আমি হয়তো ইন্টেলেকচুয়ালি আরও আমার অর্জন বেশি হতো। কিন্তু অভিজ্ঞতার দিক দিয়ে ডাইভারসিফায়েড বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার দিক দিয়ে— আমি এই সরকারি চাকরিতে এসে যে অভিজ্ঞতা পেয়েছি, শিক্ষকের অভিজ্ঞতা তার ধারেকাছেও যেত না। লেখক হিসেবে আমার এই অভিজ্ঞতা অনেক কাজে দিয়েছে। আর শিক্ষকতা ছেড়ে এসে আমার যে ইন্টেলেকচুয়াল যে ক্ষতিটা হলো, সেটা আমি পুষিয়ে নিয়েছি আমি আমার যে প্যারেন্ট সাবজেক্ট ইকোনমিকস, তার সঙ্গে আমি সব সময় যোগাযোগ রেখেছি। আমি ইকোনমিকসের বই কিনেছি, পড়েছি এবং ইকোনমিকসে আমি লিখেছি এবং ইকোনমিক জার্নাল ইকোনমিস্ট আমি পড়েছি এবং এখনো পড়ি। এই যে এখানে সব ইকোনমিকসের বই, এদিকে সব ইকোনমিকসের বই। এবং আমি মাসে চারটা এখনো এই ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে ইকোনমিকসের ওপরে ইংরেজিতে কলাম লিখি। তো আমি এইভাবে ইউনিভার্সিটি ছেড়ে এসে আমার যে ইন্টেলেকচুয়াল লাইফ, একাডেমিক লাইফের যে ক্ষতি হয়েছে সেটা আমি এইভাবে পুষিয়ে নিয়েছি।
স্যার, আপনি যখন বিসিএস সিএসপি সিভিল সার্ভিসে যোগ দিলেন ১৯৬৫ সালে তখন তো আইয়ুব খানের আমল। আপনি ছিলেন এস এম হলের ভিপি। তারপর আপনার নিশ্চয়ই একটা প্রগতিশীলতার দিকে আপনার একটা ঝোঁক শেষ পর্যন্ত আমরা দেখি যে আপনি আসলে প্রগতিশীল এবং আপনি একটা সম্প্রীতি সুন্দর একটা বৈষম্যমুক্ত সমাজের স্বপ্নই দেখেন। তো ওই সময়ে এই পরিচয়গুলো আপনাদের চাকরির জন্য কোনো অসুবিধা তৈরি করত না?
হাসনাত আবদুল হাই: না, কোনো অসুবিধা হয়নি। এগুলো এখন কমিউনিস্ট হলে পরে কেউ যদি কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বার হয় চাকরি পেত না। যেমন পেত কিন্তু তাকে সিএসপি করত না। যেমন হালিমের বড় ভাই। হালিমের বড় ভাই উনি সিএসপি হয়েছিলেন; কিন্তু যেহেতু উনি কমিউনিস্ট ছিলেন এই জন্য উনি অ্যাকাউন্টস সার্ভিস পেলেন। অ্যাকাউন্টস সার্ভিস পেলেন।
আপনি তো মানে তখন থেকে আরম্ভ করে আমরা যখন বড় হয়ে ঢাকায় এলাম আশির দশকে তখনো তো আপনি যে সুন্দর সুন্দর বইগুলো লিখছেন সরকারের পক্ষ থেকে ধরেন তখন তো জিয়াউর রহমানের আমল পার হয়ে এরশাদের আমল হলো আপনার তো চাকরিতে কোনো অসুবিধা হয়নি?
হাসনাত আবদুল হাই: না, আমাদের একটা নিয়ম ছিল যে প্রতিটি লেখার জন্য অনুমতি নিতে হবে। আমি কোনো দিন অনুমতি নিইনি। আমি ঝুঁকি নিয়ে অনুমতি ছাড়াই লিখেছি। আমার লেখায় যেখানে একটু সরকারবিরোধী ভাব আছে সেখানে আমি রূপকের আশ্রয় নিয়েছি।
কিন্তু আরজ আলী মাতুব্বর বা নভেরা বা সুলতান বা অন্য আপনার উপন্যাসের মধ্যেও একটা প্রগতির পক্ষে আপনার অবস্থানটা তো বোঝা যায়।
হাসনাত আবদুল হাই: হ্যাঁ, আছে। প্রগতি এবং অসাম্প্রদায়িকতা এই দুটো আমার আদর্শ। যে আমি প্রগতিশীল হতে চাই এবং আমি অসাম্প্রদায়িক হতে চাই।
আপনার ৯০টার বেশি উপন্যাস।
হাসনাত আবদুল হাই: ৯০টার বেশি হবে।
এর মধ্যে আপনি এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন যে জীবনীভিত্তিক উপন্যাসগুলোর জন্য আপনি বেশি সমাদৃত।
হাসনাত আবদুল হাই: হ্যাঁ, এটা ঠিক। কেন এখনো লোকে দেখলে বলে, ও আপনি ‘নভেরা’র লেখক। ‘নভেরা’র পরে যে আমি এত লিখেছি ওগুলো ‘নভেরা’র লেখক, তারপরে বলে ‘সুলতান’–এর লেখক। এই দুটো বই আমার ক্ল্যাসিক হয়ে গেছে বলতে গেলে। প্রতিবছরই এগুলো বিক্রি হয়। হ্যাঁ ক্ল্যাসিক হয়ে গেছে। হ্যাঁ, প্রতিবছরই বিক্রি হয়, প্রতিবছরই আমি রয়্যালটি পাই, এই অন্য উপন্যাসগুলোর জন্য আমি পাই না। এই দুটো বই ক্ল্যাসিক হয়ে গেছে। আমার জন্য না, ওই চরিত্রের জন্য। আমি পুরোপুরি ক্রেডিট নেব না। আমার হয়তো অর্ধেক ক্রেডিট, আমি ওইভাবে উপস্থাপন করেছি। আমার উপস্থাপনাটাও একটা অবদান রেখেছে এই বইটার, এই বই দুটোর জনপ্রিয়তার জন্য। কিন্তু বাদবাকি অন্তত অর্ধেক যে এটার ক্রেডিট, এই ক্রেডিট যায় বিষয়ের জন্য। নভেরা, সুলতান তাদের জন্য। সুতরাং পুরো ক্রেডিট আমি নেব না।
