২০২৬ বিশ্বকাপ ট্রফি
২০২৬ বিশ্বকাপ ট্রফি

বিশ্বকাপ ফাইনালে টিকিটের দাম ১৩ লাখ টাকা

২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলে টিকিটের প্রথম দফার উন্মুক্ত বিক্রি শুরু হয়েছে। সেখানে ফাইনাল ম্যাচের একটি টিকিটের দাম সর্বোচ্চ ১০ হাজার ৯৯০ ডলার (প্রায় ১৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা) রাখছে ফিফা।

পুনর্বিক্রয় বা ‘রিসেল’ বাজার বাদ দিয়ে শুধু বক্স অফিসের দাম বিবেচনা করলে ফুটবল ইতিহাসে সাধারণ গ্যালারির টিকিটের ক্ষেত্রে এটাই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ দাম। অথচ আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর পক্ষ থেকে বিশ্বকাপের বিড–বুকে জানানো হয়েছিল, ফাইনালে টিকিটের সর্বোচ্চ দাম হবে ১ হাজার ৫৫০ ডলার (প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার টাকা)।

গত ডিসেম্বরে যখন বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর অফিশিয়াল সমর্থকগোষ্ঠীর সদস্যদের জন্য টিকিট ছাড়া হয়েছিল, তখন সর্বোচ্চ দাম ছিল ৮ হাজার ৬৮০ ডলার (প্রায় ১০ লাখ ৬২ হাজার টাকা)। গত বুধবার যখন সাধারণ দর্শকদের জন্য টিকিট বিক্রি শুরু হয়, তখন সেই দাম আরও বেড়ে যায়। এর আগে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালে গ্যালারির সেরা আসনের টিকিটের দাম ছিল ১ হাজার ৬০৪ ডলার (প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা)।

২০২৬ বিশ্বকাপে টিকিটের প্রকৃত মূল্যকাঠামো বোঝা বেশ কঠিন। কারণ, ফিফা কখনোই তাদের পূর্ণাঙ্গ মূল্যতালিকা প্রকাশ করেনি। ফুটবলের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা মূলত ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ পদ্ধতি অনুসরণ করছে, যেখানে টিকিটের চাহিদা অনুযায়ী সময়ভেদে দাম পরিবর্তিত হয়।

টিকিটের এমন আকাশচুম্বী দামের কারণে গত বছরের শেষ দিকে অনেকেই একে ফুটবলভক্তদের সঙ্গে ‘চরম বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে বলেছিলেন। যদিও গত ডিসেম্বরে ফিফা মাত্র ৬০ ডলার মূল্যের কিছু স্বল্পমূল্যের টিকিটের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে বুধবার প্রথমবারের মতো টিকিটের উন্মুক্ত বিক্রি শুরু হওয়ার পর চড়া দামের বিষয়টি আবারও সামনে চলে এল।

বিশ্বকাপের টিকিটে চড়া দাম রাখা হচ্ছে

ফাইনালে টিকিটের দাম বেড়েছে ৩৮ শতাংশ

আগামী ১১ জুন শুরু হবে বিশ্বকাপ। ফাইনাল আগামী ১৯ জুলাই, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।

ফাইনালসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের টিকিটের দাম আসলে কত, তা নিশ্চিতভাবে বলা প্রায় অসম্ভব। কারণ, ফিফা কখনোই টিকিটের দামের পূর্ণাঙ্গ তালিকা বা কোন ক্যাটাগরিতে কতটি টিকিট আছে, সেই তথ্য প্রকাশ করেনি।

ফিফার টিকিট বিক্রির ওয়েবসাইট ঘেঁটে বর্তমানে কী ধরনের টিকিট পাওয়া যাচ্ছে এবং সেগুলোর দাম কেমন, সে সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। তবে এর বাইরে আরও দামি কোনো টিকিট আছে কি না, কিংবা তুলনামূলক সস্তা ক্যাটাগরির টিকিট বেশি সংখ্যায় ছাড়া হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় নেই।

এখন পর্যন্ত যা দেখা গেছে, তাতে গত ডিসেম্বরের তুলনায় এবারের উন্মুক্ত বিক্রিতে ফাইনালের টিকিটের দাম প্রায় ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। প্রথম ক্যাটাগরিতে ১০ হাজার ৯৯০ ডলারের টিকিটের পাশাপাশি অন্যান্য ক্যাটাগরিতেও দাম বেড়েছে।

দ্বিতীয় ক্যাটাগরি: টিকিটের দাম ৫ হাজার ৫৭৫ ডলার থেকে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩৮০ ডলারে (প্রায় ৯ লাখ টাকা)।

তৃতীয় ক্যাটাগরি: টিকিটের দাম ৪ হাজার ১৮৫ ডলার থেকে ৩৮ দশমিক ২৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার ৭৮৫ ডলার (প্রায় ৭ লাখ টাকা)।

