ছেলে হাসান ইসাখিলের সঙ্গে বাবা মোহাম্মদ নবী। রোববার সিলেটে নোয়াখালী এক্সপ্রেস–ঢাকা ক্যাপিটালস ম্যাচের পর
ছেলে হাসান ইসাখিলের সঙ্গে বাবা মোহাম্মদ নবী। রোববার সিলেটে নোয়াখালী এক্সপ্রেস–ঢাকা ক্যাপিটালস ম্যাচের পর

বাবা–ছেলে এক দলে: নবী–ইসাখিলের আগে যাঁদের দেখা গেছে

প্রতিপক্ষ হিসেবে তাঁরা এর আগে খেলেছেন। কিন্তু একই দলে খেলতে দেখা গেল চলতি বিপিএলে, নোয়াখালী এক্সপ্রেসের হয়ে। এই বাপ–ছেলে আফগান ক্রিকেট দলের কিংবদন্তি মোহাম্মদ নবী এবং হাসান ইসাখিল। প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে বাবা–ছেলেকে একই দলে খেলতে দেখা যায় খুব কমই। কারণটা হয়তো বয়সের পার্থক্য। তবে ক্রিকেটের ইতিহাসে বাবা–ছেলের একই দলে খেলার নজির একেবারে কমও নেই।
‘উইজডেন’ এটা নিয়ে একটি তালিকা করেছে। তবে তারা জানিয়েছে, এ তালিকা সম্পূর্ণ নয়, যেখানে আরও অনেক নাম অন্তর্ভুক্ত হতে পারত।

গ্রেস এবং তাঁর ছেলেরা

উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস। সংক্ষেপে ডব্লু জি গ্রেস। ক্রিকেটের অমর বুড়ো কিংবা আধুনিক ক্রিকেটের জনক। ইতিহাসের তৃতীয় দীর্ঘতম প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ার ডব্লু জি গ্রেসের। তাঁর ক্যারিয়ার এত দীর্ঘ ছিল যে তাঁর দুই ছেলে ডব্লু জি জুনিয়র ও চার্লস বাটলার নিজেদের শেষ ম্যাচ খেলেছেন বাবার শেষ ম্যাচের আগেই। ৩০ বছর বয়সে অকালপ্রয়াত ডব্লু জি জুনিয়র তাঁর ৫৭টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচের বেশির ভাগ খেলেছেন বাবার সঙ্গে একই দলে। ছোট ভাই চার্লস বাটলার চারটি ম্যাচ খেলেছেন এবং সব কটিই তাঁর বাবা ছিলেন সতীর্থ। এর মধ্যে দুটি ম্যাচে ডব্লিউ জি জুনিয়রও তাঁর সতীর্থ ছিলেন।

কোয়াইফ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ইংল্যান্ডের হয়ে ৭টি টেস্ট খেলেন উইলি কোয়াইফ। তাঁর ছেলে বার্নার্ড কোয়াইফ ইংল্যান্ডের টেস্ট দলে সুযোগ না পেলেও বাবার মতো ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেন। এই কাউন্টি দলের হয়ে উইলি এবং তাঁর ছেলে বার্নার্ড একে অপরের সতীর্থ হিসেবে খেলেছেন। ১৯২০ থেকে ১৯২৮ সালের মধ্যে বাবা–ছেলে এক দলে ২০টি ম্যাচ খেলেছেন।

বেস্টউইক

ডার্বিশায়ারের হয়ে ১৮৯৮ থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত ৩২৩টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেন ক্যারিয়ারে ১৪০০ উইকেট নেওয়া প্রয়াত পেসার বিলি বেস্টউইক। তাঁর ছেলে রবার্ট বেস্টউইকও বাবার পথ অনুসরণ করে ক্রিকেটার হন। ১৯২২ কাউন্টি মৌসুমে ডার্বিশায়ারের একই দলের হয়ে দুটি ম্যাচ খেলেছিলেন বিলি ও রবার্ট। ১৯২২ সালে ডার্বিশায়ার–ওয়ারউইকশায়ার ম্যাচে কোয়াইফদের বিপক্ষে দুই প্রান্ত থেকে বোলিং করেছিলেন বেস্টউইকরা।

বাবার সঙ্গে খেলেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান কিংবন্তি লিয়ারি কনস্ট্যান্টাইন

কনস্ট্যান্টাইন

১৯০০ সালে লেব্রান কনস্ট্যান্টাইন ইংল্যান্ডের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে সেঞ্চুরি করেন। তাঁর ছেলে লিয়ারি কনস্ট্যান্টাইন শুধু প্রাথমিক যুগের ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটে এক মহিরুহই নন, বর্ণবাদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিল তাঁর কণ্ঠ। ১৯২২–২৩ মৌসুমের ইন্টারকলোনিয়াল টুর্নামেন্টের ফাইনালে বার্বাডোজের বিপক্ষে ত্রিনিদাদের হয়ে বাবা–ছেলে একসঙ্গে খেলেন।