স্যার, আমি তো ওই সত্য ঘটনা অবলম্বনে বা মানুষের জীবন নিয়ে উপন্যাস লেখার চেষ্টা করি। তো আমার কাছে মনে হয় নিজে বানিয়ে লেখাটা জীবনীভিত্তিক বা সত্যভিত্তিক উপন্যাস লেখার চাইতে সহজ।
হাসনাত আবদুল হাই: অনেক সহজ। অনেক সহজ। স্বাধীনতা প্রচুর পাওয়া যায়। হ্যাঁ অনেক স্বাধীনতা থাকে। কল্পনা একেবারে পাখা মেলে দিতে পারে, এখানে কল্পনাকে রাশ ধরে টানতে হয়। কল্পনা যেটা করছি সেটা দেখতে হবে যে ওনার বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না। এটা আমাকে দেখতে হবে। আমি কল্পনা একরকম করছি আর ওনার জীবন অন্য রকম, তাহলে তো হবে না। তো এই যে একটা রেস্ট্রেইন্ট থাকে, একটা শৃঙ্খলা থাকে যে যার জন্য বাইরে যাওয়া যায় না। একটা ডিসিপ্লিন থাকে। জীবনীভিত্তিক তুমি তো নিজেই লিখেছ, তুমি তো এটা জানো। একটা ইয়ে থাকে এবং এটা খুব চ্যালেঞ্জ। এটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু সেভাবে আবার স্যার আমার কাছে একটু অতৃপ্তিও লাগে যে মনে হয় যে আরেকটু স্বাধীনতা নিতে পারলে ভালো হতো, চরিত্রটা আমার মতো তৈরি করতে পারলে ভালো হতো না করে যে আমি বেশি ইতিহাসের বা সত্যের অনুগত থাকতে চাইলাম এটা মনে হয় আমার একটু শিল্পটা কমে গেল।
হাসনাত আবদুল হাই: তাহলে নাম বদলে দিতে হবে। যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেই সময়ে তার যে প্রধান চরিত্র ওটা তো কালীপ্রসন্ন সিংহ। হ্যাঁ। কেমন? হ্যাঁ। কিন্তু ও কালীপ্রসন্ন নাম দেয় নাই। কালীপ্রসন্ন নাম দিলে ওকে দিয়ে আরও অনেক কিছু করিয়েছে, এটা করাতে পারত না। তো তুমিও যদি এইভাবে স্বাধীন হয়ে কল্পনাকে তুমি ইয়ে দিতে চাও পাখা মেলতে দাও তাহলে ওই আসল নাম দেওয়া যাবে না। সেই সময়ে ওই চালাকিটা ও করেছে।
আবার স্যার যে আপনি যখন কল্পনার মধ্য দিয়ে লিখছেন কাল্পনিক চরিত্র, কাল্পনিক সংলাপ, কাল্পনিক কাহিনি, তার মধ্যে তো আসলে স্যার বাস্তবতার ছায়া থাকে।
হাসনাত আবদুল হাই: তা তো থাকবেই। কেননা আমাদের যে কল্পনা, এটা তো রূপকথা না। আমরা যে উপন্যাস লিখি, এটা তো জীবনঘনিষ্ঠ। জীবনেরই একটা অংশ। কিন্তু ওই জীবনটাকে আমি কল্পনা করে নিচ্ছি, কেমন? কিন্তু ওই চরিত্রগুলো তো সায়েন্স ফিকশনের চরিত্র না। ওদের ওরা তো রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে দেখাচ্ছি আমরা। কেমন? সুতরাং ওগুলো বাস্তবঘনিষ্ঠ। আমরা যারা উপন্যাস লিখি কল্পনার ভিত্তিতে, আমরা তো রূপকথা লিখছি না, সায়েন্স ফিকশন লিখছি না। সুতরাং ওগুলো জীবনঘনিষ্ঠ।
এবং সে ক্ষেত্রে একটা কথা বলে যে যতই কাল্পনিক লিখি না কেন সবই হচ্ছে আমারই আত্মজীবনী।
হাসনাত আবদুল হাই: না, তা আমি বলব না। প্রথম উপন্যাসটা আত্মজৈবনিক হয়ে যায়। প্রথম একটা–দুটো হয়। এই জন্য হয়, কারণ তখন নিজের অভিজ্ঞতাটাই সামনে এসে যাচ্ছে। নিজের চরিত্রটাই মূল চরিত্রের মধ্যে এসে যাচ্ছে। কিন্তু এরপরে আর হয় না।
আপনি তো স্যার প্রচুর ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন। ভ্রমণকাহিনি লেখক হিসেবেও আপনি ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তো আপনি আবার কবিতা, জাপানি কবিতা হাইকু বই আছে তো আপনার।
হাসনাত আবদুল হাই: হাইকু লিখেছি।
কোন মাধ্যমটা আপনি আপনার নিজস্ব মাধ্যম, আপনাকে যদি বলা হয় যে ঔপন্যাসিক, ভ্রমণকাহিনি লেখক আর কবি—এই তিনটার যেকোনো একটা পরিচয় বেছে নিতে, আপনি কোনটা নেবেন?
