কোরআন বিভিন্ন স্থানে পিতৃত্বের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছে এবং এর নানাবিধ দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে। কোরআনে বর্ণিত পিতৃত্বের ধারণার কিছু বৈশিষ্ট্য এখানে তুলে ধরা হলো:
কোরআনে বিভিন্ন ধরনের পিতার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। একদিকে যেমন নুহ, ইব্রাহিম, ইয়াকুব এবং লোকমান (আলাইহিমুস সালাম)-এর মাধ্যমে ‘আদর্শ ও নেককার পিতার’ দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে আজরের (ইব্রাহিম আ.-এর পিতা) মাধ্যমে ‘অসৎ পিতার’ একটিমাত্র দৃষ্টান্তও দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে পিতৃত্বের মূল ভিত্তিই হলো কল্যাণ ও সততা; যদিও এর ব্যতিক্রম উদাহরণ থাকা সম্ভব।
কোরআন যেমন আদর্শ পিতার সফল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে, তেমনি সন্তানদের বিচিত্র স্বভাব ও আচরণের সঙ্গে কীভাবে সর্বোত্তম পন্থায় প্রতিক্রিয়া করতে হয়, তার রূপরেখা প্রদান করেছে।
কোরআনে বর্ণিত প্রায় সব পিতাই সন্তানের লালন-পালন ও শিক্ষার প্রক্রিয়ায় গভীরভাবে জড়িত ছিলেন এবং এতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। নুহ (আ.) তাঁর সন্তানকে পাপাচারী কওমের পরিণতি থেকে বাঁচাতে অত্যন্ত ব্যাকুল ও সচেষ্ট ছিলেন।
ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে উপদেশ দিতেন। সন্তানদের ষড়যন্ত্রের ওপর তিনি ধৈর্য ধরেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন।
বলা হয়েছে, ‘তারা বলল: হে আমাদের পিতা! আমাদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন, নিশ্চয়ই আমরা অপরাধী ছিলাম’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৯৭)
লোকমান হাকিম তাঁর সন্তানকে আকিদা-বিশ্বাস এবং নৈতিকতার মৌলিক শিক্ষাগুলো হাতেকলমে শিখিয়েছেন।
কোরআনে বর্ণিত পিতৃত্বের মডেলগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে পিতৃত্ব এবং কষ্ট-সাধনা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
এটি ইঙ্গিত করে যে সন্তানদের সংশোধন এবং সঠিক পথে পরিচালনার দায়িত্ব একজন পিতার কাঁধে কতটা গুরুভার হিসেবে অর্পিত হয়। এই ত্যাগের প্রতিফলন আমরা বিভিন্ন নবীর জীবনে দেখতে পাই।
নুহ (আ.) তাঁর বিপথগামী সন্তানকে সঠিক পথে আনার চেষ্টা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছাড়েননি। ইব্রাহিম (আ.) নিজ সন্তানকে কোরবানি করার মতো কঠিন ঐশী নির্দেশ অটল ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করেছিলেন।
ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদের পক্ষ থেকে পাওয়া কষ্ট ও মানসিক যন্ত্রণা অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করেছিলেন।
পুরো কোরআনে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না যেখানে সন্তানদের ওপর শারীরিক শাস্তি, মৌখিক হুমকি বা জোরজবরদস্তি করার সমর্থন দেওয়া হয়েছে, এমনকি অবাধ্য সন্তানদের ক্ষেত্রেও নয়।
কোরআনে বর্ণিত আদর্শ পিতাগণ সন্তানদের সঙ্গে আচরণে সংলাপ ও অনুপ্রেরণার পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। পুরো কোরআনে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না যেখানে সন্তানদের ওপর শারীরিক শাস্তি, মৌখিক হুমকি বা জোরজবরদস্তি করার সমর্থন দেওয়া হয়েছে, এমনকি অবাধ্য সন্তানদের ক্ষেত্রেও নয়।
ইব্রাহিম (আ.) যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে পুত্র কোরবানির নির্দেশ পেলেন, তিনি তা সরাসরি চাপিয়ে দেননি। বরং কার্যকরের আগে পুত্রের মতামত জানতে চেয়েছেন, ‘হে আমার প্রিয় বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে আমি তোমাকে কোরবানি করছি, এখন বলো তোমার অভিমত কী?’ (সুরা সাফফাত, আয়াত: ১০২)।
এ থেকে বোঝা যায় যে কোরআনের দৃষ্টিতে পিতৃত্ব কোনো ‘নিরঙ্কুশ ক্ষমতা’ নয়। বরং এটি হলো একটি রোল মডেল হওয়া এবং সন্তানদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে অভ্যস্ত করা।
সমাজবিজ্ঞানে যাকে ‘প্যাট্রিয়ার্কি’ বা চরম পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্ব বলা হয়, কোরআনে তার কোনো স্থান নেই। বরং কোরআন অন্ধভাবে পূর্বপুরুষ বা পিতাদের অনুসরণ করতে নিষেধ করেছে এবং নিজের বিচারবুদ্ধি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে (সুরা জুখরুখ, আয়াত: ২৩)।
কোরআনের দৃষ্টিতে পিতৃত্ব কোনো ‘নিরঙ্কুশ ক্ষমতা’ নয়। বরং এটি হলো একটি রোল মডেল হওয়া এবং সন্তানদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে অভ্যস্ত করা।
সন্তানদের ক্ষমা করার ক্ষেত্রে ইয়াকুব (আ.)-এর ধৈর্য এক অনন্য উদাহরণ।
তাঁর সন্তানরা যখন তাঁদের ভাইকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল এবং এমনকি পিতার সমালোচনা করে বলেছিল, ‘নিশ্চয়ই আমাদের পিতা প্রকাশ্য বিভ্রান্তিতে রয়েছেন’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৮), তখনও তিনি তাঁদের ওপর আশা হারাননি।
তিনি সন্তানদের উপদেশ দেওয়া এবং সঠিক পথ দেখানো থেকে বিরত হননি, যতক্ষণ না তাঁরা তাঁদের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। সামগ্রিকভাবে কোরআন পিতৃত্বের মর্যাদাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে।
কোরআন যেমন আদর্শ পিতার সফল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে, তেমনি সন্তানদের বিচিত্র স্বভাব ও আচরণের সঙ্গে কীভাবে সর্বোত্তম পন্থায় প্রতিক্রিয়া করতে হয়, তার সুষ্ঠু রূপরেখা ও ধারণা প্রদান করেছে।
আবদুল্লাহিল বাকি: আলেম, লেখক ও সফটওয়্যার প্রোগ্রামার।