গান

জর্জ গান সেই চার ক্রিকেটারের একজন, যাঁরা বয়স ৫০ বছর পেরোনোর পরও টেস্ট ক্রিকেট খেলেছেন। তাই এ তালিকায় তাঁর নাম থাকা স্বাভাবিক। ছেলে জর্জ গান জুনিয়রের সঙ্গেও খেলেছেন তিনি। ১৯২৮ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত নটিংহামশায়ারের হয়ে বাবা–ছেলে একসঙ্গে খেলেন। ১৯৩১ সালে এজবাস্টনে ওয়ারউইকশায়ারের বিপক্ষে ইতিহাস গড়েন দুজন—একই ইনিংসে বাবা ও ছেলে দুজনই সেঞ্চুরি পেয়ে যান। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে একই ইনিংসে বাবা–ছেলের সেঞ্চুরির সেটাই প্রথম ঘটনা।

দেওধর

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর—দুই সময়েই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলা মাত্র দুজন ক্রিকেটারের একজন ছিলেন দিনকার বলবন্ত দেওধর বা সংক্ষেপে ডি বি দেওধর। তাঁর শেষ প্রথম শ্রেণির ম্যাচটি মহারাষ্ট্র পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট দলের অধিনায়ক হিসেবে রেস্ট অব ইন্ডিয়ার বিপক্ষে। সেই ম্যাচে তাঁর ছেলে শরদ দেওধরেরও অভিষেক হয়। প্রথম ইনিংসে বাবা–ছেলে দুজনই সি কে নাইডুর বলে আউট হন।

নাইডু

সি কে নাইডু দীর্ঘতম প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ক্যারিয়ারের রেকর্ডধারী। ডব্লু জি গ্রেসের মতো, সি কে নাইডুর ক্যারিয়ারও তাঁর দুই ছেলে সি এন এবং প্রকাশের ক্যারিয়ারকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। যদিও সি কে কখনো প্রকাশের সঙ্গে একসঙ্গে খেলেননি, তবে সি এন ১৯৫৬–৫৭ সালের রঞ্জি ট্রফিতে উত্তর প্রদেশে বাবার সঙ্গে একই দলে খেলেছেন। এ ছাড়া সি এন ও প্রকাশও একসঙ্গে খেলেছেন।

চন্দরপল

লাল বলে তেজনারায়ণ চন্দরপলের ব্যাটিং একটু বয়স্ক দর্শকদের শিবনারায়ণকে মনে করিয়ে দেয়। বাবার মতো তাঁরও টেস্টে একটি ডাবল সেঞ্চুরি আছে (হানিফ ও শোয়েব মোহাম্মদের পরে তাঁরা দ্বিতীয় বাবা–ছেলের জুটি যাঁরা এটা করেছেন)। বাবা শিবনারায়ণ চন্দরপলের সঙ্গে তাঁর ছেলে গায়ানার হয়ে ১২টি ম্যাচ খেলেছেন।

বাবা শিবনারায়ণ চন্দরপলের সঙ্গে ছেলে তেজনারায়ণ চন্দরপল। ছবিটা ২০১৫ সালের

তিমুর–লেস্তের বাবা–ছেলে

গত বছর নভেম্বরে বালিতে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে তিমুর-লেস্তের প্রথম টি–টোয়েন্টি দলে খেলেন সুহাইল সাত্তার এবং তাঁর ছেলে ইয়াহিয়া সুহাইল। দুজনই এ পর্যন্ত তিমুর-লেস্তের হয়ে আটটি ম্যাচ খেলেছেন। একই মাসের শেষ দিকে তারা মিয়ানমারের বিপক্ষে একসঙ্গে ব্যাটিংও করেন।

নবী এবং তাঁর ছেলে

মোহাম্মদ নবী আফগান ক্রিকেটের ‘গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান।’ নবীর চাওয়া ছেলে হাসান ইসাখিল আফগানিস্তান দলে তাঁর সঙ্গে খেলুক। সেই লক্ষ্যে এবার বিপিএলে এক ধাপ এগিয়েছেন নবী। নোয়াখালী এক্সপ্রেসের হয়ে খেলছেন বাবা ও ছেলে। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে এটি প্রথম ঘটনা। বাবা–ছেলের এই জুটি নোয়াখালীর হয়ে ম্যাচে চতুর্থ উইকেটে ৫৯ রান যোগ করেন।

বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসান ঢাকা লিগে খেলেছে ছেলে সাজিদ হাসানের সঙ্গে

রকিবুল হাসান ও সাজিদ হাসান

বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসান ঢাকার ক্রিকেটে খেলেছেন ছেলে সাজিদ হাসানের সঙ্গে। ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে দামাল সামার ক্রিকেটে ভিক্টোরিয়া ক্লাবের হয়ে বাবার সঙ্গে ওপেন করতে নামেন সাজিদ। নাভানা প্রিমিয়ার লিগেও পিতা-পুত্র একই দলে খেলেছেন। দুই দলের অধিনায়ক হিসেবেও মাঠে মুখোমুখি হয়েছেন তাঁরা।

ছেলেদের অপেশাদার ক্রিকেট

পেশাদার ক্রিকেটের জগৎ ছাড়িয়ে অপেশাদার ক্রিকেটেও বাবা–ছেলের একসঙ্গে খেলার নজির কম নেই। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার গ্রেড ক্রিকেটে, জেমি কক্স তাঁর ছেলে ল্যাচলানের অধীনে খেলেছেন, আর অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব–১৯ দলের অধিনায়ক অলিভার পিক তাঁর বাবা ক্লিনটনের সঙ্গে একই দলের হয়ে মাঠে নামেন। একটি ম্যাচে পিক সেঞ্চুরি পেলেও বাবা শূন্য রানে আউট হন।

ক্যারিয়ারের শেষ দিকে ল্যান্স কেয়ার্নস ১৯৮৮–৮৯ মৌসুমে ফার্গুস হিকি রোজবোল প্রতিযোগিতায় ক্যান্টিজের হয়ে নর্থল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেন। একই ম্যাচে তাঁর ছেলে ক্রিস কেয়ার্নসও খেলেন। ম্যাচে ৯ উইকেট নেন ক্রিস কেয়ার্নস।

১৯৯৯–০০ মৌসুমে পাকিস্তান দল অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড চেয়ারম্যানস একাদশের বিপক্ষে ৫০ ওভারের ম্যাচ খেলেন। সেই ম্যাচে ৩ উইকেট নেন অ্যাডাম লিলি, কিন্তু আসল আকর্ষণ ছিলেন তাঁর বাবা ডেনিস লিলি। ৮ ওভারে ৩ উইকেট নেন ৫০ বছর পেরিয়ে যাওয়া অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি।

মায়েদের কী খবর

মেটি ফার্নান্দেস এবং তার কন্যা নাইনা মেটি সাজু গত বছর সুইজারল্যান্ডের হয়ে একসঙ্গে ছয়টি টি–টুয়েন্টি খেলেন। গত বছরই জুলাইয়ে সাজু তাঁর মায়ের বোলিংয়ে এস্তোনিয়ার খেলোয়াড় বিনিশ ওয়ানির ক্যাচ নেন।

ইংল্যান্ডকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নেতৃত্ব দেওয়া আরান ব্রিন্ডেল আবারও আলোচনায় আসেন ২০২১ সালের মে মাসে। ওউনবাই ট্রোজানসের হয়ে নিজের ১২ বছর বয়সী ছেলে হ্যারিকে সঙ্গে নিয়ে ১৪৩ রানে অপরাজিত জুটিতে নেটলহ্যামকে ১০ উইকেটে হারান তাঁরা।

ভারতের এক অবকাশ কেন্দ্রে বাবা সুভাষ মোদির সঙ্গে ছেলে হিতেশ মোদি

শেষ বেলায় আম্পায়ার

মাঠে আম্পায়ার হিসেবে বাবা–ছেলের জুটির তিনটি উদাহরণ আছে—টম সুয়েল এবং টম সুয়েল জুনিয়র (জেন্টলমেন বনাম প্লেয়ারস, দ্য ওভাল ১৮৬৩); ফ্রাঙ্ক ও লুইস ট্যারান্ট (সাউদার্ন পাঞ্জাব বনাম এমসিসি, অমৃতসর ১৯৩৩/৩৪); এমজি বিজয়সারথি এবং এমভি নাগেন্দ্র (মহিশুর বনাম অন্ধ্র, বেঙ্গালুরু ১৯৬০/৬১)।

২০০৬ সালে নাইরোবিতে ওয়ানডে ম্যাচে বাংলাদেশের মাশরাফি বিন মুর্তজা কেনিয়ার হিতেশ মোদির বিপক্ষে এলবিডব্লুর আবেদন করেন, তখন আম্পায়ার হিসেবে আঙুল তোলেন হিতেশ মোদির বাবা সুভাষ মোদি।