হাসনাত আবদুল হাই: এ ক্ষেত্রে আমার ভূমিকা হলো একটা বাপের মতো। বাবা যে রকম সব সন্তান–সন্ততিকে একইভাবে দেখে, আমিও তাই দেখি। আমার কাছে ভ্রমণকাহিনি, গল্প, উপন্যাস সব সমান। সবই সমান গুরুত্বপূর্ণ। সবই আমার গুরুত্বপূর্ণ। এবং এই গুরুত্বপূর্ণ হওয়াতে একটা লাভ হয়েছে যে আমি খুব তৃপ্তি পাই, সন্তুষ্টি পাই যে আমার যে সৃজনশীলতা এটা এক জায়গায় সীমাবদ্ধ না। এমনকি আমার মননশীলতাও এক জায়গায় সীমাবদ্ধ না। আমি ছড়িয়ে দিয়েছি। আমার যে ক্রিয়েটিভ জিনিয়াস, যদি আমার কিছু থাকে, এটাকে আমি পুরোপুরি আত্মপ্রকাশ করতে দিয়েছি। আমি এক খাতে এটাকে প্রবাহিত করিনি। এটা একটা হয়েছে আমার লাভ। আমি খুব তৃপ্তি পেয়েছি যে না, আমি সব দিকেই কিছু করেছি। আর ক্ষতি হয়েছে এই, আমি যদি শুধু একটা শাখায় থাকতাম তাহলে আমার যা ধারণা, আমি আন্তর্জাতিক মানের লেখক হতে পারতাম। আমার এই কনফিডেন্স আছে, আজকে এই জীবনের সায়াহ্নে এসে আমার এই প্রত্যয় খুব শক্তিশালী যে আমি যদি শুধু গল্প লিখতাম, শুধু উপন্যাস লিখতাম, শুধু ইংরেজিতে লিখতাম, আমি আন্তর্জাতিক মানের লেখক হতে পারতাম। আমি আন্তর্জাতিক লেখক, আমি পড়ি। আমি আপ–টু–ডেট, মানে এখনো যারা লিখছে প্রত্যেকের বই আমি কিনে পড়ি। দে আর নো বেটার দ্যান আস। দে আর নো বেটার দ্যান আস অ্যাজ ক্রাফটসম্যান। আর লেখক হিসেবে আমরা—আমি, তুমি ওদের চাইতে ইয়ে না। আমাদের খালি প্রবলেম হয়েছে আমাদের দেশের ওই পাবলিসিটিটা নেই। আমরা ওই মেইনস্ট্রিমে বিশ্ব সাহিত্যের যে মেইনস্ট্রিম তার মধ্যে নেই। এই জন্য আমরা অবহেলিত।
এটা আসলে বাংলা ভাষায় লিখে কেউই ওই জায়গায় যেতে পারেননি। এমনকি রবীন্দ্রনাথও না স্যার। কারণ, আজকে আপনি যেকোনো বিদেশি বইয়ের দোকানে গেলে, রবীন্দ্রনাথের বই এখন আর নেই। কোনো বই নেই। কিন্তু ধরা যাক রুমির বই তো থাকবেই, এমনকি এই খলিল জিবরান, এদের বই থাকে। রুশদির বই থাকবে। ওদের বই তো থাকেই, ওরা তো ইংরেজিতেই লেখে। কিন্তু অন্য ভাষায় লিখে সেই ক্ষেত্রে আমি বলি যে আমাদের আসলে কোনো বিশ্বকবি, বিশ্বলেখক নেই। সবাই পড়বে এই অর্থে নেই।
হাসনাত আবদুল হাই: রাইট।
স্যার, এখন আপনার সমকালে যাঁরা লিখেছেন, আচ্ছা বাংলা ভাষায় আপনার প্রিয় লেখক কে? প্রিয় কবি কে?
হাসনাত আবদুল হাই: অনেক। কার নাম বলব, কার নাম বাদ দেব। কার নাম? যেমন ধরো ভ্রমণকাহিনিতে আমাকে প্রেরণা দিয়েছে, উৎসাহ দিয়েছে এবং যাকে আমি মডেল বলে মনে করি এখনো, সে হলো যাযাবর দৃষ্টিপাতের। আমি স্কুলে থাকতে ওনার পড়া পড়লাম। অপূর্ব একটা বই ছিল। অপূর্ব মানে এটা ভ্রমণকাহিনির মডেল। এর মধ্যে কী নেই। এর মধ্যে প্রেমের কাহিনি আছে, এর মধ্যে প্রহসন আছে, এর মধ্যে হাস্যরস–কৌতুক আছে, এর মধ্যে রাজনীতি আছে, সবকিছু আছে। তো উনি আমার একটা মডেল, ভ্রমণকাহিনিতে মডেল। আর ছোটগল্পে তোমার রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই। কিন্তু আজকে আমার মনে হয়, আজকে না অনেক দিন থেকেই ওনাকে আমার একটু আউটডেটেড মনে হয়। আধুনিক না। আধুনিক না যে আধুনিক ছোটগল্প–উপন্যাসের যে ক্যারেক্টারিস্টিক যে তোমার বাইরের কথা ছাড়া ভেতরের কথা বলতে হবে। সাইকোলজিক্যাল দিকটা গুরুত্ব পেতে হবে। এই দিকটা ওনার গল্পের মধ্যে তেমনটা নেই। কেমন ওটা বর্ণনাপ্রধান এটা–ওটা আছে, এই ওটার মধ্যে নেই। আমরা ওই জিনিস পেলাম বুদ্ধদেব বসুতে এসে, তারপরে কিছুটা পেলাম আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ে এসে, এগুলো তো বেশ পেলাম আমরা। এবং একজন লেখক খুব একটা ঔপন্যাসিক হিসেবে জনপ্রিয় হননি কিন্তু উনি আধুনিক উপন্যাস, আমি বলব বাংলা প্রথম আধুনিক উপন্যাস উনি লেখেন। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। ওনার যে ট্রিলজি—‘অন্তঃশীলা’, ‘আবর্ত’, ‘মোহানা’, ওর মধ্যে উনি সব ইন্টেরিয়র মনোলগ, তারপরে সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার এগুলো নিয়ে এসেছেন। ওনার আগে কেউ এই মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে কেউ উপন্যাস লেখেনি। উনিই প্রথম।
সৈয়দ মুজতবা আলী, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ কেমন লাগে?
