
মাঠে ভালো খেলে হার, নাকি মোটামুটি খেলে হলেও জয়? প্রশ্নটা সহজ, উত্তর ততটা নয়। দিন শেষে স্কোরলাইনে যে দল এগিয়ে, ইতিহাস তাকেই মনে রাখে। তবে পিছিয়ে থাকলেও যদি খেলায় নিয়ন্ত্রণ আর সম্ভাবনার আভাস থাকে, সেটাও-বা কম কী!
২০২৭ এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের পর্দা নেমেছে পরশু। শেষ ম্যাচে সিঙ্গাপুরের মাঠে তাদেরই কাছে ১-০ গোলে হেরেছে বাংলাদেশ। ফলাফলে হার লেখা হলেও গল্পটা সেখানেই শেষ নয়, বরং শুরু হতে পারে এখান থেকেই। এই হার এমন এক ম্যাচে, যেখানে বাংলাদেশই অধিকাংশ সময়ে এগিয়ে ছিল বলের দখলে, ছন্দে আর আক্রমণে। শুধু গোলটাই আসেনি।
৪৫ বছর পর বাংলাদেশ এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলবে, এবার এমন স্বপ্ন উঁকি মারছিল অনেকের মনে। হামজা চৌধুরী, শমিত সোম, ফাহামিদুল ইসলাম, জায়ান আহমেদদের মতো ফুটবলারদের উপস্থিতিতে অনেকে এই দলটাকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী জাতীয় দল বলে থাকেন। সেই দল এশিয়ান কাপের বাছাইয়ে ছয় ম্যাচে ৫ পয়েন্ট পেয়েছে, গোল গড়ে ভারতকে পেছনে ফেলে তৃতীয়। কিন্তু মূল পর্বে যে ওঠা হয়নি, দিন শেষে এটাই বাস্তবতা।
বাছাইপর্বে প্রাপ্তি ২২ বছর পর ভারতের বিপক্ষে ৪ পয়েন্ট আদায়। তিনটি অ্যাওয়ে ম্যাচেই দাপটের সঙ্গে খেলা, যার দুটিতে এসেছে ড্র। হংকং ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই। আবার হতাশার পাল্লাও বেশ ভারী। জেতা ম্যাচগুলো হাতছাড়া হয়েছে নিজেদের ভুলে।
হংকংয়ের বিপক্ষে ঢাকায় ৩-১-এ পিছিয়ে থেকেও ৩-৩ সমতা। কিন্তু সর্বনাশ ডেকে আনে সমতায় ফেরার পর খেলোয়াড়-কোচিং স্টাফদের অতি-উচ্ছ্বাস। মুহূর্তেই চতুর্থ গোল খেয়ে নাটকীয় হার। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে পরশুর শেষ ম্যাচে আধিপত্য দেখিয়েও গোল না পাওয়া—এসবই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।
জাতীয় দলের সাবেক কোচ শফিকুল ইসলাম মানিকের দৃষ্টিতে হামজা-শমিতদের দলটা এখন শক্তির বিচারে সিঙ্গাপুর-হংকংয়ের সমমানের। শুধু ফলাফলে তার ছাপ নেই। মানিকের বিশ্লেষণে এর কারণ, লক্ষ্য পূরণ করতে না পারার ঘাটতিটা এখনো রয়েই গেছে।
ফলই যদি শেষ কথা হয়, তাহলে বলতে হয় কোচ ভালো ফল দিতে পারেননি। সেদিক থেকে বলতে পারি এই কোচ (হাভিয়ের কাবরেরা) চলবে না।শফিকুল ইসলাম মানিক
ভালো খেলা আর ফলাফলের এই ফারাক শুধুই দুর্ভাগ্য, নাকি কৌশলগত সীমাবদ্ধতা? মানিক বলেন, ‘ফলই যদি শেষ কথা হয়, তাহলে বলতে হয় কোচ ভালো ফল দিতে পারেননি। সেদিক থেকে বলতে পারি এই কোচ (হাভিয়ের কাবরেরা) চলবে না। আবার এই কোচের অধীনে ৯০ মিনিটে ভালো খেলেছে দল। ম্যানেজমেন্ট যদি মনে করে ফল আসেনি, তাহলে সরাতে পারে কোচকে। এতে কিছু মানুষ খুশি হবে। আবার কিছু মানুষ বলবে এই কোচের অধীনে তো ভালো খেলেছে দল।’
মোহামেডানের কোচ আলফাজ আহমেদের চোখে সমস্যাটা আরও সুনির্দিষ্ট। তাঁর মতে, সঠিক খেলোয়াড় বাছাই আর কার্যকর স্ট্রাইকারের অভাবই চূড়ান্ত পর্বে যেতে না পারার বড় কারণ। দল গঠনেও ধারাবাহিকতা দেখেননি তিনি। বড় মঞ্চে এই অস্থিরতারই মূল্য দিতে হয়েছে বলে মনে করেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক।
কাবরেরা একটা দলই দাঁড় করতে পারেননি। একেক ম্যাচে একেক খেলোয়াড় খেলিয়েছেন। বিকল্প খেলোয়াড় তৈরি করতে পারেননি—এখানেই তাঁর বড় ব্যর্থতা।আলফাজ আহমেদ
আলফাজ বলেছেন, ‘৪৫ বছর পর এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে যাওয়ার ভালো সুযোগ ছিল বাংলাদেশের সামনে। কিন্তু আমরা তা কাজে লাগাতে পারিনি। কাবরেরা একটা দলই দাঁড় করতে পারেননি। একেক ম্যাচে একেক খেলোয়াড় খেলিয়েছেন। বিকল্প খেলোয়াড় তৈরি করতে পারেননি—এখানেই তাঁর বড় ব্যর্থতা।’
সামগ্রিক প্রস্তুতি, কোচিং অভিজ্ঞতা আর ঘরোয়া ফুটবলের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কোচ জুলফিকার মাহমুদ মিন্টু, ‘যে ফল হয়েছে, তা মোটেও সন্তোষজনক নয়। আমরা ভালো করার সুযোগ হাতছাড়া করেছি। অনেকে বলেন, বাছাইপর্বে বাংলাদেশের খেলা ভালো হয়েছে। তবে আমি করি, বাংলাদেশ যে ফুটবল খেলেছে, সেটা সন্তোষজনক নয়। আরও ভালো খেলা উচিত ছিল।’
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের সামগ্রিক ফলাফলে খুশি নই। কোচ কাবরেরার বদল এখন জরুরি।জাহিদ হাসান এমিলি
সাবেক স্ট্রাইকার জাহিদ হাসান এমিলির কাছে অবশ্য এই পুরো যাত্রাকে মনে হচ্ছে আলো আর আঁধারির মাঝামাঝি কিছু। তাঁর দৃষ্টিতে দলে উন্নতির ছাপ স্পষ্ট। শক্তি বেড়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়েছে, বড় দলগুলো এখন বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু ফলাফলে সামর্থ্যের প্রতিফলন না দেখে অসন্তুষ্ট এমিলি বলেছেন, ‘অন্তত দুইয়ে থাকা উচিত ছিল বাংলাদেশের। দলের শক্তি যেভাবে বেড়েছে, সে অনুযায়ী ফল আসেনি। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের সামগ্রিক ফলাফলে খুশি নই। কোচ কাবরেরার বদল এখন জরুরি।’