শেষ মুহূর্তের টিকিট বিক্রি শুরুর আগে ফিফা কোনো পূর্বঘোষণা দেয়নি যে কোন ম্যাচের টিকিট কত দামে পাওয়া যাবে। বিবিসি জানিয়েছে, যাঁরা টিকিট কিনতে পেরেছেন, তাঁরা দেখেছেন যে শীর্ষ দলগুলোর ম্যাচ এবং নকআউট পর্বের গুরুত্বপূর্ণ খেলাগুলোর টিকিটের দাম অনেকটাই বাড়ানো হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার ফিফার অফিশিয়াল ‘রিসেল’ বা পুনর্বিক্রয় প্ল্যাটফর্মটি আবার চালু হয়েছে। সেখানে টিকিটের দাম আরও আকাশচুম্বী। বিবিসি জানিয়েছে, একজন বিক্রেতা তাঁর একটি টিকিটের জন্য ৮২ হাজার ৭৮০ ডলার (প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা) দাবি করেন।

সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার সদরদপ্তর

টিকিট পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও প্রযুক্তিগত বিভ্রাট

গত বুধবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি টিকিটপ্রত্যাশী সাধারণ সমর্থকদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল লাইনে যুক্ত হয়। বাংলাদেশ সময় রাত সোয়া আটটার দিকে সেই লাইনে দাঁড়ানোর পর শুরুতে একটি ‘হোল্ডিং মেসেজ’ দেখা যায়। রাত ৯টায় সেটি পরিবর্তিত হয়ে একটি লাল বৃত্তে পরিণত হয় এবং লেখা ওঠে: ‘অলমোস্ট দেয়ার’ বা ‘প্রায় কাছাকাছি’।

রাত ১০টার দিকে পর্দায় একটি ক্ষণগণনা (কাউন্টডাউন) শুরু হয়। যখন দেখাচ্ছিল, লাইন আর মাত্র দুই মিনিটের, ঠিক তখনই সময় হঠাৎ বেড়ে ১৫ মিনিট হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত যখন ওয়েবসাইটে প্রবেশের সুযোগ মেলে, তখন হাজার হাজার সমর্থকের মতো বিবিসিকেও পড়তে হয় কারিগরি জটিলতায়।

শুরুতেই যাঁরা লগইন করেছিলেন, তাঁদের ভুল করে ‘পিএমএ টিকিট’ (প্লে-অফ জয়ী দলের সমর্থকদের জন্য সংরক্ষিত) দেওয়া হয়। সেখানে ঢোকার পর দেখা যায়, একটি কোড চাওয়া হচ্ছে। সমর্থকেরা ভুল বুঝতে পারলেও ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। তাঁদের আবার নতুন করে লাইনের শেষে দাঁড়াতে হয়। এর ফলে আকর্ষণীয় ম্যাচগুলোর টিকিট পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায় অনেকেরই।

ফিফা এই ভুলের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানায়নি। তবে তারা দাবি করেছে, রাত ১০টার মধ্যেই লিংকগুলো ঠিকঠাক কাজ করা শুরু করে। নতুন করে লাইনে দাঁড়ানোর পর টিকিটের মূল পাতায় পৌঁছাতে সময় লেগেছে ৬ ঘণ্টা ১৪ মিনিট।

গ্রুপ পর্বের ৭২টি ম্যাচের মধ্যে ৩৫টির টিকিট সেখানে দেখায়। তবে বিবিসির প্রবেশের সময় ইংল্যান্ড বা স্কটল্যান্ডের কোনো ম্যাচ কিংবা নকআউট পর্বের কোনো টিকিট বরাদ্দ ছিল না। আয়োজক দেশগুলো বাদে শীর্ষ ১০টি বাছাই দলের মধ্যে কেবল নেদারল্যান্ডসের একটি ম্যাচের টিকিট তখন অবশিষ্ট ছিল।

টিকেটের দাম শুরু হয়েছে ১৪০ ডলার থেকে, যা সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯৮৫ ডলার পর্যন্ত দেখা গেছে। প্রদর্শিত টিকিটের গড় মূল্য ছিল ৩৫৮ ডলার। গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোর মধ্যে মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের টিকিটের দাম সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯৮৫ ডলার দেখা যায়, যদিও ৮৭ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামের তুলনায় এই টিকিটের পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য।

করপোরেট হসপিটালিটি প্যাকেজের আওতায় ইংল্যান্ড–পানামা ম্যাচের একটি বিলাসবহুল স্যুইটের দাম দেখা গেছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৮০০ ডলার। ২৪টি টিকিটসহ খাবার ও পানীয়ের এই প্যাকেজে জনপ্রতি খরচ পড়ছে ৫ হাজার ২০০ ডলার।