হাসনাত আবদুল হাই: সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লাল সালুটা গুরুত্ব পেয়েছে বিষয়ের জন্য, আঙ্গিকের জন্য না। আঙ্গিকের দিক দিয়ে ওটা সেকেলে। মানে ঠিক গতানুগতিক যেভাবে বলা হয়, উনি বলেছেন। কিন্তু ওই যে বিষয় ওই সময়ে একটা মাজার নিয়ে উনি এটা লিখলেন এ জন্য বইটা জনপ্রিয় হয়েছে। এর পরের বইগুলোতে আমরা দেখি যে উনি কিছুটা দার্শনিকতা এনেছেন—‘চাঁদের অমাবস্যা’, ‘কাঁদো নদী কাঁদো’। ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ তার পরে ‘চাঁদের অমাবস্যা’ ওখানে উনি অস্তিত্ববাদী দর্শন এটা নিয়ে এসেছেন এবং গদ্য নিয়ে উনি বেশ পরীক্ষা করেছেন। কিন্তু ওনার ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ পড়ে আমি দেখলাম একটা ত্রুটি পেলাম। ত্রুটিটা হলো ওখানে দুটো কাহিনি। একটা হলো কুমুরডাঙ্গার কাহিনি যে কুমুর নদ শুকিয়ে যাচ্ছে। আরেকটা হলো … যে প্রধান চরিত্র, সে ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছে, চাকরি নিয়ে এসেছে কুমুরডাঙ্গায়। সে একটা গ্রামে বিয়ে করতে যাবে। তো ওখানে গিয়ে শোনে যে তার একটা আত্মীয়া মেয়ে আত্মহত্যা করেছে এবং তার খালাটালা বলে যে তোমার জন্যই আত্মহত্যা। তোমার বাবা বলেছিল যে ওর সঙ্গে বিয়ে দেবে। তো এটা নিয়ে তার মনে একটা ইয়ে হয় ও বিয়ে করে না তখন চলে আসে। তো এরপরে দেখা যাচ্ছে যে ও এই প্রধান চরিত্র ও একটা প্যারালাল একটা স্রোতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সে ওই মেয়েটা এটা ওটা আর কুমুরডাঙ্গার কাহিনি আলাদা যাচ্ছে। এই দুটো মেলেনি। এই দুটো কাহিনি মেলেনি।
সৈয়দ মুজতবা আলীকে কেমন লাগে?
হাসনাত আবদুল হাই: ভালো, চমৎকার। ও ছোটগল্প একটু ইয়ে আছে...
আপনার সময়ে আপনার বন্ধুবান্ধবের মধ্যে আপনি তো সৈয়দ শামসুল হককে খুবই উচ্চ মূল্য দেন বলে আমি জানি।
হাসনাত আবদুল হাই: আমি উচ্চ মূল্য দিই দুই কারণে। একটা হলো উনি সত্যিকার অর্থে সব্যসাচী। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে উনি বিচরণ করেননি। এ জন্য আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি। বাংলাদেশে আর কেউ করেনি। তারপর আমি করেছি। কিন্তু একদিক দিয়ে আমি ওনার সঙ্গে পারিনি। উনি ছবি এঁকেছেন, আমি ছবি আঁকিনি। উনি গান লিখেছেন, আমি গান লিখিনি। আর বাদবাকি আমি সব করেছি। তো আমি ওনাকে শ্রদ্ধা করি যেহেতু উনি সব্যসাচী লেখক, এতগুলো শাখায় করেছেন এবং নিবেদিতপ্রাণ। ঢাকা ক্লাবে গিয়ে দেখছি, উনি লিখছেন। আমি বললাম, ভাই আপনি এখানে এসেছেন একটু রিল্যাক্স। বলেন, না ভাই, জীবন তো নশ্বর, কখন চলে যাব— লিখছি। লেখা ছাড়া উনি কিছু বুঝতেন না।
আপনিও তো কফি শপে গিয়ে লেখেন।
হাসনাত আবদুল হাই: এটা একটা। দ্বিতীয় কারণ হলো যেটার জন্য আমি ওনাকে শ্রদ্ধা করি। উনি প্রথম দিকে পারেননি। উনি শেষের দিকে গিয়ে নিজের একটা গদ্য তৈরি করলেন। এই গদ্য পড়ে আমরা বলতে পারি যে এটা সৈয়দ শামসুল হকের। এটা তাঁর একটা বড় কৃতিত্ব। এই দুই কারণে আমি তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করি। যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমাদের সম্পর্ক খুব কী বলব মানে খুব ইয়ে না, উষ্ণ না।
আচ্ছা আপনার সমসাময়িক অন্য লেখক, যাঁদেরকে বেশি সবাই বলে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, এঁদের সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
হাসনাত আবদুল হাই: আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আমার অন্তত দু–তিন বছরের জুনিয়র। কিন্তু হাসান আজিজুল হক আমার সমকালীন। আমরা একই বয়সের। হাসান আজিজুল হক গল্পে অসাধারণ। কিন্তু উপন্যাসে আমি তাঁকে খুব হাইলি রেট করব না। যেমন যে ‘আগুন পাখি’ উপন্যাসটা নিয়ে খুব নাম হয়েছে। এই ‘আগুন পাখি’টা যে বর্ণনাভঙ্গি, অনবদ্য একেবারে সেই আঞ্চলিক রাঢ় অঞ্চলের, সেই আঞ্চলিক ভাষা দিয়ে পুরো উপন্যাসটা বলে যাচ্ছে এক মহিলা। বিষয়টা খুব ভালো। অসাম্প্রদায়িক দেশভাগের বিরুদ্ধে এটা একটা প্রতিবাদ, খুবই ভালো। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, একটা গ্রামের মেয়ে লেখাপড়া জানে না। তার দুই ছেলে চলে এসেছে পাকিস্তানে। তার স্বামীও চলে যাচ্ছে। এই মেয়ে, গ্রামের এই বধূ কী করে তার এই সাহস হবে যে সে একা থেকে যাবে? এটা আমি বলব হাসান আজিজুল হক তার নিজের বক্তব্য ওনার কাছে আরোপিত করেছেন। এটা ওই মেয়ে বলতে পারে না। যদি স্বামী–স্ত্রী দুজনে থেকে যেত, এটা বিশ্বাসযোগ্য হতো যে দুজনেই যাবে। আরে স্বামীও চলে আসছে, ছেলেপেলে চলে এসেছে, ওই মেয়ে বলছে গ্রামের বধূ বৃদ্ধা উনি বলছে না আমি দেশভাগ মানি না, আমি যাব না। এটা বিশ্বাসযোগ্য হয় না। উনি ছোটগল্পে অনবদ্য কোনো সমালোচনা করার উপায় নেই। কিন্তু উপন্যাস আমার কাছে ভালো হয়নি।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কে?
হাসনাত আবদুল হাই: উপন্যাস ভালো হয়েছে ‘খোয়াবনামা’, তারপরে ‘চিলেকোঠার সেপাই’, ওটা পড়েছি। ছোটগল্প ও ছোটগল্পের মধ্যে অনাবশ্যকভাবে সে ভালগারিটি নিয়ে আসে। কেমন অশ্লীল কথা নিয়ে আসে। এটার প্রয়োজন নেই। একাধিক গল্পে অশ্লীলতা নিয়ে এসেছে। এইটা একটা তার দুর্বলতা।
আপনি তো তরুণদের লেখাও খুব পড়েন এবং আমি ফেসবুকে দেখি যে আপনি পড়লে পরে আপনার ভালো লাগলে সেটা আপনি আবার জানানও। কারও নাম বলবেন যে এর লেখা...
হাসনাত আবদুল হাই: কয়েক দিন আগে কৃষ্ণ জয় বলে একজনের লেখা, আমি ওর নামও শুনিনি। এত ছোট ছোট লেখা, এত নতুন ভঙ্গি, এটা আমার ভালো লাগল। আরেকজন হলো তোমাদের ওখানে লিখেছে আলভী। আলভী চমৎকার লেখে। তারপর মেয়েদের মধ্যে বর্ণালী সাহা দারুণ শক্তিশালী লেখক। আর শারমিন তানিয়া, ও ভালো লেখে। এই ইয়াং লেখকদের মধ্যে এরা খুব ভালো লিখছে।
বাংলাদেশ কোন দিকে গেল স্যার?