ফিফা ইঙ্গিত দিয়েছে, কিক-অফের আগপর্যন্ত যেকোনো সময় নতুন টিকিট ছাড়া হতে পারে। গত বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ১৩টি ম্যাচের টিকিট দেখা যায়, যার মধ্যে ৬টি ছিল কেবল হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের সঙ্গীদের জন্য। বিতর্কিত বিষয় হলো, ফিফা এবার হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের সহকারীদের জন্য কোনো বিনা মূল্যে টিকিটের ব্যবস্থা রাখেনি। তাঁদের পুরো দাম দিয়েই টিকিট কিনতে হচ্ছে এবং আসনগুলোও পাশাপাশি হবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

এখনো সবচেয়ে বেশি টিকিট পড়ে আছে ১৩ জুন যুক্তরাষ্ট্র–প্যারাগুয়ে ম্যাচের। এই ম্যাচের ১ হাজার ৪০৬টি প্রথম ক্যাটাগরির টিকিট প্রতিটি ২ হাজার ৭৩৫ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া কানাডা বনাম বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ম্যাচেরও ৮৪৬টি টিকিট অবিক্রিত অবস্থায় রয়েছে।

চলছে বিশ্বকাপের কাউন্টডাউন

পুনর্বিক্রয়ের বাজারে দাম ১ কোটি টাকা

গত বৃহস্পতিবার ফিফার অফিশিয়াল ‘রিসেল’ বা পুনর্বিক্রয়ের প্ল্যাটফর্মটি আবারও উন্মুক্ত করা হয়। ধারণা করা হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ম্যাচগুলোর টিকিটের দাম এখানে চড়া হবে। মেক্সিকোর আইন অনুযায়ী, সেখানে মূল দামের চেয়ে বেশি দামে টিকিট পুনর্বিক্রয় করা নিষিদ্ধ।

ফিফার এই প্ল্যাটফর্মে যে কেউ টিকিট কেনার পর তা নিজের ইচ্ছেমতো দামে বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত করতে পারেন। তবে এগুলো মূলত বিক্রেতাদের চাওয়া দাম, যা নিশ্চিত করে না যে টিকিটগুলো ওই দামেই বিক্রি হচ্ছে।

প্ল্যাটফর্মটি চালু হওয়ার পরপরই বিবিসি স্পোর্ট দেখেছে, ফাইনাল ম্যাচের সবচেয়ে দামি টিকিটের দাম চাওয়া হচ্ছে ৮২ হাজার ৭৮০ ডলার। এমনকি সবচেয়ে সস্তা টিকিটের দামও ধরা হয়েছে ২৭ হাজার ডলার (প্রায় ৩৩ লাখ টাকা)।

ইংল্যান্ড–ক্রোয়েশিয়ার উদ্বোধনী ম্যাচের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। মাত্র ৬০ ডলারের একটি টিকিট সেখানে ১ হাজার ৪৯৯ ডলারে বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়। আবার যে টিকিটের প্রকৃত দাম ৪৪৫ ডলার, সেটির দাম চাওয়া হচ্ছে ৬ হাজার ডলার। এই মূল্যের ওপর ফিফা ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয় পক্ষ থেকেই ১৫ শতাংশ ফি কেটে রাখবে।

‘ফিফার টিকিট বিক্রিতে আরও এক কলঙ্ক’

টিকিট বিক্রির পুরো প্রক্রিয়া ফিফা যেভাবে সামলাচ্ছে, তা সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। টিকিটের কোনো সুনির্দিষ্ট মূল্যতালিকা না থাকা এবং বিক্রির আগপর্যাপ্ত তথ্য না দেওয়ায় ফুটবলপ্রেমীরা বিশ্বকাপের পরিকল্পনা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।

ফুটবল সাপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বস্থানীয় টমাস কনক্যানন বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, ‘পুরো বিষয় যেন একটা বড় রহস্য। সমর্থকেরা আসলে বুঝতেই পারছে না তাঁরা এখন কী করবে।’ কনক্যানন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ফিফার টিকিট বিক্রির ইতিহাসে এটি আরেকটি বড় কলঙ্ক। টুর্নামেন্টজুড়েই এমনটা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

কনক্যাননের মতে, সব খরচ মিলিয়ে মাত্র কয়েকটি ম্যাচ দেখতেই একজন সমর্থকের কয়েক হাজার পাউন্ড থেকে শুরু করে ১০ হাজার পাউন্ডের (প্রায় ১৬ লাখ টাকা) বেশি খরচ হয়ে যেতে পারে। কনক্যানন বলেন, ‘জীবনে হয়তো একবারই বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ আসে। অনেকের জন্য এটি ছিল সেই সুযোগ, কিন্তু উচ্চমূল্যের কারণে তারা আর যেতে পারবে না।’