হাসনাত আবদুল হাই: বাংলাদেশ মোটামুটি একটা খাদের কাছ থেকে আমরা একটু সরে এসেছি। খাদটা এখনো দূরে যায়নি। আমরা খাদে পড়তে যাচ্ছিলাম, খাদ থেকে একটু দূরে এসেছি। এটাই আমাদের রিলিফ।
সে জন্য আমি মনে করি, নির্বাচন, গণতন্ত্র, নির্বাচিত সরকার সব সময়ই ভালো।
হাসনাত আবদুল হাই: আমার খুব ভালো লাগল যে তাঁর (প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান) বাবার বিরুদ্ধে লিখেছে একটা কবিতা। এটা জানার পরও একজন বাংলা একাডেমি পুরস্কার দিয়েছে।
বিতর্কটা না হলেই ভালো হতো। আমার ধারণা, এই বিতর্কটা যে হয়েছে, এটা প্রধানমন্ত্রী জানতেন না, জানলে আগেই দিতেন।
হাসনাত আবদুল হাই: না, এইটা দেখে আমি খুব আশান্বিত হয়েছি যে এখন মানে এই গভর্নমেন্টের আমলে পলিটিকস অব রিভেঞ্জ হবে না। কিছু হয়তো হবে…। ওই পলিটিকস অব ভেনজেন্স যদি হতো, তাহলে ও পুরস্কার পেত না।
সেই আশা আমরা করি। এখন আপনার এই জীবনের অভিজ্ঞতা স্যার আপনি ৯০–এ পা দিচ্ছেন, অনেক মৃত্যু তো দেখতে হয়েছে।
হাসনাত আবদুল হাই: অনেক মৃত্যু দেখতে হয়েছে। দীর্ঘ জীবনের এটা একটা অভিশাপ যে অনেকের মৃত্যু দেখতে হয়। অনেকের মৃত্যু দেখতে হয়, অনেক শোক পেতে হয়। এবং সবচাইতে হৃদয়বিদারক হয় যখন আমার চাইতে বয়সে কম, তারা মরে যাচ্ছে। এটা আরও বেশি হৃদয়বিদারক হয়। আমার সমকালীন লোক মরে যাচ্ছে ঠিক আছে। আমার চাইতে বয়সে বেশি মরে যাচ্ছে ঠিক আছে। বয়স হয়েছে। আমার চাইতে বয়সে অনেক কম, এরা মরে যাচ্ছে। যেমন আমার পুত্রবধূ। আমার পুত্রবধূ ৩০ বছরও হয়নি মরে গেল। বাচ্চা রেখে মরে গেল।… মরে যাচ্ছে, ক্যানসারে ভুগছে, ক্যানসারে কষ্ট পাচ্ছে, ওই কষ্ট পেয়ে আমি ঘুমাতে পারছি না। টেবিলে এসে আমি দেখি, আমাকে দিয়েছে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের হেমন্তের অরণ্যে। আমি এটা পড়া শুরু করলাম। আমি এটা কোনো দিন পড়িনি। আমি কবিতা রেগুলার পড়ি না, পড়লাম। পড়ে দেখি যে রাত এখনো বেশি, এখন তো ঘুম হবে না। তো কী করা যায়, আমি তো অনুবাদ করি, অনুবাদ করা শুরু করলাম। এত তন্ময় হয়ে গেলাম অনুবাদ করতে, কখন সকাল হয়েছে, নাশতা দিয়েছে আমি টেরও পাইনি। যখন আমাকে বলল যে নাশতা দিয়েছে, তখন আমি বুঝলাম যে অনুবাদ এমন একটা কাজ যে সবকিছু ভুলিয়ে রাখে। তখন আমি কবিতা অনুবাদ শুরু করলাম। এলোমেলোভাবে। এরপর আমি একটা সাবজেক্ট ঠিক করলাম। হাজার বছরের বাংলা কবিতা। আমি বাংলার ছাত্র না, হাজার বছরের বাংলা কবিতার মধ্যে কে আগে আসবে, পরে আসবে, আমি কিছুই জানি না কিন্তু আমার রোগ চেপে গেল, না, আমার করতে হবে। করতে হবে এবং আমাকে তাড়াতাড়ি করতে হবে। আমার পুত্রবধূ মারা যাওয়ার আগে। তো পুত্রবধূ মারা যাওয়ার আগে আমি শেষ করতে পারলাম না কিন্তু আমি ছয় মাসে শেষ করেছি। হাজার বছরের বাংলা কবিতা উইথ ইন্ট্রোডাকশন। তোমার বউকে একটা দিয়েছি, তোমার বাড়িতে নিশ্চয়ই আছে। তোমার স্ত্রীকে আমি এক কপি দিয়েছি। হাজার বছরের বাংলা কবিতা এই কবিতার বই এখানে সব।
স্যার এখন তরুণ লেখকদের উদ্দেশে আর বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে আপনি যদি কিছু আপনার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দুটো কথা বলেন।
হাসনাত আবদুল হাই: তরুণদের উদ্দেশে বলব, ওদের বই পড়তে হবে। প্রচুর পড়তে হবে। প্রচুর পড়তে হবে এবং খালি উপন্যাস পড়লে হবে না। উপন্যাসের যে থিওরি, আর্ট এগুলো জানতে হবে। এগুলো জানতে হবে কেমন যে উপন্যাস খালি লিখলাম বলে না ওগুলো পড়তে হবে এই। দেশি–বিদেশি সব পড়তে হবে। খালি দেশি পড়লে হবে না, বিদেশিও পড়তে হবে। এখন যারা তরুণ লেখক, তাদের ওপরে যে ভার, এটা আমাদের চাইতে অনেক বেশি। কারণ, আমাদের সময়ে এত লেখক হয়নি। এখন তো অনেক লেখক, ওদেরকে এটা পড়তে হবে। পড়ে তাদের নিজেদের একটা রুচি তৈরি করতে হবে। বই পড়ে সব বইকে তারা ভালো বলবে না। তারা কোন বইটা বেশি ভালো, কেন ভালো, এই জ্ঞানটা তাদের হতে হবে। নাহলে বই পড়ে গেলাম, অনেকগুলো বই পড়েছি, তাহলে হবে না। বই পড়ে তাকে তার বিচারবুদ্ধি, জাজমেন্ট, এটা ব্যবহার করতে হবে যে কেন বইটা ভালো হলো, কেন ওই বইটা খারাপ হলো। এই যেমন ‘চাঁদের অমাবস্যা’ সম্পর্কে আমি বললাম যে এটা তার দুর্বল দিক। কেমন এইভাবে প্রত্যেক বইয়েরই কিছু দুর্বল দিক আছে। এটা বুঝতে হবে। এবং দ্বিতীয় হলো যে তাদের নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে হবে। আমি এই সুযোগটা পাইনি যেহেতু আমি সরকারি কর্মচারী, আমাকে বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে, আমার কোনো গ্রুপ ছিল না। আমার যদি একটা গ্রুপ থাকত, তাহলে একটা লিখে আমি সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকায় দিতাম না, ওই লেখাটা আমি পড়ে শোনাতাম আমার গ্রুপকে। আর গ্রুপ বলত যে না এই জায়গাটা মনে হয় তুমি একটু বদলাও। আমি এ ধরনের কোনো সাজেশন পাইনি। সুতরাং তরুণদের উদ্দেশে আমার উপদেশ থাকবে যে তারা প্রচুর পড়বে, পড়ে তারা ডিসক্রিমিনেট করবে যে কেন ভালো, কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ। দ্বিতীয়ত তাদের একটা গ্রুপে তারা এটা আলোচনা করবে। আলোচনা করবে এবং ডগমেটিক হবে না যে আমি যেটা লিখেছি এটাই সঠিক না, দে শুড বি ওপেন টু সাজেশন যে কে কী বলছে, সেটা আসলে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে।
আর এটা তো গেল লেখকদের উদ্দেশে কিন্তু সাধারণ নতুন প্রজন্মের যারা লেখক না, তাদেরও উদ্দেশে মানে সবার উদ্দেশে কী বলবেন, আমরা শেষ করব।
হাসনাত আবদুল হাই: তাদের উদ্দেশে আমি বলব যে বই পড়তে হবে। বই পড়লে রুচি উন্নত হবে, শুভবুদ্ধি বাড়বে। শুভবুদ্ধি বাড়বে এবং মানুষের প্রতি যে সৌহার্দ্য, এটা গড়ে উঠবে। বই পড়া, গান শোনা, এগুলোকে আমরা বলি সুকুমার বৃত্তির চর্চা। এই সুকুমার বৃত্তির চর্চা না করলে মানুষের ভেতরে হিংসা–বিদ্বেষ, সহিংসতা এগুলো দেখা দেবে। আমাদের বই পড়তে হবে, গান শুনতে হবে, সিনেমা দেখতে হবে, নাটক দেখতে হবে। আমাদের যে সুকুমার বৃত্তি, এটাকে আমাদের করতে হবে। না হলে আমাদের যে অন্য দিক আছে, যেটা নাকি বৈষয়িক বুদ্ধি দ্বারা চালিত, খাওয়াদাওয়া, টাকা জমানো, এটা–ওটা করা, ওটা কিন্তু আমাদের সুকুমার বৃত্তিকে কুরে কুরে খায়। ওটা আমাদেরকে অমানুষ করে তোলে। আমাদের সত্যিকার মানুষ হতে গেলে আমাদের সুকুমার বৃত্তির চর্চা করতে হবে এবং সুকুমার বৃত্তির চর্চার জন্য বই পড়া, গান শোনা, সিনেমা দেখা এর চাইতে আর কিছু করার দরকার নেই। এগুলো করতে হবে।
স্যার, এখন কী লিখলেন, সর্বশেষ কী বেরুল বা আর কী কাজ করছেন?
হাসনাত আবদুল হাই: গত বছর আমি একটা বড় কাজে হাত দিলাম। আমি ২০০০ সালে অবসরে গেলাম, ২০২৫—এই এটাও তো আমার একটা জীবন। তো লোকে সাধারণত আত্মজীবনী লেখে কর্মজীবন নিয়ে। তো আমার এই অবসরজীবনও তো কর্মজীবন। আমি বই পড়েছি, লিখেছি, সিনেমা দেখেছি, এক্সিবিশনে গিয়েছি, নাটক দেখেছি, বিদেশে গিয়েছি, তো এটা নিয়ে আমি লিখলাম জার্নাল ২০০০-২০২৫। তো আমার যে প্রকাশক ও বলল যে ৯০০–১০০০ পৃষ্ঠার বই ছাপা যাবে না, এটার অনেক দাম হবে আর পড়তেও অসুবিধা। আপনি ২০১৫ দিয়ে শেষ করেন। তো ওটা ২০০০-২০১৫ এটা দিয়ে শেষ করেছি, এটা বেরিয়েছে। ওখানে আমি কি বই পড়েছি, তারপর কী সিনেমা দেখেছি, তারপর কোন গান শুনেছি, কোন থিয়েটার দেখেছি, কোন এক্সিবিশন, কার এক্সিবিশন, এগুলো ঘুরেফিরে এসেছে। তারপর বিদেশে গিয়েছি—সাইপ্রাস, ফ্রান্সে গিয়েছি, লেক ডিস্ট্রিক্ট, এগুলো ভ্রমণকাহিনিও এসছে। এবং এর মধ্যে আমার শোকগাথাও এসেছে। আমার ওয়াইফ মারা গেল ক্যানসারে, তাকে নিয়ে এক মাস সিঙ্গাপুরে ছিলাম। ওটার ওপরে আমার একটা উপন্যাস বেরিয়েছে ‘সুপ্রভাত বিষণ্নতা’। ওই উপন্যাসের সামারি আমি এটার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছি। ‘সুপ্রভাত বিষণ্নতা’ এটাও জার্নালের একটা চ্যাপটার এটা আছে। আরেকটা হলো এই যে শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে আমাকে যে নাকাল করল, হ্যারাস করল, এটাও এসেছে এখানে। হুবহু এসেছে এটা। এখানে পুরোপুরি এসেছে। এইভাবে এই যে জার্নাল ২০১৫, এটা একটা নতুন ধরনের লেখা। এটাকে কোনো শ্রেণিতে ফেলা যাবে না। এটা আত্মজীবনী না, তবে আত্মজীবনী আছে, স্মৃতিকথা আছে, এর মধ্যে ডায়েরি আছে, এর মধ্যে সাহিত্য আলোচনা আছে, এর মধ্যে সিনেমা আলোচনা আছে, সংগীত আলোচনা আছে, সবকিছু আছে। এর মধ্যে রাজনীতি আছে, প্রত্যেক বছরের বাংলাদেশের রাজনীতি, বিদেশের রাজনীতি আছে এখানে। এটা কীভাবে লিখলাম, যেহেতু আমি কলাম লিখতাম। আমি রিটায়ার করার পরে এমন কোনো পত্রিকা নেই, একমাত্র ‘প্রথম আলো’ ছাড়া যেখানে আমি কলাম লিখিনি। ওদেরই অনুরোধে যুগান্তর, ইত্তেফাক, আজকের দিন, ভোরের কাগজ, তারপরে ডেইলি স্টার, তারপর নিউ এজ, এমন কোনো পত্রিকা নেই, যেখানে আমি লিখিনি। সপ্তাহে আমাকে কোনো কোনো সময় তিন–চারটা কলাম লিখতে হতো, বাংলা–ইংরেজি মিলে। তো ওখানে পলিটিকস আছে, ইয়ে আছে ওগুলো আমি নিয়ে এসেছি। এই তো এই বইটা বেরিয়েছে, এই বইটা কয়েক দিন আগে বেরিয়েছে। আর প্রত্যেক বছরই আমাকে ঈদসংখ্যার জন্য অনুরোধ করে। গত বছরে অনুরোধ করেছে আমি চারটা উপন্যাস দিয়েছি। ইনক্লুডিং প্রথম আলো। এ বছরও পাঁচটা পত্রিকা উপন্যাস লিখতে বলেছে। আমি পাঁচটা পারিনি, যেহেতু এই জার্নালটা লিখলাম, এটা অনেক টাইম নিল। তো এ জন্য আমি আড়াইটা লিখেছি। একটা সমকালে, একটা অন্যদিনে আর নভেলা যাবে প্রথম আলোতে। এই তিনটা লিখেছি। আর চারটা ভ্রমণকাহিনি প্যারিসের ওপরে। প্যারিসে কয়েকবার। এটা চার ভাগ করে আমি দিয়েছি রাইজিংবিডি, যুগান্তর, তারপর কালবেলা, এই চারটা পত্রিকায় দিয়েছি ও মানবজমিন। এই চারটা পত্রিকায় আমার চারটা ভ্রমণকাহিনি যাবে। আড়াইটা উপন্যাস যাবে। জন্ম–মৃত্যু সম্বন্ধে কেউ কিছু বলতে পারে না। কিন্তু আমার এখন এমন একটা অসুখ হয়েছে, যার জন্য আমি বলতে পারি যে এটাই আমার শেষ ইন্টারভিউ এবং এটাই আমার শেষ ঈদসংখ্যায় লেখা।
চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক উন্নত হয়েছে, আমরা আশা করি...
হাসনাত আবদুল হাই: আমি বলছি, এটা ফিফটি পারসেন্ট চান্স আছে। আমি বেঁচে যেতে পারি। এটাই হয়তো আমার শেষ ইয়ে। এ জন্য তুমি যে আজকে ইন্টারভিউ নিলে আমার, তুমি যখন প্রথম বলেছিলে তখন আমার ওই ওয়ার্নিং ছিল না। এই ওয়ার্নিংটা আমি গত ১৫ দিন আগে পেয়েছি। আমার আল্ট্রাসনোগ্রাম করল, এটা–ওটা করল করে বলল যে এ রকম একটা টিউমার আছে, এটা–ওটা আছে। আজকেও ব্লাড নিয়ে গেল, এই ব্লাড দেখে ওরা বলবে যে আমার অপারেশন করতে হবে, কী করতে হবে। যাহোক আমার কোনো আফসোস নেই, বুঝলে। আমার জীবনের যা করার আমি করেছি। আমার জীবনের যা করার, আমি সব করেছি। আমার কোনো আফসোস নেই। একটা খালি আফসোস থাকবে, নাতিটা ছোট, ওকে বড় দেখে যেতে পারব না, এই।
কোনো আফসোস নেই, এটা বলতে পারা অনেক বড় ব্যাপার স্যার।
হাসনাত আবদুল হাই: একজন ফরাসি গায়িকা খুব নামকরা এডিথ পিয়াফ, তার একটা খুব প্রিয় গান আছে, জনপ্রিয় গান—জুনে রিগ্রেতে রিয়ে। আই ডু নট রিগ্রেট। জুনে রিগ্রেতে রিয়ে আই ডু নট রিগ্রেট।
ঠিক আছে। আমরা আমাদের অগ্রগণ্য লেখক হাসনাত আবদুল হাই স্যারের কথা শুনলাম। তিনি বলছেন তাঁর কোনো রিগ্রেট নেই, ফরাসি গায়িকার থেকে তিনি শোনালেন। আর তিনি বলেছেন তরুণ প্রজন্মকে সুকুমার বৃত্তির চর্চা করতে হবে। সে জন্য তিনি বই পড়তে বললেন, গান শুনতে বললেন, নাটক এবং সিনেমা দেখতে বললেন। আমরা তাঁর এই উপদেশ নিশ্চয়ই আমাদের চলার পথে জীবনে মান্য করব এবং উপকৃত হব। একটা সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলব। আপনারা যে যেখানে আছেন, সবাই ভালো থাকবেন। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। স্যার আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
হাসনাত আবদুল হাই: তোমাকেও ধন্যবাদ।